বীরভূমে সিউড়ির কাছে খটঙ্গায় একটি ইটভাটা। ছবি: তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়।
যাও বা সাহস করে এক পা এগিয়েছিল পুলিশ-প্রশাসন, কয়েক ঘা পড়তেই মাঠ ছাড়ল। বুধবার বেলডাঙায় বিড়ি শ্রমিক শিশুদের উদ্ধার করতে গিয়ে গ্রামবাসীর হাতে মার খেয়েছিল পুলিশ। প্রাথমিক চিকিৎসার বেশি অবশ্য প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু ‘ওষুধ’-এ কাজ হয়েছে। বৃহস্পতিবার শ্রম দফতরের সিদ্ধান্ত— যা করার তা করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। ইটভাটা কিংবা বিড়ি কারখানায় শৈশবের বন্দিদশা ঘোচানোর সেটাই নাকি সেরা পথ।
আজ, শুক্রবার, শিশুশ্রম বিরোধী দিবসে সচেতনতা বাড়াতে জেলা শ্রম দফতর একটি শিবিরের আয়োজন করেছে। শিশুশ্রমিকদের অধিকাংশ সুতি, বেলডাঙার মতো ব্লকগুলিতে ছড়িয়ে থাকলেও, এ দিনের আলোচনা হবে বহরমপুর শহরে। জেলার শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রশ্ন, জেলা প্রশাসনের কর্তারা এসি ঘরে বসে কাদের সচেতন করবেন?
যে বাবা-মায়েরা শিশুদের বাজি কারখানার মতো বিপজ্জনক জায়গায় কাজে পাঠায়, যে ব্যবসায়ীরা কম পয়সায় মজুর পাওয়ার লোভে শিশুদের কার্যত ক্রীতদাস করে রাখে, ‘আলোচনা’-র মাধ্যমে কতটা ‘সচেতন’ হতে পারে, সে প্রশ্ন তুলছেন শিশুশ্রম নিয়ে আন্দোলনে যুক্তরা। তাঁদের একজনের প্রশ্ন, ‘‘ এমন আলোচনায় কী ভাবে, কতদিনে শিশুশ্রম বন্ধ হবে? যেখানে শ্রম আধিকারিক ও পুলিশ মার খেয়েছেন, সেখান থেকেই তো সচেতন করার প্রথম পদক্ষেপ করা যেত।’’
বুধবার বেলডাঙার কাপাসডাঙায় একটি বিড়ি কারখানা থেকে পাঁচ জন শিশু শ্রমিককে উদ্ধার করতে গিয়ে মার খেয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের শ্রম দফতরের কয়েকজন কর্তা। ওই শিশুদেরও ছিনিয়ে নেয় এলাকার লোক। এরপরেই জেলা শ্রম দফতরের ডেপুটি কমিশনার চন্দন দাশগুপ্ত জানান, শিশুশ্রম বন্ধ করতে গেলে নিচুতলা থেকেই ‘‘সামাজিক সচেতনতা’’ গড়ে তুলতে হবে।
পিংলার বাজি কারখানার বিস্ফোরণে সুতি ২ ব্লকের ৯জন শিশু ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রাণ হারানোর পরেও প্রশাসনিক কর্তারা অরঙ্গাবাদে স্কুলছাত্র, শিক্ষক ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের নিয়ে আলোচনা করে দায় সেরেছিলেন। সে বার প্রবল গরমে বক্তাদের জন্য অপেক্ষা করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বেশ কিছু শিশু।
সত্যিই কি আলোচনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই সরকারের?
দীর্ঘদিন শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন এমন এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার জেলা কর্তা জয়ন্ত চৌধুরী বলছেন, ‘‘বর্তমান আইনে মুর্শিদাবাদে বাড়িতে বিড়ির বাঁধার কাজে জড়িত শিশুদের ‘শ্রমিক’ পর্যায়ে আর ফেলা যাবে না। অন্যান্য ক্ষেত্রে শিশু শ্রমিক রুখতে গেলে প্রথম দরকার সমস্ত শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানো। পরে স্কুল কামাই-করা শিশুদের সনাক্ত করতে একটি সফটওয়্যার পাঠানো দরকার স্কুলগুলিতে। তা থেকেই উঠে আসবে জেলায় শিশু শ্রমের বাস্তব চিত্রটা কী। যতক্ষণ না জেলার বাস্তব অবস্থাটা চিহ্নিত করা যাবে, ততক্ষণ সচেতনতা তৈরির শহুরে বৈঠক কাজে দেবে না।’’
শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত একটি জাতীয় সংস্থার মুখপাত্র জানান, শিশুশ্রম রুখতে রাজ্যে আইন রয়েছে। আছে শ্রম দফতর-সমাজকল্যাণ দফতরের একাধিক বিভাগ। রয়েছে শিশু সুরক্ষা কমিশনও। কিন্তু নেই শুধু সক্রিয়তা। ‘ইনস্পেকশন’ বা নজরদারি হয় না বললেই চলে। যেমন পিংলার কারখানায় শিশুরা বেশ কয়েক মাস কাজ করা সত্ত্বেও, সেখানে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানত না প্রশাসন। কখনও সখনও আধিকারিকরা তদন্তে গিয়ে শিশু নিয়োগকারীদের ধরলেও, রাজনৈতিক যোগসাজশ থাকায় অভিযুক্তদের ছেড়ে দিতে হয়।
পিংলায় কী করে শিশুদের দিয়ে বাজি বানানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছিল, সেই প্রশ্ন তুলে প্রশাসনকে ভর্ৎসনা করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর মন্তব্য করেছিলেন, রাজ্যের কোথায় কী ঘটছে সে ব্যাপারে প্রশাসনের নজর নেই। শিশু-অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থারও অভিযোগ, শিশুদের পক্ষে বিপজ্জনক ১৫টি জীবিকা ও ৫৭টি পেশার বিস্তারিত তালিকা রয়েছে ১৯৮৬ সালের ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইনে’। কিন্তু সেখানে শিশুদের ব্যবহার আটকানোর কোনও সদিচ্ছা প্রশাসনের নেই।
কী রকম?
