Ijtema 2026

মুসলিমদের ধর্ম সম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হুমায়ুনের বাবরি নিয়ে নির্বিকার! বুধে ঘেরাও হয়ে শুক্রে কবীর ব্যস্ত জন্মদিনের প্রস্তুতিতে

মোট চারটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা জুড়ে বিঘার পর বিঘা জমিতে গড়ে উঠেছে ইজতেমা ময়দান। সেই ময়দানেই তৈরি হয়েছে শ’য়ে শ’য়ে তাঁবু, পার্কিংয়ের অন্তত পাঁচটি প্রকাণ্ড জায়গা, গড়ে উঠেছে একাধিক অস্থায়ী হাসপাতালও। যেগুলির পরিকাঠামোও নজর কাড়ার মতো।

Advertisement

শোভন চক্রবর্তী, ধনেখালি

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৪৭
Share:

হুগলির ধনেখালিতে বিশ্ব ইজতেমার জমায়েত, হুমায়ুন কবীর (ইনসেটে)। —নিজস্ব চিত্র।

মাইলের পর মাইল শুধু মানুষ আর মানুষ। শেষ নেই। প্রশাসনের হিসাবের বা‌ইরে চলে যাওয়া ভিড়। কিন্তু মুসলিমদের ধর্ম সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমার সেই গণজমায়েত কার্যত নির্বিকার হুমায়ুন কবীরের নির্মীয়মাণ বাবরি মসজিদ নিয়ে। আর তৃণমূলের সাসপেন্ডেড বিধায়ক তথা নতুন গড়ে ওঠা জনতা উন্নয়ন পার্টির শীর্ষ নেতা হুমায়ুন? বুধবার তিনি হুগলির ধনেখালি বিধানসভার অন্তর্গত ইজতেমা ময়দান পরিদর্শনে এসে ঘেরাওয়ের মুখে পড়েছিলেন। শুক্রবার, সম্মেলনের প্রথম দিনে তিনি ব্যস্ত রইলেন নিজের জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়ে। শনিবার হুমায়ুন ৬৩ বছর পূর্ণ করে ৬৪-তে পা দেবেন। শুক্রবার রাতে তাঁর ফোন একাধিক বার বেজে গেল। না-পেয়ে তাঁর নতুন দলের প্রেস সচিব কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি জানিয়ে দিলেন, ‘‘উনি আজকে ফোন ধরবেন না। খুব ব্যস্ত আছেন। কালকে ওঁর জন্মদিন।’’

Advertisement

দুর্গাপুর একপ্রেসওয়ের পর দাদপুর এলাকায় পড়ে মহেশ্বরপুর। সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার ভিতরে ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে ইজতেমা ময়দান। ঘটনাচক্রে এই রকমই এক হাইওয়ের ধারে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় গত ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করেছিলেন হুমায়ুন। সেখানেও ভিড় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ইজতেমায় যে পরিমাণ লোক হয়েছে, তার সঙ্গে বাবরি শিলান্যাসের ভিড়ের কোনও তুলনাই হয় না। তবে বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে হুমায়ুনের বাবরি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা, জল্পনা চলেছে এবং চলছে। তারই সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে গত ২২ ডিসেম্বর হুমায়ুনের নতুন দলঘোষণা। তবে ইজতেমার জমায়েত জুড়ে রয়েছে শুধুই ধর্ম। ইসলাম, কোরান, শরিয়ত ইত্যাদি। রাজনীতির ‘র’ সেখানে নেই।

