হার না-মানা লড়াইকে সম্মান

অভিষেক দাস। তাঁতের সুতোয় রং লাগিয়ে মাসে ২,১০০ টাকা পান বাবা। তাই তাঁদের নিজেদের সংসারটাই বড় বে-রং। অভিষেকই প্রথম সেখানে একটু রঙের ছোঁয়া এনেছে। বাঁকুড়ার সোনামুখীর বিন্দুবাসিনী জুবিলি হাইস্কুল থেকে ৮৪% নম্বর নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করে।

Advertisement

মধুমিতা দত্ত

শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:১৯
Share:

মহাদেবী বিড়লা ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমির ছাত্রীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন এবিপি প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান অশোক গঙ্গোপাধ্যায়। শনিবার। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

অভিষেক দাস। তাঁতের সুতোয় রং লাগিয়ে মাসে ২,১০০ টাকা পান বাবা। তাই তাঁদের নিজেদের সংসারটাই বড় বে-রং। অভিষেকই প্রথম সেখানে একটু রঙের ছোঁয়া এনেছে। বাঁকুড়ার সোনামুখীর বিন্দুবাসিনী জুবিলি হাইস্কুল থেকে ৮৪% নম্বর নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করে।

Advertisement

রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে পুরুলিয়ার সত্যবান গড়াই। পিতৃহীন সত্যবান রোজগারের তাগিদে বহু দিন স্কুলেই যেতে পারে না। তবু এ বছর মাধ্যমিকে ৭১.৮% নম্বর ছিনিয়ে নিয়েছে সে।

আইসক্রিম বিক্রি করে পড়াশোনা চালিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর পানিপারুলের স্বপন জানা উচ্চ মাধ্যমিকে পেয়েছে ৮১% নম্বর। আপাতত স্থানীয় রামনগর কলেজে স্বপন বি কম পড়ছেন।

Advertisement

শনিবার এমন সব তারার আলোয় আলোকিত ছিল সায়েন্স সিটি-র প্রেক্ষাগৃহ। শত বাধা বিপত্তিকে তুচ্ছ করে যাঁরা এগিয়ে চলেছেন সফলতার পথে, ‘দ্য টেলিগ্রাফ স্কুল অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সেলেন্স’ অনুষ্ঠানে স্বীকৃতি পেল এদের লড়াই। হার না-মানা জেদে উজ্জ্বল এক ঝাঁক মুখ অনুপ্রাণিত করে গেল উপস্থিত সকলকে।

যেমন, মুর্শিবাদের চাঁদমনি বেগম। অভাবের সংসার। বাড়ির লোকে বলেছিলেন, ‘আর পড়া নয়, এ বার বিয়ে দিয়ে দেব’। বেঁকে বসেছিলেন চাঁদমনি। সংসারের জোয়ালের বদলে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে এখন কলেজে যান তিনি। বেলডাঙা কলেজে ভূগোলে অনার্স নিয়ে পড়ছেন চাঁদমনি।

মালদহের আমিনা খাতুনের পরিবারে ছ’জন। আমিনার বাবা ভাগচাষি। মাসে রোজগার বড় জোর চার হাজার টাকা। সেই পরিবারের মেয়ে আমিনা এখন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়েন।

শুধুই অভাবের বেড়াজাল ছিঁড়ে সাফল্যের মুখ দেখা নয়, শারীরিক বাধা ডিঙিয়েও কী ভাবে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, তেমন উদাহরণও শনিবারের এই সকালটিকে অন্য রকম করে তুলেছিল। জন্ম থেকেই দুরারোগ্য রোগে হাড় মজবুত হয়নি। শরীরও বাড়েনি সে ভাবে। তাই হুইলচেয়ারই বাহন ধ্রুব মলহোত্র-র। কিন্তু তার লেখা কবিতা যখন পড়ে শোনাচ্ছিলেন সঞ্চালক ব্যারি ও’ব্রায়েন, প্রেক্ষাগৃহের অনেকের চোখই তখন জল-চিকচিক করছিল। আর মঞ্চে হুইলচেয়ারে বসা ধ্রুবর মুখে হাসির ঝিলিক।

জগন্নাথ মাহারার দু’টো হাতই নেই। পিতৃহীন জগন্নাথের মা লটারির টিকিট বিক্রি করে সংসার চালান। এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেমে থাকেননি জগন্নাথ। ডান পায়ের আঙুল দিয়ে লিখে একের পর এক পরীক্ষায় পাশ করেছেন। এখন বিএ ক্লাসে।

এই সব হার না-মানাদের হাতে এ দিন পুরস্কার তুলে দিলেন এবিপি প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান অশোক গঙ্গোপাধ্যায় ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর দাস পুরকায়স্থের মতো বিশিষ্ট জনেরা। এ দিন সম্মানিত করা হল বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদেরও। পড়ুয়াদের বড় হওয়ার পিছনে, তাঁদের জীবনের ঝড়ঝাপটা সামলাতে মা-বাবা তথা অভিভাবকদের যে বড় ভূমিকা থাকে এ দিনের অনুষ্ঠানে তা-ও মনে করিয়ে দেওয়া হল। সম্মানিত করা হল এমন কয়েক জন অভিভাবককেও। সাহসিকতার জন্যও পুরস্কার পেলেন পড়ুয়ারা। প্রত্যেকেই নিজের জায়গায় ব্যতিক্রমী।

এমনই এক ব্যতিক্রমীকে সম্মানিত করা হল ‘দ্য টেলিগ্রাফ এডুকেশন ফাউন্ডেশন হল অব ফেম’ পুরস্কার দিয়ে। ব্রেন্ডন ম্যাকার্থে। জন্ম আয়ার্ল্যান্ডে। বিগত চল্লিশ বছর কলকাতাতেই তাঁর বসত। শিক্ষকতা করছেন দীর্ঘকাল। তার পরেও বস্তিতে বস্তিতে, রেল স্টেশনে অবহেলিত শিশু, নেশার অন্ধকারে ডুবতে বসা কিশোরদের আলোর পথে নিয়ে আসার পণ করেছেন। আত্মহত্যার পথে জীবনের লড়াইয়ে ছেদ টানতে চাওয়া কিশোরদের খোঁজখবর করে তাদের কাছে পৌঁছে যায় ‘সার্ভ’, ম্যাকার্থে যে সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠতা। ওই সব কিশোরকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। ম্যাকার্থেকে কুর্নিশ তারই স্বীকৃতিতে। একই ভাবে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সেরিব্রাল পলসির প্রতিষ্ঠাতা সুধা কউলকে সম্মানিত করা হল তাঁর অসামান্য কাজের জন্য। ‘দ্য টেলিগ্রাফ স্কুল অব দ্য ইয়ার’ হল মহাদেবী বিড়লা ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি এবং হেরিটেজ স্কুল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement