অনিন্দিতা, তুহিনা, অঙ্কিতাদের নববর্ষ যাপন। ছবি: সংগৃহীত।
আদ্যন্ত বাঙালি ওঁরা। প্রত্যেকেই বাংলার আলোচিত অভিনেত্রী। যদিও পেশার তাগিদেই বাংলা ছেড়ে এখন পাকাপাকি ভাবে ওঁরা মুম্বইনিবাসী। কলকাতার সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্ব বেড়েছে ওঁদের। কিন্তু বাঙালিয়ানার অনেক কিছুই হয়তো তাঁদের মনেপ্রাণে জড়িয়ে আছে। যেমন নববর্ষ উদ্যাপন। কেউ পয়লা বৈশাখে শৈশবের দিনগুলি মিস্ করেন। কেউ আবার মুম্বইয়ে বসেও নিজের শহরের প্রতি টান আরও বেশি করে অনুভব করেন, কেউ আবার সন্তুষ্ট ‘প্রবাসী বাঙালি’ তকমায়।
অভিনেত্রী অনিন্দিতা বসু বাংলা টেলিভিশনের ‘বৌ কথা কও’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় মুখ। একাধিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ়ে কাজ করেছেন। যদিও অনিন্দিতার জন্ম মুম্বইয়ে, মাঝের ক’টা বছর কলকাতায় থেকেছেন। এই শহরটার সঙ্গে একটা টান অনুভব করেন। এখন পাকাপাকি মুম্বইবাসী। এখনও মাঝেমধ্যে কলকাতায় যাতায়াত লেগেই থাকে তাঁর। চেতলায় অনিন্দিতার বাড়ি রয়েছে। তাই আর পাঁচটা বাঙালির মতো এ দিনটা তাঁর কাছে বেশ স্পেশ্যাল। অনিন্দিতা সর্ষে দিয়ে মাছ খেতে ভালবাসেন। তাই বছরপয়লার দিনে সেটা খাওয়া চাই। একই সঙ্গে পাটিসাপটাও প্রিয় তাঁর। তাই সাত থেকে আটটার কম পাটিসাপটা খান না তিনি। শীতের পিঠে হলে কী হবে? নববর্ষের দিনেও পাটিসাপটা খেতে চান তিনি। অনিন্দিতার কথায়, ‘‘ছোটবেলা থেকে মুম্বইয়ে ছোট পরিসরে এই দিনটা উদ্যাপন করতাম। কিন্তু কলকাতায় এসে এই উৎসবটার সঙ্গে একাত্ম হলাম। কত মানুষের সঙ্গে আনন্দ করা যায়। ছোটবেলা থেকে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করত আমি কি ‘বং’? তবে আমি নিজেকে প্রবাসী বাঙালি বলতেই ভালবাসি। যেন শিকড়ের কাছাকাছি থাকা যায়।’’ অনিন্দিতা যেমন শরীরচর্চা করেন, তেমনি খেতেও ভালবাসেন। মুম্বইয়ে নানা ধরনের রকমারি খাবার থাকলেও চেতলায় নিজের পাড়ার দোকানের ডিম দিয়ে মটন রোলটা প্রতি মুহূর্তে মিস্ করেন।
প্রবাসে থাকলেও মনেপ্রাণে বাঙালি। ছবি: সংগৃহীত।
কাঁথির মেয়ে তুহিনা দাস, বাংলা ধারবাহিকের পরিচিত মুখ। অপর্ণা সেনের পরিচালনায় ‘ঘরে বাইরে আজ’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হওয়ার পর পাকাপাকি মুম্বইয়ে থাকা শুরু করেন তুহিনা। মাঝে একটা লম্বা সময় যেন অন্তরালে ছিলেন তিনি। মাঝে একটি কাজ করেছেন বাংলায়। প্রায় সাত বছর হল বাংলা থেকে দূরে। তবে পয়লা বৈশাখ শুনলেই আবেগঘন হয়ে যান তুহিনা। মনে পড়ে ছোটবেলার কথা।
