উদ্বিগ্ন আসানসোল হোমিওপ্যাথি কলেজে পড়ুয়ারা। নিজস্ব চিত্র।
ভোর রাতে মোবাইলটা বেজে উঠেছিল। ফোনের ও পার থেকে মায়ের কাঁদো-কাঁদো গলার স্বর শুনে বুক কেঁপে গিয়েছে। সোমবারের সকালটা যে এ ভাবে শুরু হবে তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি আসানসোলের হোমিওপ্যাথি কলেজের পড়ুয়া রইসরাম সোমচাঁদ। এ দিন ভূমিকম্প বিধ্বস্ত মনিপুরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁদের বাড়িও। খবরটা শোনার পর থেকেই তিনি মনমরা হয়ে বসে রয়েছেন। ঠিক তাঁরই মতো অবস্থা আরও জনা কয়েক পড়ুয়ার। বাড়িতে ঘনঘন ফোন করে খবর নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই তাঁদের।
আসানসোলের হোমিওপ্যাথি কলেজে প্রতি বছরই মনিপুরের বেশ কিছু পড়ুয়া আসেন। মাস চারেক আগে আসানসোলে এসেছেন রইসরাম সোমচাঁদ। তাঁর বাড়ি ইম্ফল থেকে কিছুটা দূরে সোরাইয়ে। তিনি জানান, ভূমিকম্পে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে বাড়ি। পরিবারের সকলে খোলা আকাশের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ভোরে প্রথমে মায়ের ফোনে শুনেছেন এই দুর্ঘটনার কথা। তার পর থেকেই বারবার ফোন করে সকলের খোঁজ নিচ্ছেন।
এ দিন দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ কলেজেই দেখা হল রইসরামের সঙ্গে। আরও কয়েক জন মনিপুরের পড়ুয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমর্ষ হয়ে বসে রয়েছেন। প্রত্যেকেরই এক অবস্থা। রইসরাম বলেন, ‘‘খবরটা শোনার পরে থেকে স্থির থাকতে পারছি না। মা-বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। শুনলাম ওঁদের সারা দিন কিছু খাওয়া হয়নি।’’ বাড়ির সকলের কথা ভেবে রাইসরামও এ দিন খাবার মুখে তুলতে পারেননি।
ইম্ফল থেকে কিছুটা দূরের শহর খুমমনের বাসিন্দা নভেল ভারতী বছরখানেক আগে ডাক্তারি পড়তে আসানসোলে এসেছেন। তিনি জানান, সোমবার সকালে প্রথম খবরটা পান কলেজের বন্ধুদের কাছে। শোনার পরেই মনে পড়েছে পাঁচ বছরের ভাই টিঙ্কুর কথা। দুপুরে তিনি বলেন, ‘‘সকাল থেকেই বাড়িতে ফোন করছি। কেউ ধরছে না। খুব চিন্তায় রয়েছি।’’ পরে তিনি বাড়ির ফোন পেয়েছেন। জানা গিয়েছে, তাঁদের এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ প্রচুর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁদের বাড়িও। বাড়ির সকলে ব্যস্ত ছিলেন ধ্বংসাবশেষ সরাতে। ওই এলাকার বাসিন্দা সনাতন টোম্বিও বছরখানেক আগে আসানসোলে এসেছেন। টিভি দেখে ভূমিকম্পের খবর পান তিনি। তাঁর ভাইয়ের একটি দোকান রয়েছে। ভাইকে ফোন করে জেনেছেন, প্রায় পঁচিশটি দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘তবে ভাইয়ের দোকানটি রক্ষা পেয়েছে। বাড়ির সকলেও ভাল আছে বলে জেনেছি।’’
মনিপুরের পড়ুয়াদের এ দিন সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন অন্য পড়ুয়ারা। কলেজের অধ্যক্ষ রোহিনী মণ্ডল এ দিন কলেজে না এলেও বারবার পড়ুয়াদের খোঁজ নিয়েছেন। সব রকমের সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রভাপ্রসাদ নন্দী মজুমদারের বাড়ি অসমের শিলচরের মালু গ্রামে। তাঁর বহু আত্মীয় সেখানে থাকেন। ইম্ফলেও অনেক পরিচিত রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘ভূমিকম্পের উৎসস্থল শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তবে সবাই সুস্থ আছেন বলে খবর পেয়েছি।’’ তবে তিনি জানান, সেখানে বহু বাড়িঘর ভেঙে গিয়েছে।