পুজোর ছুটিতেও স্কুল খোলা, পড়া-খেলায় মেতে পড়ুয়ারা

ঘটনা ১: হুমায়ুন কবীর শিশু শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু ছড়া বলা কিংবা রং চিনতে গিয়ে সে প্রায়ই হোঁচট খাচ্ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির সাতিকুল ইসলাম, সোহেল রানা শেখ, ইয়াসমিন খাতুন গুলিয়ে ফেলছিল ইংরেজির ‘ক্যাপিটাল ও স্মল লেটার’।

Advertisement

সেবাব্রত মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০১৫ ০০:২৪
Share:

সূতীঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে ক্লাস।

ঘটনা ১: হুমায়ুন কবীর শিশু শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু ছড়া বলা কিংবা রং চিনতে গিয়ে সে প্রায়ই হোঁচট খাচ্ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির সাতিকুল ইসলাম, সোহেল রানা শেখ, ইয়াসমিন খাতুন গুলিয়ে ফেলছিল ইংরেজির ‘ক্যাপিটাল ও স্মল লেটার’। ঋতুর নাম মনে থাকলেও ভুল হচ্ছিল বানান। ওরা অন্যদের তুলনায় যাতে পিছিয়ে না পড়ে সেই কারণে ওই পড়ুয়াদের নিয়ে পুজোর ছুটিতেও ক্লাস চলছে মুর্শিদাবাদের সূতীঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেই সঙ্গে পড়ুয়াদের ইচ্ছে মতো বাগান করা, খেলা, নাচ, গান, নাটকের মহড়াও চলছে।

Advertisement

ঘটনা ২: লেখাপড়ায় একেবারেই মন বসত না চতুর্থ শ্রেণির আনিসুর রহমানের। প্রায়ই স্কুল পালিয়ে চলে যেত খেতে। মাটি কুপিয়ে গাছ লাগিয়েই তার আনন্দ। একদিন বাড়ি গিয়ে তাকে ধরলেন স্কুলের শিক্ষক সেলিমউর রহমান। বললেন, ‘‘খেতে যাওয়ার দরকার নেই। তুই গাছ লাগাতে ভালবাসিস তো? স্কুলের বাগানে গাছ লাগা। চারা আমি এনে দেব।’’ আনিসুর মহা খুশি। সে এখন নিয়মিত স্কুলে গিয়ে বাগানের মাটি কোপায়, গাছের যত্ন করে। নাছোড় শিক্ষকেরাও। বাগান থেকেই ডেকে এনে চলে আনিসুরের ক্লাস। মাটি কোপাতে কোপাতে ইতিমধ্যেই সে মুখস্থ করে ফেলেছে তেরোর ঘরের নামতা!


পড়ার ফাঁকেই চলছে ফুটবল।

Advertisement

ভরা উৎসবের মরসুমে অন্য স্কুলগুলোতে যখন ছুটি চলছে তখন দিনভর পড়ুয়া-শিক্ষকদের ভিড়ে গমগম করছে বেলডাঙার সূতিঘাটা স্কুল। পিছিয়ে পড়া পড়ুয়ারা যেমন স্কুলে আসছে। তেমনি নাটকের মহড়া, নাচ-গান-বাগানের টানেও স্কুলে আসছে আরও অনেকে। শিক্ষকদের উদ্যোগ দেখে আপ্লুত গ্রামবাসীদের প্রতিক্রিয়া, ‘‘ধন্যি, আমাদের স্কুলের মাস্টাররা। আর ছেলেমেয়েরাও তেমন। ইস্কুলে যেতে পারলেই ওদের যেন আর কিছু চায় না।’’