মুর্শিদাবাদের কথাই ধরা যাক। এই মুহূর্তে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কত, সেই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি জেলা শ্রম দফতরের কাছে। সম্প্রতি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে, অন্য পেশার কথা বাদ দিলে শুধুমাত্র বিড়ি শিল্পেই মুর্শিদাবাদে ৬ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স ১০ বছরের নীচে। অর্থাৎ ১ লক্ষ ২০ হাজার শিশু বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অথচ ১৪০টি শিশু শ্রমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন কার্যত অচল। ছাত্রদের মাসিক ভাতা বন্ধ। ফলে বিড়ির বাইরেও ইটভাটা, পাথর খাদান, কৃষি সবেতেই শিশু শ্রম ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচনার মাধ্যমে শিশুশ্রম দূর করার পরিকল্পনা অবাস্তব, বলছে শ্রমিক সংগঠনগুলিও। বাম শ্রমিক সংগঠন সিটুর জেলা সভাপতি আবুল হাসনাত খান বলছেন, ‘‘বহরমপুর সদরে হলঘরে বসে সেমিনার করলে জেলা থেকে শিশুশ্রম দূর হবে না। মুর্শিদাবাদে বিড়ি বাঁধা পারিবারিক শিল্প। একে বন্ধ করতে গেলে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। সে ভাবনাটাই নেই প্রশাসনের।’’ আইএনটিইউসির বিড়ি শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক বাদশার আলি বলেন, ‘‘এ জেলায় সরকারি পর্যায়ে শিশুশ্রম নিয়ে কোনও সমীক্ষা সাম্প্রতিক কালে করা হয়নি। পিংলায় বিস্ফোরণে নতুন চাঁদরার শিশু শ্রমিকদের মৃত্যু থেকেই সামনে এসেছে এ জেলায় শিশু শ্রমের ভয়াবহ চিত্রটা। যাতে জেলা শাসককেও হুঁসিয়ারি দিতে হয়েছে, শিশু সুরক্ষা কমিশনকেও লজ্জিত করেছে। কিন্তু তার নিট ফল এখনও শূন্য।’’ তাঁর আক্ষেপ, সুতির পাথর খাদানে এখনও শিশু শ্রমিকরা কাজ করছে। বিড়ি কারখানায় পান্ডা-র (বিড়ি বান্ডিল করার) কাজ করছে সেই বছর চোদ্দ-র শিশুরাই।
২০১১ সালের জনগণনার তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ৫-১৪ বছরের শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষেরও বেশি। পুরো সময়ের জন্য যে শিশুরা কাজ করছে, তাদের সংখ্যা কমলেও, আংশিক সময় কাজ করে এমন শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি বিবৃতিতে এ বিষয়গুলি প্রায়ই প্রকাশ পায় না।
নাবালিকা বিবাহ বন্ধ করতে প্রশাসন ‘সচেতনতা’ তৈরির ভরসায় বসে থাকেনি। বিডিও, সমাজকল্যাণ দফতর, শিশু সুরক্ষা কর্মীরা বহু ঝুঁকি নিয়েও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিয়ে বন্ধ করছেন। তা হলে শিশু শ্রম বন্ধ করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়তে না পড়তেই কেন এত সহজে পিছিয়ে আসবে প্রশাসন? কেন কয়েক লক্ষ শিশুশ্রমিকের বিপদের চাইতে গুটিকতক আধিকারিকের নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে? শিশুদের কাজে লাগায় যে ইটভাটা মালিক, বাজি কারখানার মালিক, বিড়ি কারখানার মালিক, তাদের সামনে কি তবে রাষ্ট্রশক্তিও অসহায়?
শিশুশ্রম বিরোধী দিবসে নতুন চাঁদরায় নিহত শিশুরা যেন নিঃশব্দে এ প্রশ্নগুলোই করে চলেছে।