—প্রতীকী চিত্র।
প্রার্থী পছন্দ নয়। তা নিয়ে কোথাও পড়ল পোস্টার আবার কোথাও দেখানো হল বিক্ষোভ। এমনকি, দেখা গেল গণ পদত্যাগের ঘটনাও। কোথাও দাবি ভূমিপুত্র চেয়ে, কোথাও আবার দাবি প্রার্থীর ‘সৎ চরিত্র’। তৃণমূল ও বিজেপি দুই শিবিরই প্রার্থী-কাঁটায় জর্জরিত। একাধিক জেলায় দেখা গেল এই চিত্র। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ও ছাতনা, পূর্ব বর্ধমানের কালনা, হাওড়ার বালিতে অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রার্থী নিয়ে বিজেপির নিচু তলার কর্মীদের একাংশের ক্ষোভ ফের প্রকাশ্যে এল বাঁকুড়ায়। বিষ্ণুপুর বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থীর নামে পোস্টার পড়ার পাশাপাশি ছাতনা বিধানসভায় ‘ভূমিপুত্র প্রার্থী’র দাবিতে রাস্তায় নামলেন বিজেপি কর্মীদের একাংশ। বিষ্ণুপুরের পোস্টার পড়ার ঘটনায় বিজেপি প্রার্থী তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুললেও ছাতনায় দলীয় কর্মীদের বিক্ষোভের ঘটনায় নির্বাচনী প্রচারের মাঝে অস্বস্তিতে পড়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
বিজেপির বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলা মিলিয়ে যে ১২টি আসন বাঁকুড়া জেলায় পড়ে তার মধ্যে ছাতনা-সহ ১০টি আসনের প্রার্থীর নাম প্রথম দফায় ঘোষণা করেছিল বিজেপি। ছাতনা বিধানসভায় বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়কে আবারও প্রার্থী করায় সে সময় বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার পড়েছিল। এ বার বিজেপি কর্মীদের একাংশ সরাসরি প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে ‘ভূমিপুত্র প্রার্থী’র দাবিতে বিক্ষোভ দেখালেন। শুক্রবার বাঁকুড়ার শুশুনিয়া গ্রামে বেশ কয়েক জন বিজেপি কর্মী দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হন। বিক্ষোভকারীদের তরফে স্থানীয় বিজেপি কর্মী রাম মালাকার ও দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ২০২১ সালে ছাতনা বিধানসভা থেকে বিধায়ক হিসাবে জিতে যাওয়ার পর থেকে সত্যনারায়ণকে পাননি এলাকার মানুষ। তিনি এলাকায় কোনও উন্নয়নও করেননি। ফের দল তাঁকে প্রার্থী করেছে। নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের প্রশ্নের মুখে দলের কর্মীদের পড়তে হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা জানাচ্ছেন, সত্যনারায়ণ পার্শ্ববর্তী এলাকা শালতোড়া বিধানসভার বাসিন্দা। স্থানীয়দের দাবি, ছাতনা বিধানসভার বাসিন্দাকে প্রার্থী করা হোক। দলের কর্মীদের এই বিক্ষোভে অস্বস্তিতে পড়েন বিজেপি নেতৃত্ব। ছাতনা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি নেতা জীবন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বিক্ষোভের কথা শুনেছি কিন্তু কে কোথায় প্রার্থী হবেন তা স্থির করে আমাদের দলের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। প্রার্থী নিয়ে কোনও কর্মীর মনে ক্ষোভ থাকলে আমরা তা দ্রুত মেটানোর চেষ্টা করব।’’
ছাতনায় বিক্ষুব্ধদের বিক্ষোভ। —নিজস্ব চিত্র।
বৃহস্পতিবার বিষ্ণুপুরের বিজেপি প্রার্থী হিসাবে বিষ্ণুপুর পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কাউন্সিলর শুক্লা চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে বিজেপির বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলা কার্যালয়ের অদূরে কেউ বা কারা বেশ কিছু পোস্টার লাগিয়ে দেয়। পোস্টারে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন ও ‘চরিত্র’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দেওয়া হয় পাশাপাশি ওই প্রার্থীর সাংগঠনিক ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। শুক্রবার সকালে হাতে লেখা ওই সব পোস্টার নজরে আসতেই বিষ্ণুপুরে শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপি প্রার্থী শুক্লা বলেন, ‘‘তৃণমূল এ ভাবে পোস্টার দিয়ে আমাকে যতই কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করুক বিষ্ণুপুরের মানুষ আমাকে জানেন ও চেনেন। সামনের বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ এই সবের জবাব দেবেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘তৃণমূল আবারও আমার বিরুদ্ধে কুৎসা করার চেষ্টা করলে নির্বাচন কমিশনে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি আমি আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করব।’’ বিজেপি প্রার্থীর অভিযোগ উড়িয়ে বিষ্ণুপুরের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষ বলেন,‘‘ এই ধরনের নোংরা সংস্কৃতিতে তৃণমূল বিশ্বাস করে না। নির্বাচনী তহবিলের টাকার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে বিজেপির অন্দরে যে গোষ্ঠীকোন্দল চলছে এই সব পোস্টার তারই ফল।’’
বিষ্ণুপুরে বিক্ষুব্ধদের পোস্টার। —নিজস্ব চিত্র।
