ইজ়রায়েলি বন্দি রোমি গনেন। — ফাইল চিত্র।
৪৭১ দিন প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হাতে পণবন্দি হয়ে ছিলেন ইজ়রায়েলি তরুণী রোমি গনেন। বছর পঁচিশের তরুণী যখন হামাসের হাতে ধরা পড়েন, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৩। তার পরের প্রায় দেড় বছর ধরে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয় তাঁর উপর। অবশেষে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বন্দি প্রত্যর্পণে তরুণী ছাড়া পান। এত দিন পর ক্যামেরার সামনে এসে নিজের বন্দিদশার সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন রোমি।
চলতি সপ্তাহে ইজ়রায়েলের ‘চ্যানেল ১২’-এর একটি অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে এনেছেন রোমি। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারে রোমি জানিয়েছেন, হামাসের হাতে ৪৭১ দিন বন্দি থাকাকালীন বেশ কয়েক বার যৌন নির্যাতন এবং হুমকির শিকার হয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নোভা মিউজ়িক ফেস্টিভ্যাল থেকে অপহরণ করা হয় রোমিকে। তরুণী বলেন, ‘‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে শরীর অসাড় হয়ে যায়। ভয়ে হাত-পা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কখনও কখনও আমি পাগলের মতো কাঁদতাম। কখনও কখনও ভাবতাম, হয়তো এখান থেকে বেরোতে পারব না। এখানেই যৌনদাসী হয়ে থেকে যেতে হবে।’’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় হাতে গুলি লাগে রোমির। সেই অবস্থাতেই বন্দি করা হয় তাঁকে। সে সময় একজন নিজেকে চিকিৎসক বলে পরিচয় দিয়ে তাঁকে শৌচাগারে নিয়ে যান। তার পর প্রাথমিক চিকিৎসার অজুহাতে তরুণীকে যৌন নির্যাতন করেন। রোমির কথায়, ‘‘আমি গুরুতর জখম এবং শক্তিহীন ছিলাম। কিছুই করতে পারিনি। তার পরের ১৬ দিন আমাকে ওই যুবকের সঙ্গে সেই বাড়িতেই থাকতে হয়েছিল।’’ রোমির কথায়, সেটাই ছিল বন্দিদশার ‘সবচেয়ে খারাপ ১৬ দিন’। এর পর ইব্রাহিম এবং মহম্মদ নামে দুই যুবকও তাঁকে একাধিক বার নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ। তরুণী কাঁদলেও তাঁকে হুমকি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হত। তাঁকে একা শৌচাগারেও যেতে দেওয়া হত না। সর্বক্ষণ তাঁকে নজরে রাখতেন ইব্রাহিম। সুযোগ পেলেই তাঁকে যৌন নির্যাতনও করা হত।
রোমির কথায়, ‘‘কখনও কখনও ঘরের একচিলতে জানলা দিয়ে বাইরে দেখতাম। নিজেকে বলতাম, রোমি, ইজ়রায়েলের সবাই ভাবছে তুমি মৃত। অথচ কেউ জানবে না, তুমি আজীবন এদের যৌনদাসী হয়ে থেকে যাবে! তবু নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করতাম।’’ এক পর্যায়ে হামাসের সিনিয়র কমান্ডারেরা রোমির কথা জানতে পারেন। এর পর তাঁকে একটি সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে ফোনে হামাসের গাজ়া ব্রিগেডের তৎকালীন সর্বেসর্বা ইজ্জ আ দিন আল-হাদ্দাদের সঙ্গে কথা বলানো হয়। রোমির দাবি, আল-হাদ্দাদ তাঁকে প্রস্তাব দেন, রোমিকে বন্দিমুক্তির তালিকার শীর্ষে রাখা হবে, তবে তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তিনি মুখ বন্ধ রাখবেন। শেষমেশ ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ছাড়া পান রোমি।
অবশ্য রোমি একা নন, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ইজ়রায়েলি গবেষকদের ‘দিনাহ প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামাসের হাত থেকে বেঁচে ফেরা ১৩ জন নারী এবং দু’জন পুরুষ জানিয়েছেন যে গাজ়ায় তাঁরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফরেন্সিক রিপোর্ট, ছবি এবং ভিডিয়ো খতিয়ে দেখে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, গোটা যুদ্ধ পর্বে যৌন হিংসাকে প্রায়শই ‘যুদ্ধাস্ত্র’ হিসাবে ব্যবহার করেছে হামাস। যদিও এ সব দাবি উড়িয়ে দিয়েছে প্যালেস্টাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী।