গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।
শুরু হয়েছিল সেই ২৮ ফেব্রুয়ারি। অবশেষে সমঝোতা হল। মিটল ১০৮ দিনের যুদ্ধ-উত্তেজনা। যুদ্ধ যে এত দিন চলবে, তা শুরুতে অনুমান করতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন, তিন-চার সপ্তাহেই যুদ্ধ মিটে যাবে। তবে তা হয়নি। আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। হরমুজ়ে ‘অবরোধ’-এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। এত দিনে শান্তি ফিরল পশ্চিম এশিয়ায়।
গত সাড়ে তিন মাস ধরে যেমন ঘন ঘন বোমাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোনের হামলা দেখা গিয়েছে, তেমনই দেখা গিয়েছে শান্তি ফেরানোর চেষ্টাও। কখনও কখনও শান্তি আলোচনা এবং সংঘর্ষ উভয়ই চলেছে একই সঙ্গে। দফায় দফায় আলোচনার পরে অবশেষে ইতি পড়ল যুদ্ধে। সাড়ে তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মোড় একনজরে।
২৮ ফেব্রুয়ারি: যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত খামেনেই, ১৬৮ শিশুর মৃত্যু
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল একযোগে হামলা চালায় ইরানে। তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে, সেই সন্দেহ থেকেই তেহরানে হামলা চালায় তারা। হামলায় নিহত হন সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। সেই থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত। প্রত্যাঘাত করে ইরানও। ইজ়রায়েলকে লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছুড়তে শুরু করে তারা। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে। সেগুলিকেও নিশানা করে ইরান। রাতারাতি সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে। সংঘর্ষের প্রথম দিনেই ইরানের দক্ষিণ প্রান্তে মিনাব শহরের এক স্কুলে হামলা হয়। তাতে অন্তত ১৬৮ জন শিশু এবং ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন। প্রাথমিক ভাবে ঘটনার কথা স্বীকার করলেও দায় নিয়ে চায়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পরে জানা যায়, ওই হামলা চালিয়েছিল আমেরিকার বাহিনীই। লক্ষ্যবস্তু বাছতে ‘ভুল’ হয়েছিল তাদের।
১ মার্চ: গোটা পশ্চিম এশিয়ায় ছড়াল যুদ্ধ
হামলার ধাক্কা কাটিয়ে প্রত্যাঘাত শুরু করে ইরানও। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বিভিন্ন বন্ধুদেশকে লক্ষ্য করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে শুরু করে ইরান। নিশানায় ছিল ওই দেশগুলিতে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি। তেহরানের প্রত্যাঘাতে মার্কিন বাহিনীতে প্রথম মৃত্যু হয় ১ মার্চ। পরের দিন, ২ মার্চ সেই তথ্য প্রকাশ করে বাহিনী। কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে ইরানি হানায় নিহত হন মার্কিন বাহিনীর ছ’জন সদস্য। তার পরেও কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ আমেরিকার বিভিন্ন বন্ধু দেশে ধারাবাহিক আক্রমণ চালাতে থাকে তেহরান। মুহুর্মুহু চলে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বর্ষণ।
২ মার্চ: সংঘর্ষে হিজ়বুল্লাও
লেবাননের দক্ষিণ প্রান্তে দীর্ঘ দিন ধরে সক্রিয় ইরানের মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা। ইজ়রায়েলের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই সংঘর্ষ চলছিল। ইরান-যুদ্ধ শুরুর পর সেই সংঘাত আরও বৃদ্ধি পায়। আমেরিকা-ইজ়রায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়ে হিজ়বুল্লাও।
৮ মার্চ: ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা
সংঘর্ষের মাঝেই খামেনেইয়ের উত্তরসূরি বেছে নেয় ইরান। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন খামেনেই-পুত্র মোজতবা খামেনেই। তবে ট্রাম্প শুরু থেকেই এই নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছিলেন। মোজতবা যে তাঁর ‘পছন্দের পাত্র’ নন, তা তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
১১-১২ মার্চ: হরমুজ় অবরোধ
হরমুজ় প্রণালী এবং সংলগ্ন জলপথে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে ইরান। ১১ মার্চ অন্তত তিনটি জাহাজে ইরান হামলা চালায়। বিশ্বে যে পরিমাণ অশোধিত তেলের বাণিজ্য হয়, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে হরমুজ় দিয়ে। সেখানে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দামও বৃদ্ধি পায়। পরের দিন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রথম বিবৃতি প্রকাশ্যে আসে। লিখিত ওই বিবৃতিতে হরমুজ়ে অবরোধ জারি রাখার জন্য ইরানি বাহিনীকে নির্দেশ দেন তিনি। কিছু ভারত-সহ ‘বন্ধু’ দেশ ছাড়া বেশির ভাগ দেশের জাহাজকেই হরমুজ় পেরোতে বাধা দিতে শুরু করে ইরান।
১৩-১৮ মার্চ: সংঘর্ষ আরও তীব্র
ইরান যত তেল রফতানি করে, তার প্রায় ৯০ শতাংশ যায় খার্গ দ্বীপ হয়ে। গত ১৩ মার্চ সেখানে বোমা মারে মার্কিন বাহিনী। যদিও আমেরিকার দাবি, তারা শুধু সামরিক স্থাপনাতেই হামলা করেছে। এর পরে গত ১৭ মার্চ ইজ়রায়েলি হানায় নিহত হন ইরানের দুই শীর্ষ নেতা— জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি এবং আইআরজিসি-র বাসিজ় বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি। তাতে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে হামলা এবং পাল্টা হামলা শুরু হয়। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায় ইজ়রায়েল। কাতারের শিল্পশহর রাস লাফানে পাল্টা হামলা চালায় ইরানও। এটি বিশ্বব্যাপী এলপিজি রফতানির অন্যতম বড় কেন্দ্র।
২৩ মার্চ: আলোচনার প্রথম ইঙ্গিত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, আমেরিকা এবং ইরান যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই ছিল কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার প্রথম প্রকাশ্য ইঙ্গিত।
৩ এপ্রিল: ধ্বংস মার্কিন যুদ্ধবিমান
ইরানের বাহিনী গুলি করে নামায় আমেরিকার এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে। বিমানটি মার্কিন বাহিনীর দু’জন সদস্য ছিলেন। প্রথমে এক জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। দ্বিতীয় জনের খোঁজে দু’দিন ধরে অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম কোনও মার্কিন যুদ্ধবিমান গুলি করে নামায় ইরান।
৭ এপ্রিল: দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা
ইরানের সঙ্গে দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাতে ইজ়রায়েল এবং লেবানন (হিজ়বুল্লা গোষ্ঠী) সংঘর্ষের বিষয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। ঘটনাচক্রে, তার পরের দিনই লেবাননে ১০০টিরও বেশি নিশানায় আঘাত হানে ইজ়রায়েলি বাহিনী।
১১-১২ এপ্রিল: ব্যর্থ ইসলামাবাদ বৈঠক, হরমুজ়ে ‘পাল্টা’ অবরোধ
আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ থামাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে পাকিস্তান। গত ১১ এপ্রিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে যায়। অন্য দিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে পাকিস্তানে পৌঁছোয় তেহরানের প্রতিনিধিদলও। ইসলামাবাদে প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। কিন্তু কোনও রফাসূত্র বেরোয়নি। তার পরে আমেরিকাও ইরানের দিকে যাতায়াত করা জাহাজের উপর ‘অবরোধ’ ঘোষণা করে।
১৬ এপ্রিল: ইজ়রায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি
আমেরিকার মধ্যস্থতায় গত ১৬ এপ্রিল ইজ়রায়েল এবং লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি হয়। তার আগে গত ১৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনে আলোচনায় বসে ইজ়রায়েল এবং লেবানন। লেবানন সরকার সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হলেও তাতে সায় ছিল না হিজ়বুল্লার। ফলে শীঘ্রই ফের সংঘর্ষ বাধে।
২১ এপ্রিল: আমেরিকা-ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদবৃদ্ধি
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সেই মেয়াদ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। জানান, শান্তি আলোচনার নতুন কোনও প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ইরানকে সময় দিতে চান তিনি।
১ মে: মার্কিন কংগ্রেসে যুদ্ধ-চিঠি
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু হওয়া যে কোনও যুদ্ধের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত। প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতাবলে ওই সময়সীমা পর্যন্ত সংঘাত চালিয়ে যেতে পারেন তিনি। এর পর সেনা প্রত্যাহারের জন্য অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় আরও নিতে পারেন। গত ১ মে মার্কিন কংগ্রেসে চিঠি লিখে ট্রাম্প জানান, গত ৭ এপ্রিল থেকে দু’পক্ষের মধ্যে আর কোনও গোলাগুলির বিনিময় হয়নি।
১৮-২৩ মে: আলোচনার জন্য হামলা ‘স্থগিত’
ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানে নতুন করে হামলায় অনুমোদন দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য ইরানকে আরও সময় দিতে চান তিনি। তাই সেই হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে। কয়েক দিন পরে ট্রাম্প জানান, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা কাটাতে একটি মউ স্বাক্ষরের বিষয়ে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েক জন রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে সেই মউ-এ কী রয়েছে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, লেবানন-সহ সর্বত্র যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা ছিল প্রস্তাবে। পরিবর্তে ইরানও হরমুজ়ে কোনও শুল্ক নেবে না এবং আমেরিকাও অবরোধ তুলে নেবে।
২৬ মে-১০ জুন: ফের যুদ্ধের উত্তেজনা
যুদ্ধবিরতির মাঝেই ফের দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায়। কখনও ইরানের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালায় আমেরিকা। আবার হরমুজ়ের কাছে আমেরিকার অ্যাপাচে হেলিকপ্টারও ধ্বংস হয়। মার্কিন হানার জবাবে বাহরিন, কুয়েত, জর্ডনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরানও। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে তেহরানে আরও জোরালো হামলার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প।
১২-১৩ জুন: সমঝোতার দোরগোড়ায়
ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়া চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে দারুণ একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছি। আমরা (চুক্তি) স্বাক্ষর করলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে হরমুজ় প্রণালী খুলে যাবে। চুক্তি তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি হতে পারে।” অন্য দিকে আরাঘচিও বলেন, ‘‘ইসলামাবাদ মউ সমঝোতাটি শেষের পথে। এক-দু’দিন বা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। তবে সেটি চূড়ান্ত হওয়ার পরে সই হলেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। আমরা তা নিয়ে আরও আলোচনা করব।’’ পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ১৪ জুনই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
১৫ জুন: শান্তিচুক্তি
সাড়ে তিন মাস ধরে চলা সংঘর্ষে অবশেষে ইতি পড়ল। চূড়ান্ত হল আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি। জুনের শুরুর দিক থেকে পাকিস্তান ফের মধ্যস্থতায় উদ্যোগী হয়। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান থেকে ফোন গিয়েছিল ট্রাম্পের কাছে। ফোন করেছিলেন সে দেশের সেনাপ্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এ ছাড়া কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বিন জ়ায়েদ আল নাহয়ান ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক চেষ্টার পর অবশেষে শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হল।