অন্য দিকে, পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ ও মন্তেশ্বর বিধানসভায় প্রার্থীকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা প্রকাশ্যে এসেছিল। এ বারে বিজেপি শিবিরের একাংশের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এল পদ্ম শিবিরের প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। কালনায় বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে উঠল। যদিও প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই অশান্তির আবহ লেগে ছিল। এ বার তা প্রকাশ্যে এল মাত্র। শুক্র বার বিজেপি মনোনীত প্রার্থী সিদ্ধার্থ মজুমদারের বিরোধিতা করে কালনার নিভুজি বাজার এলাকায় অবস্থিত কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা বিজেপি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝোলানো থেকে শুরু করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখালেন বিজেপি কর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, কংগ্রেস থেকে আসা সিদ্ধার্থকে কোনও ভাবেই বিজেপির প্রার্থী হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না। স্লোগান ওঠে “এই প্রার্থী মানছি না, মানব না।” বিক্ষুব্ধদের হুঁশিয়ারি, প্রার্থী পরিবর্তন না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে। দল সূত্রে জানা গিয়েছে, বিক্ষোভ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির ২, ৩ ও ৪ নম্বর মণ্ডল সভাপতিরাও। একই সময়ে কালনা শহরে প্রচারে নামেন সিদ্ধার্থ। তাঁর পদযাত্রা ও প্রচারের মাঝেই দলের অন্দরের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। সিদ্ধার্থ বলেন, ‘‘এই বিক্ষোভ সম্পর্কে বিশেষ কিছু আমার জানা নেই। তৃণমূল যদি কাউকে টাকা দিয়ে বিজেপির পতাকা ধরিয়ে এই ধরনের বিক্ষোভ করায় তা হলে তো যে কেউ-ই তা করতে পারেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘যাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁরা বিজেপির কর্মী বলে আমি মনে করি না।”
অন্য দিকে, হাওড়ার বালি বিধানসভায় উঠল, বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘দূর হটো’ স্লোগান। পদত্যাগ করলেন ৭০ জন বুথ সভাপতি। বিজেপির একাংশের দাবি, বহিরাগতকে প্রার্থী করা চলবে না। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করা হয়েছে সঞ্জয় সিংহকে। বেলুড়ের লালমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে শুক্রবার সন্ধ্যায় নির্বাচন সংক্রান্ত বৈঠক চলাকালীন ক্ষুব্ধ কর্মীরা দলীয় কার্য়ালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। সেই সময়ে উপস্থিত ছিলেন প্রার্থী সঞ্জয়। দু’পক্ষের স্লোগান ও পাল্টা স্লোগান চলতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। বিক্ষুব্ধেরা জানান, বহিরাগতকে তাঁরা মেনে নেবেন না। বৈঠকের মাঝেই অস্বস্তিতে পড়ে যান প্রার্থী। বিক্ষুব্ধ নেতা ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘সত্তর জন বুথ সভাপতি পদত্যাগ করেছেন শুধু মাত্র বহিরাগতকে প্রার্থী করার জন্য। তাঁদের দাবি এখানে বালির ভূমিপুত্রকেই চাই। যাকে বিপদে আপদে পাওয়া যাবে। আজ রাজ্য নেতৃত্বকে বিষয়টি জানিয়েও এসেছেন তাঁরা। প্রার্থী বদল না হলে ভোটে কাজ না করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।’’ প্রার্থী বলেন, ‘‘যাঁদের সমস্যা আছে তাঁরা এসে কথা বলুক। নিজেদের মধ্যের ব্যাপার। এমন কিছু বড় বিষয় নয়।’’ এই প্রসঙ্গে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল। বালি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী কৈলাশ মিশ্র বলেন, ‘‘বিজেপি নিজেদের দলীয় কোন্দল সামলাতে পারছে না, তার উপরে জয়ের স্বপ্ন দেখছে।’’
বালিতে যখন গোষ্ঠী কোন্দলের এই ছবি তখন হাওড়ার ডোমজুড় কেন্দ্রে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, আশি হাজার ভোটের লিড পাবে তৃণমূল। শুক্রবার প্রার্থীর সমর্থনে এক কর্মীসভায় এসে ওই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন সাংসদ। ডোমজুড় বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তাপস মাইতি বলেন, ‘‘ডোমজুড়ে আমাদের লড়াই শুধু জয়ের জন্য নয়। এই লড়াই ভোট অঙ্কে ফারাক রাখার। আমাদের লক্ষ্য এই কেন্দ্রকে উপহার হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই ডোমজুড়ের প্রতিটি তৃণমূল কংগ্রেসের সকল কর্মী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছেন।’’
শ্যামপুর চেক পয়েন্টে টাকা উদ্ধার। —নিজস্ব চিত্র।
নির্বাচনী বিধি কার্যকর হওয়ার পরে ফের টাকা উদ্ধারের ঘটনা ঘটল। আলিপুরদুয়ার, সল্টলেক, বারুইপুরের শুক্র বার টাকা উদ্ধারের ঘটনা ঘটল হাওড়ার শ্যামপুর চেক পয়েন্টে। পুলিশের দাবি, ফলতার বাসিন্দা পনেরো লক্ষ টাকা নিয়ে খড়গপুর যাচ্ছিলেন। তিনি নৌকায় করে নদী পেরিয়ে শ্যামপুরে এলে চেক পয়েন্টে আটক করা হয়। বিপুল পরিমাণ টাকার কোনও বৈধ কাগজ তিনি দেখাতে পারেননি। পুলিশ সূত্রে খবর, আয়কর বিভাগের হাতে ওই ব্যক্তিকে তুলে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তেরা জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত করছেন।