ভাগ্যিস, রাস্তায় নেমে আসেননি বন্ধুর বোন!

ভাগ্যিস নিচে নামেননি আমার ওই বন্ধুর বোন! কারণ এ সবের মধ্যেই যে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চলছে, তা আমার বন্ধুর বোন বুঝতেই পারেননি। এত জোরে গানবাজনা চলছিল যে গুলির শব্দ ঠাওর করা যায়নি। তবে আমার বন্ধুর বোনের কানে আসে মানুষের আর্তনাদ, শিশু ও মহিলাদের চিৎকার। দেখতে পেলেন উৎসবের সব গানবাজনা থেমে গেল দুম করে।

Advertisement

সম্বিত সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৬ ১৬:৩২
Share:

উৎসবের জায়গা যখন কার্যত শ্মশান।নিসের রাস্তা।

বেঙ্গালুরুতে ভোর ৬টায় টিভিতে খবরটা দেখেই আঁতকে উঠেছিলাম। ৩৬ বছরের পুরনো বন্ধু আমার। ফ্রান্সেই থাকে। ওঁর বোন থাকে নিস-এ। ওঁরা সব কেমন আছে জানতে চেয়ে ফ্রান্সের অনেক বন্ধুকে টেক্সট পাঠিয়েছিলাম। কিছু ক্ষণের মধ্যেই জবাব এল এক বন্ধুর। জানাল, বড়ই উদ্বেগে রয়েছে। বরাত জোরে অল্পের জন্যে বেঁচে গিয়েছে ওঁর বোন। ১৪ জুলাই-এর জাতীয় দিবসে বর্ণময় আলোকজ্জ্বল উৎসব যখন চলছিল, তখন নিস-এ তাঁর ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তা দু’চোখ ভরে দেখছিলেন আমার ওই বন্ধুর বোন। আতসবাজি ফাটছে একের পর এক। রাতের আকাশ ভরে উঠেছে আলোকমালায়। নীচে উৎসব প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসছে হরেক রকমের সুর মূর্ছনা। দেশাত্মবোধক গান, যা অনুপ্রাণিত করে, উৎসাহিত করে। সে সব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলেন আমার বন্ধুর বোন তাঁর ফ্ল্যাটের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আতসবাজির রোশনাই ভাল ভাবে দেখবেন বলে নিচে রাস্তায় নামেননি।

Advertisement

ভাগ্যিস নিচে নামেননি আমার ওই বন্ধুর বোন! কারণ এ সবের মধ্যেই যে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চলছে, তা আমার বন্ধুর বোন বুঝতেই পারেননি। এত জোরে গানবাজনা চলছিল যে গুলির শব্দ ঠাওর করা যায়নি। তবে আমার বন্ধুর বোনের কানে আসে মানুষের আর্তনাদ, শিশু ও মহিলাদের চিৎকার। দেখতে পেলেন উৎসবের সব গানবাজনা থেমে গেল দুম করে। আমি তখন বেঙ্গালুরুতে বসে টিভি-তে দেখছি, প্রাণ বাঁচাতে মানুষ যে ভাবে এদিক ওদিক ছুটছে তাতে মায়ের হাত-ছাড়া হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিশু। নিজের প্রাণ বাঁচাতে পথে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো মাড়িয়ে মানুষ পড়িমড়ি করে যে দিকে পারছে, ছুটছে।

ফরাসিদের কাছে বড়ই প্রিয়, বড়ই আবেগময় ১৪ জুলাইয়ের এই জাতীয় দিবস। আজ থেকে প্রায় ২৩০ বছর আগে ১৭৮৯ সালের এই দিনেই বাস্তিল দুর্গের পতন হয়েছিল। প্রচুর রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে ফরাসি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। সেই ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের পরে দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষদের দিশা দেখিয়েছে। আর সেই ঐতিহাসিক দিনেই এ বছরের ১৪ জুলাই নিস-এ ঘটে গেল এই মর্মান্তিক ঘটনা। উৎসবে মেতে থাকা জনসমাবেশের উপর দিয়ে আচমকা সজোরে ট্রাক চালিয়ে দিল জন্মসূত্রে তিউনিশীয় এক ফরাসি নাগরিক। প্রাণ হারালেন অন্তত ৮৪ জন। এই নিয়ে দেড় বছরে ফ্রান্সে এমন সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা ঘটল তিনটি।

Advertisement

ফ্রান্সেই বড় হয়েছি আমি। আমি জানি গোটা দক্ষিণ ফ্রান্স এই সময়টায় মেতে থাকে ছুটি আর উৎসবে। এই জাতীয় দিবসের উৎসবে অংশ নিতে ফ্রান্সের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও মানুয ছুটে আসেন নিস-এ। ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকেও পর্যটকরা নিস-এ ছুটে আসেন এই সময়। দলে দলে মানুষ আসেন বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও। ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায়, বিশেয করে নিস-এ। সমুদ্রকে উপভোগ করতে। সূর্যস্নান করতে। সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মাখতে। সন্ধ্যায় উৎসবের মৌতাতে বুঁদ হয়ে থাকতে। এই ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাকে ফরাসিরা বলে ‘কোত্‌ দ্য আজুর’। স্পেন সীমান্ত লাগোয়া লম্বা একটা উপকূল রেখা একেবারে মোনাকো পর্যন্ত। যার দৈর্ঘ্য ৫৪৮ কিলোমিটার। সেখানকারই উপকূলবর্তী গ্রাম সেরবের থেকেই শুরু হয়েছে এই রঙিন উপকূলরেখা। যে উপকূল রেখার ডান দিকে নীল সমুদ্র আর বাঁ দিকে নানা রকমের জনগোষ্ঠীর বসবাস। হরেক রঙয়ের সংস্কৃতির ছাপ। মনোরম প্রাকৃতিক শোভা এই উপকূলরেখা বরাবর। মানুষও নানা রঙে রঙিন। বলা যায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার অন্তরই রূপ বদলাচ্ছে প্রকৃতি। ভাবুন, এই মনোরম প্রাকৃতিক শোভার এলাকাতেই এ বার ‘জাতীয় দিবসে’ ঘটে গেল এই মর্মান্তিক হামলার ঘটনা!

কেন ঘটল? কেন বারবার সন্ত্রাসবাদী হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে ফ্রান্স?

যেহেতু দীর্ঘ দিন ধরে আমি ফ্রান্সে রয়েছি, তাই এখন বার বার এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। গত শতাব্দীর ছ’য়ের দশক থেকেই অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির মুসলিম অভিবাসীদের জন্য দরজাটা হাট করে খুলে দিয়েছিল ফ্রান্স। অনেকটাই সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজনে, কিছুটা মানবতার খাতিরেও। ওই সময় থেকেই দলে দলে মানুষ ফ্রান্সে আসতে শুরু করেন উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলি থেকে। এখনও চলছে সেই স্রোত। এঁদের কেউই খ্রিস্টান নন। আরও সঠিক ভাবে বললে এঁদের সকলেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। ইউরোপে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিমের বসবাস ফ্রান্সেই। ফ্রান্স কিন্তু ভীষণ ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ একটা দেশ। কোনও ফরাসি প্রেসিডেন্টর কখনওই বাইবেল নিয়ে শপথ নেন না। ফ্রান্সের কোনও স্কুল, কলেজ ও সরকারি দফতরের কোথাও কোনও ধর্মীয় প্রতীক থাকে না। স্বাধীনতা, সৌহার্দ্য, সাম্যের দেশ ফ্রান্স। কখনও অন্য কোনও দেশের মানুষের সংস্কৃতিতে থাবা বসায় না। তবে এই বিদেশি অভিবাসীদের জন্য তাঁরা মফস্‌সলে আলাদা বহুতল বানিয়ে দিয়েছে। আলাদা আলাদা এলাকা বানিয়ে দিয়েছে। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলি থেকে আসা এই মুসলিম অভিবাসীরা ওই সব এলাকাতেই থাকেন। এটাই হয়তো ফরাসি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের সংস্কৃতির দূরত্ব তৈরি করেছে।

