উত্তম সরকার। —নিজস্ব চিত্র।
পায়ে হাঁটা যে রাস্তাটা বন ফুঁড়ে হারিয়ে গেছে, তার দু’পাশে দেড় মানুষ উঁচু হাতি-ঘাস (এলিফ্যান্ট গ্রাস) ছায়া ফেলে নিঝুম হয়ে আছে।
সে রাস্তা ধরে, রোজকার নিয়ম মেনে জঙ্গলে টহলদারি সেরে ফিরছিলেন জলদাপাড়ার বিট অফিসার উত্তম সরকার (৫৪)।
ঘাস কি একটু নড়ে উঠল! পিছু ফিরে তাকানোর সময় পাননি উত্তম। তার আগেই সম্ভবত ঘাস বনের আড়াল থেকেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এসে কামড়ে-ঢুঁসিয়ে তাঁকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় গন্ডার। ক্ষত দেখার পরে বনকর্মীদের এমনই অনুমান।
বুধবার রাতে, বিট অফিসে না ফেরায় সার্চ লাইটের আলো নিয়ে সহকর্মীরা বেরিয়ে ছিলেন তাঁর খোঁজে। জলদাপাড়ার শিলতোর্সা রেঞ্জের সেই পথে খানিক হাঁটতেই চোখে পড়েছিল তাঁর উল্টে পড়ে থাকা মোটরসাইকেল। আর, কয়েক পা দূরে, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা উত্তমের ক্ষতবিক্ষত দেহ মিলেছিল খানিক পরেই। জলদাপাড়ার ওই বনকর্মীর রক্তাক্ত দেহের পাশে বসে এ দিন তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, ‘‘জঙ্গলকে বড় ভালবাসত মানুষটা আর, জঙ্গলই তাকে খেল!’’ বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন জানান, সরকারি নিয়ম মেনেই ওই বনকর্মীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
সহকর্মীরা জানান, জলদাপাড়া (উত্তর) রেঞ্জের শিলতোর্সা বিটের দায়িত্বে ছিলেন উত্তম। বাড়ি ছিল মাদারিহাটে। বাড়ি থেকেই বিকেলে রওনা দিয়েছিলেন বিট অফিসে। আর ফেরেননি। রাত আটটা নাগাদ বার বার তাঁর ফোন বেজে যাচ্ছে দেখে সহকর্মীরা খুঁজতে বেরোন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মেলে তাঁর নিথর দেহ। বনকর্মীদের বুঝতে দেরি হয়নি এ কাজ গন্ডারের।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত, আক্রমণ করে না গন্ডার। সঙ্গে শাবক থাকলে কিংবা কোনও কারণে ভয় পেলে তেড়ে আসে তারা। তাদের আক্রমণের ধরনও অদ্ভুত, পুরুষ্টু খড়্গ থাকলেও তাদের আক্রমণের মূল অস্ত্র রীতিমতো ধারালো জিভ। তাদের স্বাদ কোরক বা ‘টেস্ট বাড’ এত শক্ত এবং ধারাল হয় যে তা দিয়ে চেটে দিলেই চামড়া ফালা ফালা হয়ে যায়। উত্তমের ক্ষতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বলছেন অভিজ্ঞ বনকর্মীরা। জলদাপাড়ার সহকারী বন্যপ্রাণ সহায়ক বিমল দেবনাথ বলেন, “মর্মান্তিক ঘটনা। এখন থেকে বনকর্মীদের আরও সতর্ক হয়ে জঙ্গলে চলাফেরা করতে হবে।”