সভামঞ্চেই বচসা দুই মন্ত্রীর, ক্ষুব্ধ মমতা

অজস্র বার তাঁদের ডেকে বোঝানো হয়েছে। বহু বার সতর্কও করা হয়েছে। কখনও কলকাতায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে, কখনও জেলায় ভোটের প্রচারে গিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবু কাজ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই! বরং, এ বার পাট্টা দেওয়ার সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রকাশ্য কাজিয়ায় জড়িয়ে পড়লেন মালদহ জেলার দুই মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী ও সাবিত্রী মিত্র।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:৫৮
Share:

প্রকাশ্যে কাজিয়া। মঞ্চে কৃষ্ণেন্দু-সাবিত্রী। ছবি: মনোজ মুখোপাধ্যায়

অজস্র বার তাঁদের ডেকে বোঝানো হয়েছে। বহু বার সতর্কও করা হয়েছে। কখনও কলকাতায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে, কখনও জেলায় ভোটের প্রচারে গিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবু কাজ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই! বরং, এ বার পাট্টা দেওয়ার সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রকাশ্য কাজিয়ায় জড়িয়ে পড়লেন মালদহ জেলার দুই মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী ও সাবিত্রী মিত্র। জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক-সহ সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতিতে পরস্পরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে যে ভাবে তর্কাতর্কিতে জডিয়ে পড়েছেন দুই মন্ত্রী, রাজ্য রাজনীতিতে তা প্রায় নজিরবিহীন!

Advertisement

বিধানসভা ভোটের আগে জেলায় জেলায় গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়াই এখন তৃণমূল নেতৃত্বের প্রধান মাথাব্যথা। যে কারণে প্রতি শনিবার এক একটি জেলার নেতাদের কালীঘাটের বাড়িতে ডেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিতে হচ্ছে তৃণমূল নেত্রীকে। জেলার যে সব নেতার বিরুদ্ধে গোষ্ঠী-কোন্দলে মদত দেওয়ার অভিযোগ আছে, তাঁদের কড়া ভাষায় সতর্কও করছেন। আবার সে সব তিরস্কারের খবর বাইরে বেরিয়ে গেলে দলের ভাবমূর্তির স্বার্থে তা অস্বীকারও করতে হচ্ছে শাসক দলের নেতৃত্বকে! কিন্তু মালদহে কৃষ্ণেন্দু-সাবিত্রীর কাজিয়া আর ঢেকে রাখার জায়গাতেই নেই! অগত্যা বিধানসভা ভোটের আগে বিপদ বুঝে দু’জনকেই ফের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মালদহে সাম্প্রতিকতম কাজিয়ায় জড়িয়ে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দুর অভিযোগ, ‘‘আমি ইংরেজবাজারের বিধায়ক, পুরসভার চেয়ারম্যান! অথচ আমাকে না জানিয়েই ইংরেজবাজারের পাট্টাপ্রাপকদের তালিকা তৈরি হল? কে অনুমতি দিল?’’ আর সাবিত্রীর পাল্টা বক্তব্য, ‘‘দফতরের অফিসারদের সর্বসমক্ষে অসম্মান করা হয়েছে। আমি মেনে নেব না!’’

Advertisement

যে বিবাদের খবর পেয়ে দুই মন্ত্রীর প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর সাফ নির্দেশ, হয় তৃণমূল করতে হবে। নয়তো ঝগড়াই করতে হবে! দু’টো একসঙ্গে চলতে পারে না! দলে মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, ‘‘মালদহের মতো ছোট জেলা থেকে দু’জনকে মন্ত্রিসভায় রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অথচ ওঁরা যা করছেন, সামনে বিধানসভা ভোট না থাকলে দু’জনকে হয়তো এখনই মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো! আপাতত কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তাঁদের।’’ দলের তরফে মালদহের পর্যবেক্ষক শুভেন্দু অধিকারীও স্পষ্ট বলেছেন, ‘‘এমন ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। দু’জনকেই সতর্ক করা হয়েছে।’’

বিবাদের জেরে সরকারি অনুষ্ঠানেও এক সঙ্গে হাজির হতে দেখা যায় না কৃষ্ণেন্দু ও সাবিত্রীকে। মালদহ কলেজ অডিটোরিয়ামের সানাউল্লাহ মঞ্চে সরকারি পাট্টা বিলির অনুষ্ঠানে এ দিন অবশ্য ‘ব্যতিক্রম’ ঘটেছিল! এবং তার পরেই ধুন্ধুমার! উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতরের (যার মন্ত্রিত্ব সাবিত্রীর হাতে) উদ্যোগে ইংরেজবাজার, পুরাতন মালদহ ও গাজল ব্লক এলাকার ১২০ জন ভূমিহীনকে পাট্টা দেওয়া হচ্ছিল। তার মধ্যে ইংরেজবাজারের ৫৬ জন উপভোক্তার নাম ছিল। হাজির ছিলেন মন্ত্রী সাবিত্রী, জেলাশাসক শরদকুমার দ্বিবেদী, দুই অতিরিক্ত জেলা শাসক দেবতোষ মণ্ডল, কাঞ্চন চৌধুরী-সহ প্রশাসনিক আধিকারিকেরা।

কী হয়েছিল সে দিন মঞ্চে? পড়ুন- কাজিয়া কাহিনী

অনুষ্ঠানে একটু পরে পরে হাজির হয়ে পাট্টাপ্রাপকদের তালিকায় চোখ বুলিয়েই মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমিসংস্কার) কাঞ্চনবাবুকে ধমক দিয়ে বলেন, তাঁকে না জানিয়েই কেন ইংরেজবাজারের তালিকা তৈরি হল? পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে ধমক খেতে হয় দেবতোষবাবুকেও! আসনে বসেই সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী সাবিত্রীদেবী বলেন, ‘‘সকলকে জানিয়েই পাট্টা দেওয়া হচ্ছে। তোমাকেও (কৃষ্ণেন্দু) জানানো হয়েছিল!’’ এর পরেই প্রকাশ্য বচসা! কৃষ্ণেন্দু অভিযোগ করেন, ‘‘পাট্টা দেওয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা চাওয়া হয়েছিল। সম্পূর্ণ বেনিয়মে পাট্টা দেওয়া হচ্ছে!’’ পাল্টা মুখ খুলে সাবিত্রী বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই পাট্টা দেওয়া হচ্ছে।’’ উপভোক্তাদের একাংশ আবার দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘কেউ টাকা দিয়ে পাট্টা নিতে আসেনি!’’ বেগতিক দেখে মঞ্চ ছাড়েন জেলাশাসক। অন্য আধিকারিকেরা কৃষ্ণেন্দুকে বুঝিয়ে মঞ্চ থেকে নামান। পরে পুরাতন মালদহ ও গাজলের উপভোক্তাদের পাট্টা তুলে দেন সাবিত্রী।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement