বিষ্ণুপুরের মন্দিরে মন্দিরে পর্যটকদের ঢল। কিন্তু অনেকেই হন্যে হয়ে খুঁজেও হোটেল-লজে ঘর না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।—নিজস্ব চিত্র।
হইহই করে পিকনিক করতে যাওয়ার জন্য কে কবে আবহাওয়াকে পরোয়া করেছে! ঠান্ডা জাঁকিয়ে পড়লেও যেমন আমুদে বাঙালি এই দিনটায় বাঁধনহারা হন, ঠান্ডা কম হলেও হুল্লোড়ে কমতি পড়ে না। এ বারও তাই বড়দিন আসতেই হইহই করে বাড়ি ছেড়ে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় আট থেকে আশি ভিড় করলেন। সারাটা দিন আড্ডা মেরে, ব্যাডমিন্টন-ক্রিকেট-ফুলবল খেলে রান্না-খাওয়া করলেন। কেউ কেউ মাইক, সাউন্ডবক্স বাজিয়ে উদ্দাম নাচে মাতলেন।
তবে কোথাও কোথাও খাবার জল, শৌচাগার ও অপরিচ্ছনতার মতো পরিকাঠামোগত সমস্যা পিকনিকে আসা মানুষজনকে কষ্ট দিয়েছে।
বরাবরের মতো এ বারও লজ-হোটেলে ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা চলছে। ক’দিন আগেই শুরু হয়েছে বিষ্ণুপুর মেলা। একে শিল্পীদের ভিড় হোটেল-লজগুলোয়। তার সঙ্গে পর্যটকদেরও ভিড় হামলে পড়েছে। অনেকে তো কয়েকমাস আগে থেকেই হোটেল বুক করে রেখেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ যাঁরা চলে এসেছেন, তাঁদের হোটেল পেতে রীতিমতো কালঘাম ছোটে।
দুর্গাপুরের বেনাচিতি থেকে এ দিন বিষ্ণুপুরে এসেছিলেন সদ্য বিবাহিত দম্পতি বিকাশ এবং সুলগ্না সিংহ। একের পর এক লজে ঘুরেও তাঁরা থাকার মতো জায়গা পাননি। দু’শো টাকার ঘরের জন্য হাজার টাকা পর্যন্ত তাঁরা গচ্চা দিতে রাজি ছিলেন, কিন্তু ঘর ফাঁকা পেলে তো! ওই দম্পতি জানান, এ রকম পরিস্থিতি হবে তা আগে তাঁরা আন্দাজ করতে পারেননি। না হলে আগেই বুক করে আসতেন। শেষে বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হল তাঁদের।
ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না বহুদূর থেকে আসা পর্যটকদের। তাঁদের অনেকেই এই শীতে রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নীচে। গোটা শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ২০টি লজ রয়েছে। বিষ্ণুপুর মেলায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের দৌলতে সেসব আগে থেকেই ভরে রয়েছে। বিষ্ণুপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অসিত চন্দ বলেন, ‘‘প্রতি বছরই এই সময়টা এমনই হয়। মেলার ভিড়ের সঙ্গে বড়দিনের ছুটির ভিড় মিলে তিন ধারণের জায়গা থাকে না লজগুলিতে।’’ তবে এক লজ মালিক জানান, এ বার বিষ্ণুপুর মেলায় অনুষ্ঠান করতে আসা শিল্পীদের জন্য বেশির ভাগ লজের প্রায় অর্ধেক ঘর আগে থেকেই ভাড়া নিয়ে রেখেছে মেলা কমিটি। তার ফলে থাকার জায়গার আকাল কিছুটা বেড়েছে বলে তাঁর মত।
একই ছবি পুরুলিয়াতেও। পুরুলিয়া শহর, রঘুনাথপুর এবং মানবাজারের প্রায় প্রতিটি হোটেল, লজ এবং অতিথিনিবাস ছিল ভিড়ে ঠাসা। পুরুলিয়ার হোটেল ব্যবসায়ী মোহিত লাঠা, সুপ্রিয় দত্তরা জানালেন, এ দিনের জন্য বাইরে থেকে আসা পর্যটকরা প্রায় দু’মাস আগে থেকে বুকিং করে রেখেছিলেন। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত টানা বুকিং রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে অনেক পর্যটককেই। জয়চণ্ডী পাহাড়ের ইকো ট্যুরিজম কটেজের কর্তা মলয় সরখেল জানান, সমস্ত কটেজই ভর্তি হয়ে গিয়েছে।
এ দিন অবশ্য পিকনিক করতে আসা মানুষজন জমিয়ে আমোদ করেছেন। বড়দিন এবং মেলার ভিড় মিলে সকাল থেকেই জমজমাট ছিল বিষ্ণুপুর। রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা, দলমাদল কামান এলাকায় উপচে পড়েছিল মানুষের ঢল। অটো রিকশা, টোটো বা গাড়ি ভাড়া করে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েছিলেন শহরের মানুষও। শহরের শাঁখারিবাজার এলাকার টোটো চালক সমীর নন্দী জানান, সারাদিনে প্রায় দম ফেলবার ফুরসত পাননি তিনি।
ভিড় ছিল বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়েও। দল বেঁধে পিকনিকে গিয়েছিলেন অনেকে। কেউ কেউ গিয়েছিন শুধু বেড়াতে। আগে থেকে বুকিং করে আসা পর্যটকদের দৌলতে ভরে গিয়েছিল মুরুৎবাহা ইকো টুরিজম পার্কের সমস্ত কটেজ। দিনভর পার্কে হুল্লোড় করল কচিকাঁচারা।
বাঁকুড়া শহরের কালীতলা এলাকার বধূ সঙ্ঘমিত্রা গোস্বামী কলেজ জীবনের বান্ধবীদের সঙ্গে পিকনিক করতে এসেছিলেন শুশুনিয়ায়। জানালেন, পর্যটনের পরিকাঠামো নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি। ব্যবসা ভাল হওয়ায় এ দিন হাসি ফুটেছিল স্থানীয় পাথর শিল্পীদের মুখেও।
পিকনিক করতে অনেকে গিয়েছিলেন মুকুটমণিপুর জলাধারে। তবে, এ বছর জলাধারে জল কম থাকায় সেখানে ভিড় তেমন জমেনি বলে জানালেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় হস্তশিল্প ব্যবসায়ী জলেশ্বর সাহু, পতিতপাবন সাহু, বিকাশ মোদকরা জানালেন, বেচাকেনা মোটের উপর ভালো হলেও, বড়দিন উপলক্ষে যতটা আশা করেছিলেন তা হয়নি।
প্রথমবার মুকুটমণিপুরে এসেছিলেন ঝাড়খণ্ডের রাজা আলম এবং তাঁর পরিবার। অল্প জল তাঁদের মুগ্ধতা কমাতে পারেনি। তবে পরিকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বারাসাত থেকে এসেছিলেন বিশ্বজিৎ ভৌমিক। তাঁর অভিযোগ, পানীয় জল নেই। অভাব রয়েছে শৌচাগারেরও। নৌকো চালক কৃষ্ণ সিংহ সর্দার, সনৎ মণ্ডলদের দাবি, গত মরসুমেও জলাধারের ভিতরে গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হত। কিন্তু এ বার প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে গাড়ি থামিয়ে দেওয়ায় অনেক পর্যটকরাই জলাধার অবধি আর আসছেন না। তার উপরে জলও কম রয়েছে। সব মিলিয়ে এ দিন ভাল ব্যবসা না হওয়ায় হতাশ তাঁরা।
উৎসবের আমেজে পিছিয়ে ছিল না পুরুলিয়াও। শীত শুরু হতেই জয়চণ্ডী, বেড়ো এবং মাঠা পাহাড়ে পর্বতারোহীদের তাঁবু পড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার থেকে অযোধ্যা পাহাড়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের পর্যটন উৎসব। তার উপর জমে উঠেছে বড়দিনে পিকনিক আর বেড়াতে আসা মানুষের ভিড়। অযোধ্যা, জয়চণ্ডী, গড়পঞ্চকোট পাহাড়ে এসেছিলেন অনেক মানুষ।
আকর্ষণের তালিকায় ছিল পঞ্চকোট রাজবাড়ি এবং পাখিবড়রা এলাকার জৈন পুরাকীর্তিগুলিও। ভিড় ছিল মুরগুমা, পুঁটিয়ারি এবং দোলাডাঙা জলাধারেও।