ইজতেমাস্থলের উদ্দেশে যাচ্ছেন কাতারে কাতারে মানুষ। —নিজস্ব চিত্র।

শুক্রবার ইজতেমা শুরু হয়েছে। চলবে আগামী সোমবার দুপুর পর্যন্ত। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট, হুমায়ুনের বাবরি নিয়ে তাঁরা নির্বিকার। কেউ সরাসরি বলে দিলেন, ‘‘ওতে রাজনীতি আছে।’’ কেউ আবার বললেন, ‘‘ও নিয়ে ইজতেমা ময়দানে আলোচনা করা যায় না।’’ তবে ধর্ম সম্মেলনে যোগ দিতে আসা রাজ্য কিংবা রাজ্যের বাইরের ইসলাম ধর্মালম্বীরা প্রায় সকলেই হুমায়ুনের বাবরির নির্মাণের ব্যাপারে অবহিত।

Advertisement

ধনেখালিরই বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব সমীর মল্লিকের কথায়, ‘‘মসজিদ যে কেউ বানাতে পারেন। কিন্তু বাবরি নামটা নিয়েই তো বিতর্ক হচ্ছে। মসজিদ পবিত্র। সেখানে বিতর্ক থাকা ঠিক নয়। কারণ, রাজনীতি জুড়ে যাচ্ছে।’’ বিহারের পূর্ণিয়া থেকে ধর্ম সম্মেলনে এসেছেন আফতাব হোসেন খান। তিনিও হুমায়ুনের বাবরি সম্পর্কে শুনেছেন। তবে তাঁর কথায়, ‘‘নাম রাখলেই তো আর সব এক হয়ে যায় না!’’ দিল্লি থেকে আসা তরুণ আজহারউদ্দিন আনসারিও বলে দিলেন, ‘‘এই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজনীতি নিয়ে কথা বলব না।’’ এমন আরও অনেকের অভিমতে স্পষ্ট, তাঁরা নির্বিকার। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের সৌধ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২৯ বছর পরে সেই মামলার রায়ে ওই স্থানেই রামমন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। যা গড়েও উঠেছে।

ড্রোনের মধ্যমে তোলা ভিড়ের ছবি দেখছেন এক পুলিশকর্তা। —নিজস্ব চিত্র।

তবলিগী জামাতের তরফে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে বিশ্ব ইজতেমা করা হয়। ৩২ বছর আগে শেষ বার এ রকম ধর্ম সম্মেলন হয়েছিল হাওড়ার বাঁকড়ায়। দেশে শেষ বার হয়েছিল ২০১৮ সালে। বিহারের কিসানগঞ্জে। এ বছর হুগলিতে হচ্ছে ইজতেমা। যেখানে সরাসরি না-হলেও পরোক্ষ ভাবে জুড়ে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল। কারণ, লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য প্রশাসন রাস্তায়। শাসকদলের জনপ্রতিনিধিরাও কাজে জুড়ে রয়েছেন, দেখভাল করছেন। শুক্রবারও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত হাইওয়ের ধারে পুলিশের সহায়তা কেন্দ্রে বসে গোটা পরিস্থিতির তদারকি করলেন ধনেখালির তৃণমূল বিধায়ক অসীমা পাত্র। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা আসছেন, তাঁরা আমাদের অতিথি। তাঁদের আগলে রাখতে আমরা প্রস্তুত।’’ তবে অসীমাও মেনে নিয়েছেন, হিসাবের বাইরে ভিড় হয়েছে শুক্রবার। তাঁর এ-ও অনুমান, সোমবার ইজতেমার শেষ দিন জু্ম্মাবারের ভিড়কেও ছাপিয়ে যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক মহলের অনেকের অভিমত, সুসংহত ভাবে ইজতেমা সম্পন্ন করতে পারলে তার নির্বাচনী সুবিধা পাবে তৃণমূলই। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশক ধরেই রাজ্যের সংখ্যালঘু সমর্থন একচেটিয়া ভাবে তাদের দিকেই। বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে এ হেন ধর্ম সম্মেলন সময়ের কারণেই ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিমত তাঁদের।