ওই অভিবাসীরা ফরাসি সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন না। এখন যে তৃতীয় প্রজন্মের আফ্রিকার অভিবাসীরা ফ্রান্সে জন্মাচ্ছেন, বড় হচ্ছেন, তাঁরা ফরাসি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেও তাঁদের নিজস্ব উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সংস্কৃতিটাকে বড় বেশি আঁকড়ে ধরে থাকছেন। ফ্রান্সেই থাকতে হবে তাঁদের, রোজকার প্রয়োজনে ফরাসি লোকজনের সঙ্গেই তাঁদের কথা বলতে হবে। ফরাসি ভাষাটার সঙ্গে তাঁরা তাঁদের উত্তর আফ্রিকার নিজস্ব আরবি ভাষাটাকে মিশিয়ে দিয়ে কথা বলতেই ভালবাসেন। যাকে ফরাসি আরবি বলা যায়। আদত ফরাসিরা এঁদের এলাকায় ঢুকুন, এঁরা তা চান না। আদত ফরাসিদের এঁরা দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। এটাই পাশাপাশি বয়ে চলা দুই সমাজ ব্যবস্থার সম্পর্কে চিড় ধরাচ্ছে, ফাটলটাকে উত্তরোত্তর বড় করছে। এটা আমার ভাল লাগে না। ভারতেও ২০০ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। কিন্তু আমরা ব্রিটিশদের সার্বিক ভাবে ঘৃণা করিনি। এখনও করি না। কিন্তু উত্তর আফ্রিকার এই মুসলিম দেশগুলি থেকে আসা মানুষরা যেন ঘৃণাই করতে ভালবাসেন ফরাসিদের।

আমি ফরাসি নাগরিক। প্যারিসে কোনও দিনই আমার আঁকাজোখা, শিল্পচর্চা, জীবনযাত্রা, ডিজাইন-ব্যবসাকে ফরাসিদের ঘৃণা করতে দেখিনি। ওরা খুব সহজে আমার সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। আমিও মিশে গিয়েছি ওঁদের সঙ্গে। তাই ভাবি কেন উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলি থেকে আসা মুসলিমরা ফ্রান্সের ক্যাথলিক সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে পারছেন না! এর উত্তর আমার জানা নেই।

এখন আমি আমার ফরাসি বন্ধুদের প্রায়ই বলি, খুব ভিড়ভাট্টার জায়গায় বেশি ক্ষণ থেকো না। যা সব হামলার ঘটনা চলছে চার দিকে, কখন কী হয়ে যায় কে জানে! কিন্তু ওঁরা বলে, ‘‘আমরা ভিতু নাকি! জেহাদিদের জন্য আমাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে যাব কেন!’’

ফরাসি সরকারও বলছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘‘আমাদের নিয়মিত ভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’’ আমার মনে হয়, জেহাদি সন্ত্রাসবাদ আদতে একটা ছন্দহীন গেরিলা যুদ্ধ! এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? এর উত্তর আমার জানা নেই। ভারতে সন্ত্রাসবাদ নেই, বলছি না। এখানেও অনেক লড়াই আছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন আছে। ধনী-দরিদ্র আছে, জাতপাত আছে। আছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। তবু এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানে কোনও অসুবিধা হয় না। আমরা চেষ্টা চালাই বিরুদ্ধবাদীদেরও বিশ্বাস অর্জনের! ফ্রান্স সহ গোটা পশ্চিমী দুনিয়ায় কিন্তু এটা একেবারেই হয় না। এটা হলে বা আরও বেশি করে এটা হলে সেনাবাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দাদের অনেক আগেই ফ্রান্সের সন্ত্রাসবাদীদের গোপন খবরাখবর স্থানীয় মানুষই পৌঁছে দেবেন প্রশাসনের কাছে। এটাই হয়তো সন্ত্রাসবাদ থেকে রেহাই পাওয়ার রাস্তা দেখাবে ফ্রান্সকে। কী ভাবে ফ্রান্সের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই এই শিকড় গেড়ে থাকা সন্ত্রাসবাদকে শৈশবেই নির্মূল করা যায়, হয়তো তার উপায়ও খুঁজে পাবে শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান ফ্রান্স। বন্ধ করা যাবে অযথা নিরীহ মানুষের রক্তপাতও।

আরও পড়ুন- ফের রক্তাক্ত ফ্রান্স, বাস্তিল উৎসবে ট্রাক হানা, নিহত ৮৪, আহত অন্তত ২০০

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement