Supreme Court on Abortion

কুমারী ‘মা’য়ের অধিকারকেই গুরুত্ব দিল সুপ্রিম কোর্ট, তা কতটা শক্তিশালী করছে নারীদের?

শুক্রবার একটি মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সন্তানধারণ করলেই যে সন্তান প্রসব করতে হবে, তার কোনও মানে নেই। চাইলে সন্তানসম্ভবা নারী মা না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:৩৮
গর্ভস্থ সন্তান নয় ‘মা’কেই এগিয়ে রাখল সুপ্রিম কোর্ট।

গর্ভস্থ সন্তান নয় ‘মা’কেই এগিয়ে রাখল সুপ্রিম কোর্ট। ছবি : সংগৃহীত।

মহাভারতীয় ভাষায় বললে ‘কানীন সন্তান’। অর্থাৎ যে সন্তানের জন্ম বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে। যে সন্তান সমাজের চোখে ‘অবৈধ’ এবং মায়ের কাছে লোকলজ্জা আর মানসিক যাতনার কারণ। আর তাই ‘অযাচিত’। মহাভারতের কালে কুন্তীও তাঁর কুমারী বয়সের অযাচিত সন্তান কর্ণকে জন্মানোর পরে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। কে বলতে পারে, সে কালে যদি গর্ভপাতের সুযোগ থাকত কিংবা গর্ভস্থ ভ্রুণ নষ্ট করাকে বিশ্বের আর পাঁচটা দেশের মতো ‘ভ্রুণহত্যা’ হিসাবে দেখা না হত, কুমারী অবস্থার গর্ভধারিণীকে অপরাধী না মানত সমাজ, তবে হয়তো কর্ণের পরিণতি অন্য রকম হত! মহাভারতের মতো মহাকাব্যও লেখা হত অন্য ভাবে। ঘোর কলিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যদিও ভ্রুণ নয়, কুমারী ‘মা’-এর কথাই ভাবল।

Advertisement

১৮ বছরের এক অবিবাহিত তরুণী গর্ভপাত করানোর অনুমতি চেয়ে দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদালতের। অবাঞ্ছিত সম্পর্কে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ওই তরুণীর সেই আবেদন ফিরিয়ে দেয় বম্বে হাই কোর্ট। সেই রায়কে খারিজ করেই সুপ্রিম কোর্ট ৩০ সপ্তাহের ওই অন্তঃসত্ত্বাকে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছে।

শুক্রবার ওই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সন্তানধারণ করলেই যে সন্তান প্রসব করতে হবে, তার কোনও মানে নেই। চাইলে সন্তানসম্ভবা নারী মা না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। সন্তানের জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর সেই স্বাধীনতা আছে। সমাজ, সম্পর্ক সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর সেই স্বাধীনতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে বলেছে ‘‘মহিলা না চাইলে তাঁকে আদালত (সন্তানের জন্ম দিতে) বাধ্য করতে পারে না।’’ যা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন নারী ইতিহাস নিয়ে চর্চাকারী অধ্যাপিকা অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ডায়ামন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপিকা বলেছেন, ‘‘৩০ সপ্তাহে মায়ের গর্ভে অনেকটাই বেড়ে ওঠে ভ্রুণ। সেই ভ্রুণ নষ্ট করলে যদি মায়ের স্বাস্থ্যের কোনও সমস্যা না হয়, তবে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অত্যন্ত প্রগতিশীল হয়েছে। সত্যিই তো যে সন্তান অবাঞ্ছিত, তাকে অনাদরের দুনিয়ায় এনে ফেলার কোনও অর্থ হয় না। তাতে ওই সন্তান যেমন ভাল থাকবে না, তেমনই ভাল থাকবেন না তার মা-ও। সমাজের চাপে পড়ে তাকে জীবনে এনে টানাপড়েনের শিকার হবেন কি না, সেটা তো মা সবচেয়ে ভাল বুঝবেন। তাই তিনিই যদি না চান, তবে সন্তানকে ভূমিষ্ঠ না করার পূর্ণ অধিকার তাঁর থাকা উচিত।’’

আসলে গর্ভপাতকে বিশ্বের একটা বড় অংশ এক রকমের ‘পাপ’ হিসেবেই দেখে। যে কারণে সেই ১৯৭০ সাল থেকে দুনিয়া জুড়ে চলছে গর্ভপাত বিরোধী আন্দোলন। যাকে 'প্রো লাইফ' আন্দোলনও বলা হয়। এই আন্দোলনকারীরা কথা বলেন গর্ভস্থ ভ্রুণের অধিকারের পক্ষে। কথা বলেন সেই ভ্রুণের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে। তাঁরা মনে করেন, ওই প্রাণ না জন্মালেও তার বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে এক জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতোই। তাই সেই ভ্রুণকে হত্যা এক জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে হত্যার মতোই গর্হিত। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী গর্ভপাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণার এবং অপরাধ বলে গণ্য করার দাবিও তোলেন তাঁরা। যার প্রভাবে বহু দেশ গর্ভপাতকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। তালিকায় যেমন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ, ইউরোপের মাল্টা-পোল্যান্ড, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রাষ্ট্র আর এশিয়ার কিছু দেশ রয়েছে, তেমনই রয়েছে আমেরিকার মতো তথাকথিত ‘প্রগতির পন্থী’ দেশও।

আমেরিকার ১৩টি স্টেটে গর্ভপাতকে ছ’সপ্তাহের বেড়ায় বেঁধে ফেলা হয়েছে। তার পরে কেউ গর্ভপাত করালে তা হবে বেআইনি। শাস্তিযোগ্যও। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে কতটা এগিয়ে রাখা যায়? সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা এবং বর্তমানে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যলয়ে কর্মরত বাসবী চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘নিঃসন্দেহে এই রায় নারীদের স্বাধীনতার পক্ষে গেল। নারমুক্তি আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল তো এটাই। দাবি ছিল, তাঁরা সন্তান ধারণ করবেন কি না সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁদের হবে। দরকারে গর্ভের সন্তান না আনার সিদ্ধান্তও তাঁদের হবে। এই স্বাধীনতায় বহু উন্নত দেশও মান্যতা দেয় না। এ সমাজে মহিলাদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই দেয় না। তাঁদের উপর সবার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের রায় নিঃসন্দেহে নারীদের স্বাধীনতার যুদ্ধে পায়ের তলার মাটি শক্ত করল।’’

তবে একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তে সন্তানসম্ভবা নারীর স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। এ দেশে গর্ভপাতের সময়সীমা তুলনায় কিছুটা বেশি। ২০ সপ্তাহের মধ্যে যদি ‘মা’ চান গর্ভস্থ ভ্রুণকে নষ্ট করবেন, তবে তার জন্য অনুমতি লাগে না। ২০ সপ্তাহ পেরোলে ভ্রুণ ধীরে ধীরে একটি শিশুর আকার নিতে শুরু করে। মায়ের গর্ভে থাকলেও তার চোখ, নাক, মুখ, হাত-পা স্পষ্ট বোঝা যায়। ২০ সপ্তাহের পরে এবং ২৪ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রুণ নষ্ট করতে হলে এ দেশে মেডিক্যাল বোর্ডের অনুমতি লাগে, তার পরে হলে দরকার পড়ে আদালতের অনুমতি্র। সবই যদিও ভ্রুণের কথা ভেবেই। মায়ের কষ্ট, মায়ের সমস্যা, সন্তানসম্ভবা নারীর ইচ্ছের কথা ভাবেন না সমাজের অধিকাংশ জনই। কারণ তিনি সেখানে এক রকম ‘অপরাধী’ই। যিনি একটি আস্ত প্রাণকে নষ্ট করতে চাইছেন। কেড়ে নিতে চাইছেন তার বেঁচে থাকার অধিকার। যে কারণে বম্বে হাই কোর্টও এই মামলায় কুমারী মায়ের আবেদন মেনে নেয়নি। সুপ্রিম কোর্ট মেনেছে।

রায়কে স্বাগত জানিয়ে বাসবী বলছেন, ‘‘ভবিষ্যতে এক জন নারী আবার সন্তানধারণ করতে চাইতে পারেন। ৩০ সপ্তাহে গর্ভপাত করালে যদি সেই ভবিষ্যতেও কোনও আঁচ না আসে বা ওই সন্তানসম্ভবার কোনও মানসিক সমস্যা না হয়, তা হলে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রগতিশীল।’’

Advertisement
আরও পড়ুন