তুহিনা জানান, ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের আগের দিন থেকে ঘর সাফসুতরো করার প্রক্রিয়া চলত। সঙ্গে ছিল বাগান পরিষ্কার। তবে বছরের পয়লা দিনে নিয়ম মেনে ভোর চারটের আগে উঠতেন। বাবার সঙ্গে বাড়ির পুরনো আবর্জনা, মরা গাছের ডালপালা সব পোড়াতেন। এটাই ছিল তাঁদের বাড়ির রীতি। এ ছাড়াও মায়ের সঙ্গে লাগাতেন নতুন তুলসীগাছ। এই দুটো নিয়মই যেন তুহিনার কাছে পয়লা বৈশাখ। এ ছাড়াও দোকানে ঘুরে ঘুরে মিষ্টির বাক্স জোগাড় করা, রাতে বসে বাবার সঙ্গে সেগুলো খাওয়া, এক লহমায় যেন শৈশবের ছবি চোখের সামনে ফুটে ওঠে তুহিনার। তবে এখন আর তেমন কিছু নেই, সেই প্রিয়জনেরা নেই, বাড়ি সেই পরিবেশও নেই।
তুহিনার কথায়, ‘‘আমি আর যা-ই করি না কেন, পয়লা বৈশাখে সাদা শাড়ি পরবই। এ বারও একটা সাদা শাড়ি তুলে রেখেছি সেটা পরব। আর আমি নিজে রান্না করতে ভালবাসি। তাই এ দিন বাড়িতে কিছু রান্না করব, নয়তো বাঙালি রেস্তরাঁ থেকে কিছু আনিয়ে খাব। আসলে একটা জিনিস, আমি একা থাকলেও উৎসব উদ্যাপনের রসদ ঠিক খুঁজেই নিই। আসলে পয়লা বৈশাখ, মহালয়া ও সরস্বতীপুজো এমন উৎসব, যে দিন সকালে উঠতে হবে বলে রাতে ঘুম আসত না।’’
তুহিনার প্রিয় সাদা শাড়ি। ছবি: সংগৃহীত।
আর এক অভিনেত্রী অঙ্কিতা চক্রবর্তী কলকাতার মেয়ে। ‘ইষ্টিকুটুম’ ধারাবাহিকের পর ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। একাধিক বাংলা সিনেমাতেও দেখা গিয়েছে অঙ্কিতাকে। জনপ্রিয়তা, পরিচিতি, খ্যাতি পাওয়ার পরেই মুম্বইয়ে চলে যান অঙ্কিতা। তাও চার বছর হল। যদিও কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ একেবারেই ছিন্ন হয়নি তাঁর। যদিও উৎসব, পার্বণ নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ তাঁর নেই। অঙ্কিতা জানান, তিনি এমন এক জন মানুষ যিনি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে নাকি মাসের পর মাস কাটিয়ে দিতে পারেন। তবে মুম্বইয়ে যাওয়ার পর তিনি কলকাতাকে মিস্ করেন। অঙ্কিতার কথায়, ‘‘কলকাতায় থাকতে পয়লা বৈশাখ নিয়ে অত মাথাব্যথা ছিল না। আমি ভাবতাম, যে দিন বন্ধুবান্ধবেরা আড্ডা দিতে আসবে সেটাই পয়লা বৈশাখ। আমার সব কিছুই খুব আড্ডাকেন্দ্রিক। কিন্তু মুম্বই গিয়ে এই উৎসবটাকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এই দিনটা নিজে নতুন কিছু রান্না করা, বাঙালি খাবার খাওয়া, সাজগোজ — সবেতেই যেন নিজের সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকে।’’ যদিও এই পয়লা বৈশাখের দিনেই এক বার চিংড়ির মালাইকারি খেতে গিয়ে বিপত্তি ঘটেছিল! মালাইকারির জন্য নারকেল কুরোতে গিয়ে বঁটিতে হাত কেটে রক্তারক্তি কাণ্ডও ঘটে। শৈশবের সেই স্মৃতি অঙ্কিতার মনে এখনও তাজা।
অঙ্কিতার পয়লা উদ্যাপন। ছবি: সংগৃহীত
যদিও এ বছর পয়লা বৈশাখে কলকাতায় থাকাটাই অঙ্কিতার কাছে বাড়তি পাওনা। তাই মায়ের হাতের বিশেষ রান্না খাবেন, সেটা ভেবেই আনন্দ হচ্ছে তাঁর। মুম্বইয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে থাকলেও সেখানকার নতুন বছরের উৎসব ‘গুড়িপড়বা’ নিয়ে উৎসাহ নেই তাঁর। বরং, তাঁর মনের কাছের উৎসবই এই বছর পয়লার দিনটাই।