Nandigram Sebashray

নন্দীগ্রামে প্রতি বছর ‘সেবাশ্রয়’ হবে, সাহস থাকলে আটকান! শুভেন্দুকে চ‍্যালেঞ্জ অভিষেকের, সঙ্গে দলের কোন্দলেও মলম

নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিক উত্থানের অন্যতম ‘সিঁড়ি’ হলেও গত কয়েক বছর ধরেই এই জনপদে তৃণমূলের সংগঠনে কোন্দল বিরাজ করছে। নানাবিধ ওষুধ প্রয়োগ করেও তা সারানো যায়নি।

Advertisement

শোভন চক্রবর্তী, নন্দীগ্রাম

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪১
Share:

(বাঁ দিকে) শুভেন্দু অধিকারী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।

আসছে বছর আবার হবে। শুধু আসছে বছর নয়। প্রত্যেক বছর হতেই থাকবে। শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা নন্দীগ্রামে শুরু হওয়া স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’ নিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর দিকে সটান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামের দুই ব্লকের ‘মডেল ক্যাম্প’ ঘুরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কিছুটা হুঙ্কার মেশানো গলাতেই অভিষেক বলে দিলেন, ‘‘এর পর প্রতি বছর নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় হবে। এবার দুটো মডেল ক্যাম্প হয়েছে। পরবর্তীতে ১৭টি অঞ্চলেই হবে। ক্ষমতা থাকলে আটকে দেখান!’’

Advertisement

দিনভর নন্দীগ্রামে ঘুরে একটা বিষয় স্পষ্ট, হলদি নদীর তীরে তৃণমূলের প্রতিপক্ষ বিজেপি নয়। শুভেন্দু। বিজেপির শুভেন্দুও নন। শুধু শুভেন্দু। প্রত্যাশিত ভাবে অভিষেকও তাই নিশানা করেছেন তাঁকেই। কটাক্ষের সুরে এ-ও বলেছেন যে, আগামী দিনে শুভেন্দুর পরিবারের লোকজনকেও সেবাশ্রয়ে পরিষেবা নিতে হবে।

গত অক্টোবর মাস থেকেই ক্যামাক স্ট্রিট ‘এক ডাকে অভিষেক’ নম্বরে ফোনের পর ফোন পাচ্ছিল ডায়মন্ড হারবারের মতো নন্দীগ্রামেও ‘সেবাশ্রয়’ শিবির হওয়ার আবেদন নিয়ে। কার্যত তখন থেকেই নন্দীগ্রামে এই কর্মসূচির সলতে পাকানো শুরু হয়ে গিয়েছিল। জানুয়ারি মাসের গোড়াতেই জানা যায়, চলতি মাসেই তা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই ঘোষণা হতেই শুভেন্দু ‘সেবাশ্রয়’ নিয়ে নানাবিধ মন্তব্য করেছিলেন। এমনও বার্তা দিয়েছিলেন যে, হিন্দুরা যেন ‘তৃণমূলের ট্যাবলেট’ না খান। যদিও বৃহস্পতিবার দেখা গেল ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষেই সেবাশ্রয় শিবিরে চিকিৎসা পরিষেবা নিতে এসেছেন সাধারণ মানুষ। সন্দেহ নেই, ব্যাপ্তিতে ডায়মন্ড হারবারের মতো না হলেও নন্দীগ্রামের দুটি সেবাশ্রয় শিবিরই খরচসাপেক্ষ। যেগুলি চলবে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই অর্থ কোথা থেকে আসছে তার হিসাব চেয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলনেতা তথা নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু। পাল্টা অভিষেক বলেছেন, ‘‘উনি হিসাব চাওয়ার কে? হিসাব ইনকাম ট্যাক্সকে দেব। অন্য কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি চাইলে তাদের দেব। ওঁর নামের পিছনে ‘অধিকারী’ আছে বলেই যে কোনও অধিকার গজিয়ে যায় না!’’

Advertisement

বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রামের ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরে অভিষেক। ছবি: সংগৃহীত।

নন্দীগ্রাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিক উত্থানের অন্যতম ‘সিঁড়ি’ হলেও গত কয়েক বছর ধরেই এই জনপদে তৃণমূলের সংগঠনে কোন্দল বিরাজ করছে। নানাবিধ ওষুধ প্রয়োগ করেও তা সারানো যায়নি। কোন্দলের কারণে আলগা হওয়া সংগঠনের নমুনা প্রত্যক্ষ করা গেল বৃহস্পতিবারও। ঘটনাচক্রে, নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের তুলনায় ১ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয় শিবির স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়, উপস্থিতি সব সূচকেই এগিয়ে ছিল। দু’টি শিবির তদারকি করতে অভিষেক কলকাতা থেকে জোড়া দূত পাঠিয়েছিলেন। ১ নম্বর ব্লকের দায়িত্বে ছিলেন মুখপাত্র ঋজু দত্ত। ২ নম্বর ব্লকের দায়িত্ব ছিল কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষের উপর। দুজনেই সেই দায়িত্ব সামলাতে প্রাণপাত পরিশ্রম করেছেন। তবে অভিষেকের জন্য সাংগঠনিক ভাবে যে জমায়েত তৃণমূল করেছিল, তাতে ২ নম্বর ব্লকের তুলনায় কয়েক কদম এগিয়ে রইল ১ নম্বর ব্লক। ঘটনাচক্রে, ১ নম্বর ব্লকে সংখ্যালঘু অংশের মানুষের বাস প্রচুর। যাঁরা তৃণমূলের জনসমর্থনের অন্যতম ভিত্তি।

নন্দীগ্রামে দু'টি সেবাশ্রয় শিবিরই যে শহিদ পরিবারের সদস্যেরা উদ্বোধন করবেন তা সবচেয়ে আগে জানিয়েছিল আনন্দবাজার ডট কম। বৃহস্পতিবার ১৯ জন শহিদ পরিবারের সদস্যেরা দু’টি শিবিরে হাজির ছিলেন। তাঁরাই চিকিৎসা পরিষেবা শিবিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। যে শহিদ পরিবারগুলির মধ্যে শুভেন্দুর ‘প্রভাব’ রয়েছে বলেই কথিত। তবে তাঁদের অনেকে বৃহস্পতিবার মমতার আবেগে ভাসলেন। যেমন শেখ ইয়াসিনের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেই দিলেন, ‘‘দিদি ছাড়া নন্দীগ্রামের আন্দোলন সফল হত না। আমরা দিদিকেই চিনি।’’ আবার শহিদ জয়দেব দাসের ভ্রাতৃবধূ সেবাশ্রয়ে হাজির থাকলেও স্পষ্ট করে বললেন না যে, তিনি রাজনৈতিক ভাবে কোনদিকে। মমতার দিকে? নাকি শুভেন্দুর দিকে? এমনকি, নিজের নামও বলতে চাইলেন না।

তৃণমূলের পূর্ব মেদিনীপুরের প্রায় সব নেতাই বৃহস্পতিবার হাজির হয়েছিলেন নন্দীগ্রামে। মন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী, চণ্ডীপুরের বিধায়ক সোহম চক্রবর্তী, তমলুকের নেতা পীযূষ পণ্ডা, জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তম বারিক সকলেই হাজির ছিলেন সেবাশ্রয় শিবিরে। তবে একাধিক নেতানেত্রীকে শিবিরে প্রবেশাধিকার পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কেউ ২ নম্বর ব্লকের শিবিরে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন। তাঁকে চলে আসতে হয়েছে ১ নম্বর ব্লকের শিবিরে। আবার কেউ ১ নম্বরে বাধা পেয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ২ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয়ে। এমন এক নেত্রীকে নিয়ে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ভাল-মন্দের গুঞ্জন চলল, যিনি রাজ্যস্তরে নিজের কাজের জন্য সমাদৃত হয়েছেন।

সন্দেহ নেই, ভোটের আগে সেবাশ্রয়ের মাধ্যমে নন্দীগ্রামের কোন্দলে মলম লাগাতে চাইছেন অভিষেক। প্রথমদিনে এটা স্পষ্ট যে, সেবাশ্রয় ব্যর্থ হবে না। কিন্তু গোষ্টীলড়াইয়ের ‘সেবামলম’ কার্যকর হবে কি? প্রশ্ন রয়ে গেল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement