ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে কি এ বার ইতি! — ফাইল চিত্র।
পশ্চিম এশিয়ায় শীঘ্রই ইতি পড়ছে সংঘাতে? আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সেই সংক্রান্ত সমঝোতা আর কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এমনটাই জানালেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে সংঘাতের নেপথ্যে অন্যতম কারণ তেহরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে এখনই আলোচনা হবে না ওয়াশিংটনের সঙ্গে। তা হবে আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে। মউ স্বাক্ষরের পরে ইরান হরমুজ় খুলে দিলেও যুদ্ধের আগে যেমন ছিল, তেমনটা আর হবে না। এমনটাই জানিয়েছেন আরাঘচি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছিলেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শেষ করতে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। সে সময় তা মানেনি ইরান। এ বার আরাঘচিও একই সুরে কথা বললেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানে হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল। পাল্টা হামলা করছে ইরানও। ইসলামাবাদে শান্তি বৈঠকে দুই পক্ষ বসলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আরাঘচি সেই সংঘাতে ইতি পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘ইসলামাবাদ মউ সমঝোতাটি শেষের পথে। এক-দু’দিন বা কয়েক দিনেই শেষ হয়ে যাবে। তবে সেটি চূড়ান্ত হওয়ার পরে সই হলেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। আমরা তা নিয়ে আরও আলোচনা করব।’’
আরাঘচি জানান, বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইতি টানবে ‘ইসলামাবাদ মউ’। এমনকি, লেবাননেও সংঘাত শেষ হবে। মউয়ে স্পষ্টই বলা হয়েছে, তা স্বাক্ষরিত হলে দুই পক্ষই পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে। পরস্পরের বিরুদ্ধে নতুন করে সংঘাতে জড়াবে না, হুমকিও দেবে না। মউ স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের সম্পর্কও নতুন পথে চলবে বলে মনে করেন আরাঘচি। তাঁর কথায়, ‘‘গত ৪৭ বছরে এই প্রথম ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়েছে আমেরিকা। তা লিখিত ভাবে জানিয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না। আমাদেরও অনুরোধ করেছে, যাতে ওদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা হস্তক্ষেপ না করি।’’ আরাঘচির বক্তব্য থেকে মূলত পাঁচটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে।
প্রথম পদক্ষেপ
আরাঘচি জানিয়েছেন, ‘ইসলামাবাদ মউ’ হল আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ। এই মউয়ের সাফল্যের উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের চুক্তি। আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে দ্বিতীয় ধাপে আলোচনা হবে। তা নিয়ে সম্মত হয়েছে ইরান এবং আমেরিকা উভয়ই। আরাঘচির কথায়, ‘‘যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে এই আলোচনা হবে দু’টি পর্বে।’’ দ্বিতীয় পর্বে হবে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা, যাতে সময় লাগতে পারে ৬০ দিন। আরাঘচির দাবি, এখন যা পরিস্থিতি, তাতে তেহরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলতে পারে না।
হরমুজ় প্রণালী
আমেরিকা হামলা শুরু করার পরে হরমুজ় অবরুদ্ধ করেছিল ইরান। এপ্রিল থেকে পাল্টা সেখানে প্রহরা বসায় আমেরিকাও। ফলে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়। তার প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্বের জ্বালানির বাজারে। আরাঘচি জানিয়েছেন, সংঘাত শুরু আগে হরমুজ় দিয়ে যে ভাবে পারাপার চলত, এখন আর তা হবে না। সংঘাতের পরে ইরান দাবি করেছিল, হরমুজ় পারাপার করতে গেলে শুল্ক দিতে হবে। মনে করা হচ্ছে, তেহরান সেই পথেই এগোতে চাইছে। চুক্তিতে তা স্থির করতে পারে।
সার্বভৌমত্বকে সম্মান
আরাঘচি বার বার জানিয়েছে, মউ স্বাক্ষরের অন্যতম শর্ত হল দুই দেশকে পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে। সেই সম্মানই হবে আগামী দিনের চুক্তির ভিত্তি। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে। তাতে হস্তক্ষেপ করবে না। তেহরানকেও একই অনুরোধ করেছে আমেরিকা।
হরমুজ়ের সুরক্ষা
ইরান ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছে, চুক্তি হয়ে গেলে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ পারাপারের দায়িত্ব নেবে তারাই। সে জন্য সব রকম ব্যবস্থা করবে। চুক্তির শর্ত অনুসারে, বিধিনিষেধও তুলে নেবে। তবে কিছু শর্তও থাকতে পারে বলে খবর।
অনুদান-প্রসঙ্গ
সংঘাতের আবহে বিভিন্ন দেশে ইরানের সম্পদ ব্লক করা হয়েছিল। তেহরানের আশা, তা নিয়েও আলোচনা হবে। আরাঘচির কথায়, ‘‘ইরানের ব্লক হয়ে যাওয়া অনুদানের বিষয় নিয়েও প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়েছে।’’
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে দারুণ একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছি। আমরা (চুক্তি) স্বাক্ষর করলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে হরমুজ় প্রণালী খুলে যাবে। চুক্তি তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি হতে পারে। হয়তো সপ্তাহের শেষেই ইউরোপে হয়ে যেতে পারে।” যদিও ইরান সে সময় তা মানেনি। তাদের দাবি ছিল, সম্ভাব্য চুক্তির যে খসড়া, তা এখনও চূড়ান্ত করেনি ইরান। এ বার আরাঘচির গলাতেও ট্রাম্পের সুর শোনা গেল।