মোট চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা জুড়ে বিঘার পর বিঘা চাষের জমিতে গড়ে উঠেছে ইজতেমা ময়দান। সে ময়দানেই তৈরি হয়েছে শ’য়ে শ’য়ে তাঁবু, পার্কিংয়ের অন্তত পাঁচটি প্রকাণ্ড জায়গা, গড়ে উঠেছে একাধিক অস্থায়ী হাসপাতালও। যেগুলির পরিকাঠামোও নজর কাড়ার মতো। প্রথম দিনেই অনেকে রোদ-ধুলোয় অসুস্থ হয়ে অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন। গুরুতর অসুস্থদের পাঠিয়ে দেওয়া হল সিঙ্গুর অথবা চুঁচুড়া সদর হাসপাতালে।

ভারতের বাইরে থেকেও সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন বহু মানুষ। এসেছেন বাংলাদেশ থেকেও। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশকর্তারা একান্ত আলোচনায় বলে দিচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে যাঁরা এসেছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণেই তাঁরা সেই পরিচয় ‘গোপন’ করছেন। আবার নেপালের বিরাটনগর থেকে আসা ৭০ ছুঁইছুঁই কামালউদ্দিন যেমন বলে দিলেন, ‘‘এই নিয়ে পাঁচটি বিশ্ব ইজতেমায় এলাম। ৩২ বছর আগে হাওড়াতেও এসেছিলাম। ভারতে আগরা এবং কিসানগঞ্জের ইজতামাতেও গিয়েছি।’’ ২০১৯ সালে নেপালের বিশ্ব ইজতেমাতেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

নেপাল থেকে বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে এসেছেন কামালউদ্দিন। —নিজস্ব চিত্র।

রাজ্যের সাধারণ প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষকর্তারা শুক্রবার উপস্থিত ছিলেন। ভিড় সামলাতে পুলিশকে এখন সারা ক্ষণই গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ঘটে যাওয়া মেসি-বিপর্যয়ের কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। যে ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারকে পর্যন্ত শো-কজ় করতে হয়েছিল নবান্নকে। সপ্তাহ দুয়েক আগে রাজীবও এসেছিলেন ইজতেমা ময়দানের পরিকাঠামো পরিদর্শনে। তবে শুক্রবার হিসাবের বাইরে ভিড় হওয়া নিয়ে এক পদস্থ আইপিএস একান্ত আলোচনায় বলেই দিলেন, ‘‘খোলা মাঠে বলে আমরা বেঁচে গেলাম। এখানে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি হবে না। কিন্তু ঘেরা জায়গা হলে আমাদের মুশকিল হত।’’ নির্যাস? আক্ষেপের সুরেই সেই পুলিশ কর্তা বললেন, ‘‘হয় আমরা ভিড় আন্দাজ করতে পারছি না। অথবা ভিড়ের ব্যাপারে আন্দাজ করতে চাইছি না।’’

সন্দেহ নেই যে-পরিমাণ মানুষ এই ধর্ম সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন বা আগামী তিন দিনে আসবেন, তাতে এই এলাকায় কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসা হবে। হচ্ছেও। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে একাধিক হোটেল, রেস্তরাঁ তাদের ফাঁকা জমিতে তাঁবু খাটিয়ে রাতে লোককে শয্যার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। শীতের রাতে কোথাও রাত প্রতি শয্যাভাড়া দৈনিক তিন হাজার, কোথাও আরও বেশি। একটি দোতলা হোটেলের ম্যানেজার তো বলেই দিলেন, ‘‘উপরের ফ্লোরের রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে ৪০টা বিছানা পেতে দিয়েছি। গতকাল এক রাতে ৮০ হাজার টাকা উঠে গিয়েছে।’’ আবার বহু লোক ট্রলি ব্যাগ বা অন্য ব্যাগে পোশাক, শীতের জিনিসপত্র নিয়ে চলে এসেছেন চার দিনের জন্য।

আপাতত ধনেখালির এই জনপদ আগামী চার দিন ‘ইজতেমানগর’। যেখানে মেসিকাণ্ডের কথা স্মরণে রেখে সতর্ক প্রশাসন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement