India EU Trade Deal

‘ইউরোপ নিজেই নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ ঢালছে’! ভারত এবং ইইউ-এর বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়ে গোসা আমেরিকার, কেন?

ভারত এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক বোঝাপড়ার রূপরেখা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। ১৮ বছর ধরে আলোচনার পরে মঙ্গলবার তা ঘোষণা হওয়ার কথা। তবে ভারতের সঙ্গে ইউরোপের এই বাণিজ্যিক বোঝাপড়ায় সায় নেই আমেরিকার।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০০
(বাঁ দিকে) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারছে ইউরোপ। ভারতের সঙ্গে ইউরোপের প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে এমনটাই দাবি আমেরিকার। মার্কিন রাজস্বসচিব স্কট বেসান্তের কথায়, “ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে ইউরোপ নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ ঢালছে।”

Advertisement

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন। সম্ভবত সেখান থেকেই বাণিজ্য বোঝাপড়ার চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা হতে পারে। ওই বৈঠকের ঠিক আগেই এ বার ভারত-ইউরোপ প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) নিয়ে মন্তব্য করল ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন। আমেরিকা যে ভারতের উপরে শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে, তা-ও স্মরণ করিয়ে দেন বেসান্ত।

এবিসি নিউজ়-কে বেসান্ত বলেন, “রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য আমরা ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছি। আর দেখুন কী হচ্ছে! ইউরোপীয়রা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করছে।” ভারতের সঙ্গে ইউরোপের প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তিতে যে আমেরিকার ঘোর আপত্তি রয়েছে, তা বেসান্তের কথাতেই স্পষ্ট। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কই যে এই ‘আপত্তি’র মূল কারণ, তা-ও বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্পের রাজস্বসচিব।

বেসান্তের দাবি, রাশিয়ার তেলই পরিশোধিত পণ্য হয়ে ভারত থেকে ইউরোপে যায়। নিজের এই যুক্তি বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, “রাশিয়া থেকে তেল ভারতে যায়। সেখান থেকে তা পরিশোধিত পণ্য হয়ে অন্য দেশে যায়। এবং, ইউরোপীয় জোট সেই পরিশোধিত পণ্যই কিনছে। তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ ঢালছে।”

বস্তুত, ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকা গত বেশ কয়েক মাস ধরে এই অভিযোগ তুলে আসছে। আমেরিকার দাবি, ভারতকে তেল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করছে রাশিয়া। ভারত যাতে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, সেই চাপ দেওয়ার জন্যই দিল্লির উপরে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে মার্কিন প্রশাসন। যদিও ভারত শুরু থেকেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আসছে। বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা না-থাকলে, যেখান থেকে তেল কেনা বেশি সুবিধাজনক হবে, সেখান থেকেই কিনবে ভারত।

আমেরিকা যখন ভারতের উপরে এই শুল্ক চাপায়, প্রাথমিক ভাবে ইউরোপেরও সমর্থন পেয়েছিল তারা। তবে দিল্লি তখনই বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল— শুধু ভারতই নয়, আমেরিকা এবং ইউরোপও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করে। মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্য করে আমেরিকা এবং ইউরোপ যে যথেষ্ট লাভবান হয়, তা-ও বুঝিয়ে দেওয়া হয় বিবৃতিতে।

বস্তুত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইউরোপীয় বন্ধুদের বরাবর পাশে পেয়েছে কিভ। রাশিয়াকে কোণঠাসা করার চেষ্টায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গিয়ে বৈঠক করেন ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতাও। এ অবস্থায় ভারতের সঙ্গে ইউরোপের প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দিল মার্কিন প্রশাসন।

তবে ভারত এবং ইউরোপের মধ্যে এই প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি আচমকা ঘটে যাওয়া কোনও সমঝোতা নয়। প্রায় দুই দশকের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া এটি। ২০০৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন দেশে ক্ষমতায় ছিল ইউপিএ সরকার। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে দফায় দফায় আলোচনার পরে অবশেষে চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সমঝোতা। ঘটনাচক্রে এমন একটি সময়ে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের এই বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে, যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির এক বাণিজ্যিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা। দফায় দফায় আলোচনার পরেও সেই শুল্ক প্রত্যাহার হয়নি।

ইউরোপের সঙ্গে এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি যে দিল্লির কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের কথাতেও। ইউরোপের সঙ্গে এই প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তিকে ‘সকল চুক্তির জননী’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল সোমবারই ঘোষণা করে দিয়েছেন, ইউরোপ এবং ভারতের মধ্যে এফটিএ নিয়ে বোঝাপড়া চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবারই সেই চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।

Advertisement
আরও পড়ুন