কত ক্ষণ ঘুমোলে দীর্ঘায়ু হবেন, পিছিয়ে যাবে বার্ধক্য। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমই প্রয়োজন, এমনই মাপকাঠি ছিল এত দিন। এ বার তা বদলাল। ঠিক কত ক্ষণ ঘুমোলে মস্তিষ্কের কলকব্জা ঠিক থাকবে, শরীর ও মনে ক্লান্তি আসবে না, তার হিসেব আছে। তা অঙ্ক কষে বারও করে ফেলেছেন গবেষকেরা। আসলে ঘুম নিয়ে বড্ডই মাতামাতি চলছে। কারণ, মানুষজন ঘুমোচ্ছেন বড়ই কম। নানা সমীক্ষায় এমনই ধরা পড়েছে। দিনভরের পরিশ্রমের শেষে রাতে টানা ঘুম আবার সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়া— এ নিয়মই ছিল এত দিন। এখন ‘স্লিপ সাইক্ল’ বদলেছে। কখনও রাত করে বাড়ি ফেরা, কখনও অফিসের কাজের চাপ, রাত জেগে শিফ্টিং ডিউটি অথবা রাতভর মোবাইলে ব্যস্ত থাকা। সব মিলিয়ে ঘুমের সময় রোজই বদলাচ্ছে। কিন্তু শরীরের ঘড়ি কি অত দ্রুত সময় পাল্টাতে পারছে? ফলে ঘুমের কারণেই শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা বাড়ছে।
ঘুমের হিসেবনিকেশ
কম ঘুম যেমন ক্ষতিকর, বেশি ঘুমও মোটেই ভাল নয়। অনেক মাথা ঘামিয়ে আমে্রিকার কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা অঙ্ক কষে বার করেছেন, ঘুমের সঠিক সময় হওয়া উচিত ৬.৪ ঘণ্টা থেকে ৭.৮ ঘণ্টা। এই সময়টা টানা ঘুমোলেই শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল থাকবে, কোষের পুনর্গঠন হবে এবং মস্তিষ্কের সঙ্কেত পেয়ে শরীরের জৈবিক ঘড়িও (বায়োলজিক্যাল ক্লক) কাঁটায় কাঁটায় চলবে। বার্ধক্য পিছিয়ে দিতে ও দীর্ঘ সময় শরীর ও মনে যৌবন ধরে রাখতে, ঘুমের এই সময়টাকেই আদর্শ বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের উপর দীর্ঘকাল ধরে সমীক্ষা চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন তাঁরা।
শরীর ঘুমোয়, জাগে মস্তিষ্ক
‘ঘুম’ বিষয়টাকে ভাল ভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীরা অজস্র কাজ করেছেন ও করে চলেছেন। ঘুমের সময় আপাতদৃষ্টিতে কাউকে অজ্ঞান বলে মনে হলেও, তাঁর মস্তিষ্কের ইন্দ্রিয়-অনুভূতির ‘জানলা’টি খোলাই থাকে। ঘুমের সময়ে শরীরের পাঁচ শতাংশ বেশি রক্ত মস্তিষ্কের দিকে সঞ্চালিত হয়। কারণ ওই সময়ে মস্তিষ্কের বিভিন্ন ‘কেন্দ্র’ এক টানা কাজ করে, নিদ্রা আর জাগরণের প্রক্রিয়াটি সঠিক ভাবে চালু রাখার জন্য। ঘুমোনোর সময়ে মস্তিষ্কের যে দু’টি অংশ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে তা হল— ‘হাইপোথ্যালামাস’ ও ‘ব্রেন স্টেম’। এই দুই অংশের স্নায়ুকোষই ঠিক করে, ঘুম কত ক্ষণ হবে আর জেগে কত ক্ষণ কাটাতে হবে। দুই এলাকার স্নায়ুকোষই পর্যায়ক্রমে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হয়ে নিদ্রা ও জাগরণের বিষয়টির দেখাশোনা করে।
ঘুমের প্রধান কাজ হল হোমিয়োস্ট্যাসিস। অর্থাৎ ঘুমের সময়ে শরীর শুধু বিশ্রামেই থাকে না, পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ আর ‘ব্রেন স্টেম’-এর বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ উত্তেজনার সঙ্কেত (সিগন্যাল) মস্তিষ্কের ‘হায়ার সেন্টার’ বা ‘কর্টেক্সে’ (মস্তিষ্কের উপরের অংশ) পাঠাতে থাকে। সে সময়ে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোষের পুনর্গঠন হতে থাকে। অনেকটা ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার মতো। এই প্রক্রিয়াটি কত ক্ষণ চলবে, তারই হিসেব বার করেছেন গবেষকেরা। দেখা গিয়েছে, ৬.৪ থেকে ৭.৮ ঘণ্টা ঘুমোলেই এই প্রক্রিয়াটি সঠিক ভাবে সম্পূর্ণ হতে পারে। এর কম ঘুমোলেও তা হবে না, আবার বেশি ঘুমোলে হিতে বিপরীত হবে। প্রথমটিতে, ক্লান্তি, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বাড়বে আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হাঁপানি, সিওপিডি, বাতের সমস্যা দেখা দেবে। তাই মাপে মাপে ঘুমোলেই বরং লাভ বেশি। এতে হরমোন ক্ষরণ ঠিকমতো হবে, শরীরের জৈবিক ঘড়িও চলবে হিসেব মাফিক এবং শরীর বুড়িয়েও যাবে না।