(বাঁ দিক থেকে) স্বপন দাশগুপ্ত, শুভেন্দু অধিকারী এবং জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পরে অবশেষে রাজ্যের নতুন মন্ত্রীদের দফতর বণ্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বুধবারই নবান্ন থেকে এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র দফতর মুখ্যমন্ত্রী নিজের হাতেই রাখছেন। পাশাপাশি, আইন ও বিচার; ভূমি ও ভূমিরাজস্ব; বিদ্যুৎ; তথ্য ও সংস্কৃতি; উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন; কর্মিবর্গ ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং পার্বত্য বিষয়ক দফতরও মুখ্যমন্ত্রীর হাতে থাকছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে পেশায় চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার নিউ টাউনের রামমন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন শুভেন্দু। উপস্থিত ছিলেন শারদ্বতও। সেখানেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে শারদ্বতের নাম জানান মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের নতুন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক তথা মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায়। সঙ্গে থাকছে অচিরাচরিত শক্তি দফতরেরও দায়িত্ব।
প্রাথমিক ভাবে শোনা যাচ্ছিল, অর্থ দফতর মুখ্যমন্ত্রীর হাতে থাকবে। কিন্তু মঙ্গলবার রাত থেকে বিজেপির একাধিক সূত্রে জানা যায়, অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন স্বপন দাশগুপ্ত। এর আগে শোনা গিয়েছিল, স্বপন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী হবেন এবং স্কুলশিক্ষা যাবে শঙ্কর ঘোষের হাতে। কিন্তু শেষপর্যন্ত উচ্চশিক্ষা দফতর পেয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। স্কুলশিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে উত্তরবঙ্গের বিজেপি নেতা তথা রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক দীপক বর্মণ।
বাম জমানায় শিক্ষা দফতরকে ভাগ করে নানা হাতে দেওয়া হয়েছিল। অনেকের মতে, জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় সিপিএম-কে তেমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম দিকে সেই ধারা বহাল রাখলেও পরে গোটা শিক্ষা দফতরকে একত্রিত করে দেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং ব্রাত্য বসু, দু’জনেই দীর্ঘদিন একা শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন।
কেন্দ্রে বা বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকারেও গোটা শিক্ষা দফতরকে সাধারণত একত্রিত রাখা হয়। উচ্চশিক্ষা, স্কুলশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা মন্ত্রী করা হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই নীতি থেকে সরে আসা হচ্ছে। গত ১৫ বছরে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে নিয়োগে বেলাগাম দুর্নীতির কারণে, যে রকম জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাতে শিক্ষা বিভাগ সামলানো নতুন সরকারের পক্ষে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া, বিজেপি এবং আরএসএস-এর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ-ও মনে করেন যে, রাজ্যের শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান-সহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন দরকার। কারণ, ৩৪ বছরের বাম জমানায় পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তরে বামপন্থী ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। তাঁদের মতে, ১৫ বছরের তৃণমূল জমানাতেও সে ঝোঁক বর্জনের কোনও চেষ্টা হয়নি, বরং ব্রাত্য বসুর মতো ‘বামপন্থী’ মন্ত্রী সেই ধারাই বহাল রেখেছিলেন। তৃণমূল জমানায় পাঠ্যক্রম নির্ধারণের কমিটিতে মার্কামারা বামপন্থী শিক্ষকদেরই যে দাপট ছিল, তা কারও অজানা নয়। ফলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং আরএসএস এ বিষয়ে সহমত যে, শিক্ষা বিভাগের রাশ ‘সংগঠনের ঘরের ছেলে’ হিসেবে পরিচিত শক্ত নেতাদের হাতে থাকা জরুরি।
এই মাপকাঠিতে স্বপনও উতরে গিয়েছিলেন। শপথের অনেক আগে শিক্ষা বিভাগের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে বিকাশ ভবনে গিয়েছিলেন রাসবিহারীর বিধায়ক স্বপন, শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ এবং খড়দহের বিধায়ক কল্যাণ চক্রবর্তী। কিন্তু স্বপনকে অর্থমন্ত্রী হিসেবেই বেশি পছন্দ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের। শঙ্কর ঘোষকে দেওয়া হয়েছে পর্যটন দফতর। শিক্ষাবিদ তথা কৃষিবিজ্ঞানী কল্যাণ পেয়েছেন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানবিদ্যা; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি; তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিন দফতরের দায়িত্ব। তাঁদের বদলে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যাঁদের বাছা হয়েছে, সেই জগন্নাথ এবং দীপকও সঙ্ঘ ও বিজেপির মাপকাঠিতে খুবই মানানসই। দু’জনেই সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক এবং আদর্শগত পরিবারের পুরনো পরিচিত মুখ।
৯ মে ব্রিগেডের শপথ সমারোহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে পাঁচ মন্ত্রী শপথ নিয়েছিলেন—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু। তাঁদের সকলেরই দফতর আগেই বণ্টন করা হয়েছিল। পঞ্চায়েত, কৃষি বিপণন ও প্রাণিসম্পদ দফতরের দায়িত্ব পেয়েছেন দিলীপ। খাদ্য ও সরবরাহ দফতর গিয়েছে অশোকের হাতে। আদিবাসী উন্নয়ন দফতরের দায়িত্বে ক্ষুদিরাম। তবে অগ্নিমিত্রাকে প্রাথমিক ভাবে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের সঙ্গে নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতর দেওয়া হলেও এখন সেই দফতর যাচ্ছে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মালতী রাভা রায়ের হাতে। একই সঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং প্রকল্প নজরদারি দফতরের দায়িত্বও পেয়েছেন তুফানগঞ্জের বিধায়ক।
আরও এক স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁকে ক্রীড়া এবং যুব বিষয়ক দফতর দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের হাত থেকে নিয়ে। সেই সঙ্গে ক্রেতা সুরক্ষা দফতরও গিয়েছে বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতির হাতে। নিশীথ থাকছেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন এবং জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরের দায়িত্বে। পরিবহণ এবং শ্রম দফতর পেয়েছেন নোয়াপাড়ার বিধায়ক অর্জুন সিংহ। কৃষিমন্ত্রী ‘আদি বিজেপি’ নেতা তথা ময়ূরেশ্বরের বিধায়ক দুধকুমার মণ্ডল।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার বাকি ৩৫ জন সদস্য শপথ নিয়েছিলেন ১ জুন, লোক ভবনে। তার পর এই ক’দিনে তাঁদের কাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে সে ব্যাপারে বিজেপির রাজ্য সভাপতি এবং রাজ্য বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক সুনীল বনসলের মতামত জেনেছে দিল্লি। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিজেপি এবং আরএসএস-এর মধ্যে প্রধান সমন্বয়ক যিনি, সেই অরুণ কুমারের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মতামত মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।