West Bengal Assembly Election 2026

সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরু! আবহ মেরুকরণ, ‘স্পর্শকাতর’ মালদহ, মুর্শিদাবাদ ‘ওলটপালট’ করে প্রার্থী তৃণমূলের, আলোচনা দলে

মালদহের চাঁচল, হরিশচন্দ্রপুর, মানিকচক, মোথাবাড়ি এবং সুজাপুরের জয়ী বিধায়কদের সরিয়ে দিয়েছে তৃণমূল। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা, সমশেরগঞ্জ, লালগোলা, নবগ্রাম, রেজিনগর, বেলডাঙা, ডোমকল এবং জলঙ্গিতেও গত বারের জয়ী প্রার্থীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৬:৫৮
There is discussion within the TMC regarding the change of candidates in the sensitive Maldah and Murshidabad districts

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আমের জেলা মালদহ এবং মুর্শিদাবাদে পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটের প্রচারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘এ বার আমার আমও চাই, আমসত্ত্বও চাই!’’ ভোটের ফলপ্রকাশের পরে দেখা গিয়েছিল, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের আমজনতা তৃণমূলের ভোটের ভাণ্ডার ভরিয়ে দিয়েছে। তৃণমূল তৈরির পর থেকে যে ফলাফল জোড়াফুল শিবিরের খাতায় ছিল রেকর্ড।

Advertisement

পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই দুই জেলাতেই তৃণমূল যে ভাবে জেতা আসনে প্রার্থীদের বদল করেছে, তাকে অনেকেই দলের অন্দরে ‘ওলটপালট’ বলে অভিহিত করছেন। সেই নিরীক্ষার ভবিষ্যৎ এবং ভাল-মন্দ নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে শাসকশিবিরের অন্দরে।

মালদহে মোট বিধানসভা আসন ১২টি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ওই জেলায় তৃণমূলের দখলে ছিল আটটি আসন। বিজেপি জিতেছিল চারটিতে। দেখা যাচ্ছে, গত বার জেতা আটটির মধ্যে পাঁচটি আসনেই প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল। এর মধ্যে রয়েছেন এক বিধায়কও। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের মোট ২২টি আসনের মধ্যে গত বিধানসভায় ২০টিই জিতেছিল তৃণমূল। জয়ী বিধায়কদের মধ্যে ভরতপুরের হুমায়ুন কবীর তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হওয়ার পর নতুন দল গড়েছেন। বড়ঞার বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় দ্বিতীয় বার গ্রেফতার হয়ে এখনও জেলবন্দি। ফলে ওই দুই আসনে প্রার্থীদের বদল অনিবার্য ছিল। কিন্তু মুর্শিদাবাদে আরও আটটি আসনে প্রার্থী বদল করেছেন মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই জেলাতেও এক বিধায়কের আসন বদলে দেওয়া হয়েছে।

গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটকে মোটামুটি জনসমর্থনের ‘পুঁজি’র পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের জনবিন্যাসে সেই সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরু। এ হেন দুই জেলায় প্রার্থিতালিকায় ‘আগ্রাসী সংস্কার’ নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই দু’ধরনের মতামত রয়েছে। একাংশের বক্তব্য, গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন কারণে এই দুই জেলা ‘স্পর্শকাতর’। ধর্মীয় মেরুকরণও তীব্র। বাস্তব বিবেচনা করে আরও সাবধানী হওয়া প্রয়োজন ছিল। আবার অন্য অংশের বক্তব্য, গত পাঁচ বছরে স্থানীয় স্তরে যে স্থিতাবস্থা বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল, তার মোকাবিলায় এই বদল জরুরি ছিল।

মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তৃণমূলের অনেক প্রবীণ নেতার বক্তব্য, পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতি আর এ বারের পরিস্থিতির মধ্যে গুণগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, হুমায়ুন নতুন দল গড়ে এই দুই জেলায় মনোনিবেশ করেছেন। দ্বিতীয়ত, গত পাঁচ বছরে বেশ কিছু হিংসার ঘটনা মেরুকরণকে প্রকটতর করেছে। তৃতীয়ত, এই দুই জেলায় ভোট শতাংশে জোর থাকা কংগ্রেস এবং বামেরা পৃথক ভাবে লড়াই করছে। ঘটনাচক্রে, গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে রাজ্যের যে ১২টি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল বাম-কংগ্রেস, তার ৯৫ ভাগ এই দুই জেলাতেই।

আবার অনেকের এ-ও ব্যাখ্যা যে, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু ভোট অনেক পরে তৃণমূলের দিকে এসেছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত সেই ভোট ছিল মূলত কংগ্রেস এবং বামেদের দিকে। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট এবং ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোট ছিল। সেই দু’টি নির্বাচনে ওই দুই জেলায় কংগ্রেসের সুবাদেই সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রথম সেই ভোটের বাক্সবদল হয়। গত বিধানসভা ভোটে ওই দুই জেলাতেই সর্বোচ্চ অঙ্কে পৌঁছে গিয়েছিল তৃণমূল। ফলে দুই ২৪ পরগনা, দুই বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি বা কলকাতার সংখ্যালঘু ভোটের সঙ্গে এই দুই জেলার সংখ্যালঘু ভোটের রাজনৈতিক চরিত্রে ফারাক রয়েছে।

মালদহের চাঁচল, হরিশচন্দ্রপুর, মানিকচক, মোথাবাড়ি এবং সুজাপুরের জয়ী বিধায়কদের সরিয়ে দিয়েছে তৃণমূল। এঁদের মধ্যে মোথাবাড়ি থেকে সাবিনা ইয়াসমিনকে সরিয়ে এনে প্রার্থী করা হয়েছে সুজাপুরে। যে আসনে কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য সংগঠন এবং জনসমর্থন রয়েছে। আবার মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা, সমশেরগঞ্জ, লালগোলা, নবগ্রাম, রেজিনগর, বেলডাঙা, ডোমকল এবং জলঙ্গিতে গত বারের জয়ী বিধায়কদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এঁদের মধ্যে এক জনের আসন বদলেছে শাসকদল। তিনি রবিউল আলম চৌধুরী। রেজিনগর থেকে তাঁকে সরিয়ে এনে প্রার্থী করা হয়েছে বেলডাঙায়। যে বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন প্রাক্তন তৃণমূল হুমায়ুন। যে বেলডাঙায় বছর দুয়েক আগে কার্তিকপুজো ঘিরে অশান্তি চলেছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। আবার সেই মুর্শিদাবাদেরই ফরাক্কা, সমশেরগঞ্জ এবং সুতিতে গত বছর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

এ বারের প্রার্থিতালিকায় তৃণমূল বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ করেছে বলেই অভিমত অনেকের। ২০২১ সালের নির্বাচন থেকেই শাসকদলের প্রচার, প্রার্থী বাছাই ইত্যাদি নানা প্রক্রিয়ায় পুরোদস্তুর জুড়ে থাকে পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে এই সংস্থার কাজকর্ম নিয়ে অনেকের আপত্তি ছিল। সে সব নিয়ে দলের অনেকে প্রকাশ্যে তোপও দেগেছিলেন। পরে অবশ্য তৃণমূলের সংগঠনের সঙ্গে আইপ্যাক সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে। সেই সংস্থার সঙ্গে তৃণমূলের যে নেতারা দৈনন্দিন সংযোগে থাকেন, তাঁদের অনেকের বক্তব্য, স্থানীয় স্তরে দফায় দফায় সমীক্ষার নির্যাস দেখেই প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। বর্তমান বাস্তব মাথায় রেখেই তা করা হয়েছে। এই অংশের বক্তব্য, অনেকে পুরনো ধারণা এবং বিন্যাস দিয়ে হিসাব কষতে চাইছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তার মিল নেই। এমনকি, তাঁদের এ-ও দাবি যে, বিধানসভা ভিত্তিক সমীক্ষায় বহু জায়গায় ২০২৪ সালের ছবিরও বদল ঘটে গিয়েছে।

বেশ কিছু জায়গায় টিকিট না পেয়ে বেসুরো গাইছেন গত বারের জয়ী বিধায়কেরা। কেউ কেউ নির্দল হয়ে দাঁড়ানোরও হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এ হেন ঘটনা তৃণমূলে নতুন নয়। বস্তুত, কংগ্রেসি ঘরানার রাজনীতিতে এই দৃশ্য পরিচিত। আবার এ-ও বাস্তব যে, অতীতে এমন অনেক ‘বিদ্রোহী’ দলের ‘বার্তা’ পেয়ে নীরবে দলের অনুগত হিসাবেই ভোটের কাজ করেছেন। যেমন ঘটেছিল গত লোকসভা ভোটে বহরমপুর আসনে ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানকে তৃণমূল দাঁড় করানোর পরে হুমায়ুনের ক্ষেত্রে। তবে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের জনবিন্যাস, মেরুকরণের আবহ, নতুন করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সমীকরণের নিরিখে প্রার্থিতালিকায় ‘ওলটপালট’ আলোচ্য হয়ে উঠেছে দলের অন্দরে। এই বদল তৃণমূলের জন্য ভাল হল না মন্দ, তা স্পষ্ট হবে গণনার পরে।

Advertisement
আরও পড়ুন