কথাটা যে একেবারে কথার কথা নয় তা টের পাওয়া যায় স্কুলে গেলে। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে পুলিন্দার দিকে প্রায় তিন কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই সূতীঘাটা স্কুল। শিক্ষক রয়েছেন চার জন। পড়ুয়ার সংখ্যা ১০৯। সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি শিক্ষকেরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে জেনারেটর ও কম্পিউটর কিনেছেন। রয়েছে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা। স্কুলে দেওয়াল পত্রিকা তো ছিলই। গত শনিবার প্রথম প্রকাশিত হল ৫৬ পাতার পত্রিকা ‘কোরক’। সেখানে শিক্ষকদের সঙ্গে রয়েছে পড়ুয়া ও প্রাক্তনীদের লেখা। এ দিনই স্কুলের একটি ওয়েবসাইটও (www.sutighataprimaryschool.blogspot.in) খুলেছেন শিক্ষকেরা। তিন মাস আগে স্কুলের ৮৬ জন পড়ুয়ার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করানো হয়। সেই শংসাপত্রও তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে।

স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক মহম্মদ হিলালউদ্দিন জানান, সূতীঘাটা প্রত্যন্ত গ্রাম। যারা স্কুলে আসছে তাদের সিংহভাগই প্রথম প্রজন্মের। গত কয়েক বছরে স্কুলে নানা রকম ব্যবস্থা করে স্কুলছুট রুখে দেওয়া গিয়েছে। ভয়ে নয়, এখন প্রত্যেক পড়ুয়া স্কুলে আসে স্কুলকে ভালবেসেই। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে নাটক, আবৃত্তি, গানেও ওদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে সকলেই তো সমান নয়। সেই কারণে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের নিয়ে ছুটির সময়েও ক্লাস করানো হচ্ছে। হিলালউদ্দিন বলেন, ‘‘এলাকার সিংহভাগ বাসিন্দা গরিব। একটা সময় নাবালিকার বিয়ে ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। গত কয়েক বছর ধরে পড়ুয়াদের সঙ্গে নিয়ে এলাকার মানুষকে সচেতন করে সেই প্রবণতা অনেকটাই কমানো গিয়েছে।’’

স্কুলের আর এক শিক্ষক সেলিমউর রহমানের কথায়, ‘‘সরকারি সাহায্য তো মেলেই। কিন্তু তা দিয়ে আর সব ইচ্ছে পূরণ করা যায় না। তাই নিজেরাই টাকা জমিয়ে জেনারেটার কেনা-সহ অন্যান্য কাজকর্ম করতে পারছি। গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার চেষ্টায় স্কুলে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আর তাতে সবথেকে বেশি খুশি হয়েছে পড়ুয়ারা। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী
হতে পারে!’’

মুর্শিদাবাদ জেলা স্কুল পরিদর্শক (প্রাথমিক) সুমিতা মণ্ডল বলছেন, ‘‘রাজ্যের বহু স্কুলের অন্যতম বড় সমস্যা স্কুলছুট। সূতীঘাটার ওই স্কুলে যে ভাবে স্কুলছুট রুখে দেওয়া হয়েছে, পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের কথা ভেবে যে ভাবে শিক্ষকেরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে ছুটির দিনেও পড়াচ্ছেন তা গোটা রাজ্যের কাছেই নজির হতে পারে।’’ চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া শর্মিলা খাতুন, নাসিমা খাতুন, আনিসুর রহমানরা বলছিল, ‘‘জানো, পড়াশোনা হয়ে গেলে আমরা কম্পিউটরে ছবি দেখি, গান গাই, নাটক করি। বাড়ির থেকেও আমাদের স্কুলে থাকতেই বেশি ভাল লাগে।’’

শুক্রবার স্কুল ছুটির পরে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল আনিসুরও। তাকে ডেকে সেলিমউর বললেন, ‘‘ওরে, বাগানের পূব দিকের টগরের গাছগুলো যে শুকিয়ে যাচ্ছে। কাল এসে জল দিবি।’’ এক ছুটে স্কুলের গেটের দিকে যেতে যেতে আনিসুরের জবাব এল, ‘‘সে আর বলতে হবে না স্যার, কাল সকাল সকাল চলে আসব।’’

‘‘আনিসুর নামতায় এখন আগের থেকে অনেকটাই দড় হয়েছে। তবে সরলটাতে বেশ গোলমাল করছে। কাল ওটা নিয়েই বসতে হবে।’’ মুচকি হাসছেন সেলিমউর।

ছবি: গৌতম প্রামাণিক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement