শুধু আমাদেরই সময়ে ফিরতে হবে?

মহিলাদের উপরে দোষ চাপানো হয়

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়তাম সিউড়ি আরটি গার্লস হাইস্কুলে। সামনেই স্কুল। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে কিছু ছেলে আমার আর বন্ধুদের উদ্দেশ করে প্রায় দিনই টোন-টিটকিরি করত। তবে, সেটা তেমন মাত্রা ছাড়ায়নি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেই যেন বুঝতে পারলাম সব কিছু।আমাদের বাড়িটা এসপি মোড়ে। বাড়ির সামনে থেকে অহরহ বাস সিউড়ি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যায়। সেখানে নেমে সামান্য দূরেই কলেজ। বাসেই প্রথমে যাতায়াত শুরু করেছিলাম। কিন্তু, বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা হল। চলাফেরার পথে মেয়েদের সঙ্গে চলন্ত বাসে যে অসভ্যতা করা হয়, তা সহ্য হচ্ছিল না।

Advertisement

ঐশী চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:০৭
Share:

আঁধার নামলেই মেয়েদের হাঁটা দায় সিউড়ির এই সব গলিপথে। বাজারপাড়ায় তোলা নিজস্ব চিত্র।

আমাদের বাড়িটা এসপি মোড়ে। বাড়ির সামনে থেকে অহরহ বাস সিউড়ি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যায়। সেখানে নেমে সামান্য দূরেই কলেজ। বাসেই প্রথমে যাতায়াত শুরু করেছিলাম। কিন্তু, বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা হল। চলাফেরার পথে মেয়েদের সঙ্গে চলন্ত বাসে যে অসভ্যতা করা হয়, তা সহ্য হচ্ছিল না। কে নেই সেই তালিকায়। যুবকেরা যেমন আছে, আছেন মধ্যবয়সীরা। এমন অনেকে ছিলেন, এত দিন যাঁদের অত্যন্ত সম্মাননীয় মনে হতো। তাঁদেরও দেখেছি সুযোগ পেলেই ভিড় বাসে মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতা করতে। শেষে বাস ছেড়ে স্কুটি কিনেছি। অন্তত যাতায়াতে স্বনির্ভর হয়েছি।

Advertisement

এ তো গেল কলেজ যাওয়ার কথা। কলেজেও হামেশাই অসম্মানিত হতে হয় ছাত্রীদের। সিনিয়রেরা সুযোগটা বেশি নেন। মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। না হলে কলেজ থেকে প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। সেই ভয়ই ভিতরে ভিতরে থামিয়ে রাখে প্রতিবাদ করতে। বিপদ তো কলেজের বাইরেও। কত বন্ধুর কাছে শুনেছি, টিউশন নিতে গিয়ে কী ভাবে শিক্ষকদের হাতে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে।

এ বার আসি শহরের রাস্তার কথায়। সন্ধ্যা ৭টার পরে একা বের হওয়ায় দায়। কোনও প্রয়োজনে বাইরে বের হলে কিছু না কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হবেই। অনেক সময় বন্ধুরা সঙ্গে থাকলেও ওই সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না। আরও বাজে অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তে হয়। একবার আমি আর আমার বন্ধু টিউশন সেরে ফিরছি। রাস্তায় অত্যন্ত কুরুচিকর মন্তব্য করল এক যুবক। ঘুরে গিয়ে প্রতিবাদ করলাম। উল্টে আমাদেরই দ্বিগুণ বাজে কথা শুনিয়ে দিল। এমন ঘটনা বড়দের নজরে পড়লেও বহু সময়ই দেখেছি, প্রতিবাদ না করে এড়িয়ে যান অনেকে। কিংবা সহজেই মেয়েদের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। সহজেই মেয়েটাকেই ‘বাজে’ বলে দেগে দিতেও কেউ কেউ পিছপা হন না। সত্যি বলছি, প্রতিবাদ করতে এখন সাহসও হয় না। যদি পরে পাল্টা আক্রমণ হয়!

Advertisement

বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে গেলেও যে মেয়েরা নিরাপদে থাকবে, তেমন নিশ্চয়তা কোথায়? আমার অভি়জ্ঞতা থেকে বলছি, কিছু ছেলে এত ডেসপারেট হয়, এমন মন্তব্য করে, যা শুনে বিব্রত হতে হয় নিজেকে। বাবা-মায়েরও মাথা নিচু হয়ে যায়।

আজকাল মেয়েদের পোশাক নিয়ে কত কথা হয়। আমি মনে করি না, মেয়েদের প্রতি পুরুষের অত্যাচারের নেপথ্যে পোশাকের কোনও ভূমিকা আছে। দু’দিন আগেই বোলপুরে ছ’ বছরের যে শিশুটাকে নির্মম অত্যাচার করে মেরে ফেলা হল, তার পোশাকে কোন দোষ ছিল বলুন তো? আসলে সমস্যাটা মানসিকতায়। প্রথম প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। সেটার জন্য যেমন সঠিক শিক্ষা প্রয়োজন, তেমনই দরকার মেয়েদের সম্মিলিত প্রতিবাদেরও।

(সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের মাসকমিউনিকেশনের ছাত্রী)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement