Underwater Aircraft Carrier

পেটের মধ্যে বোমারু বিমান নিয়ে সমুদ্রে ডুব! পুচকে দেশের ডুবোজাহাজ দেখে ঘুম উড়েছিল আমেরিকার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিমানবাহী ডুবোজাহাজ তৈরি করে গোটা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিল জাপান। সেই জলযান হাতে পেয়েও তা ধ্বংস করে দেন মার্কিন নৌকম্যান্ডাররা।

Advertisement
আনন্দবাজার অনলাইন ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:০১
০১ ২২
Underwater Aircraft Carrier

বিমানবাহী ডুবোজাহাজ! পেটের মধ্যে লড়াকু জেট নিয়ে ডুব দেবে সমুদ্রের অতলে। তার পর চুপিসারে শত্রু দেশের সীমান্তে পৌঁছোতে পারলেই কেল্লাফতে! চোখের পলকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে হামলা চালাবে যুদ্ধবিমান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছারখার হবে উপকূলের শহর বা সেনাঘাঁটি।

০২ ২২
Underwater Aircraft Carrier

না, কোনও কল্পবিজ্ঞানের গল্প বা হলিউডি সিনেমা নয়। এক সময়ে তাবড় বিশ্বশক্তিকে বোকা বানাতে ‘ট্রয়ের ঘোড়া’র মতোই বিমানবাহী ডুবোজাহাজ তৈরি করে জাপান। রণতরীটি দেখে মার্কিন নৌকম্যান্ডারদেরও তাক লেগে গিয়েছিল। যদিও লড়াইয়ের ময়দানে কোনও দিনই সেটিকে ব্যবহার করতে পারেনি টোকিয়ো।

০৩ ২২
Underwater Aircraft Carrier

জলের নীচের বিমানবাহী জাহাজটির কোড নাম ‘আই ৪০১’ রেখেছিল প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে অন্তিম লগ্নে শেষ হয় এর নির্মাণকাজ। এক বার ভরে নেওয়া জ্বালানিতে বিমানবাহী ডুবোজাহাজটির গোটা পৃথিবী চক্কর কাটার ক্ষমতা ছিল বলে আধুনিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

Advertisement
০৪ ২২
Underwater Aircraft Carrier

ডুবোজাহাজের প্রযুক্তিতে অবশ্য প্রথম দিকে জাপানের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল জার্মানি। মূলত ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণের জন্য সমুদ্রের গভীরে থাকা জলযানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন বার্লিনের সেনাকর্তারা। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এ ব্যাপারে মরিয়া হয়ে ওঠেন তাঁরা।

০৫ ২২
Underwater Aircraft Carrier

বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ৬৫০ কিলোমিটার চওড়া ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনে আক্রমণের পরিকল্পনা করেও বার বার পিছিয়ে আসে জার্মানি। কারণ ওই সময়ে বিকট শব্দ করে উড়ত বার্লিনের যুদ্ধবিমান। ফলে হামলার আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পেয়ে যেতেন ইংরেজ সেনা অফিসাররা। আর সেটাকে কাজে লাগিয়ে আকাশপথে জার্মান আক্রমণ প্রতিহতও করতে সক্ষম হচ্ছিলেন তাঁরা।

Advertisement
০৬ ২২
Underwater Aircraft Carrier

এই অবস্থায় লড়াইয়ের ময়দানে ব্রিটেনকে মাত দিতে নতুন প্রযুক্তির আশ্রয় নেন জার্মান নৌকম্যান্ডারেরা। একটি ডুবোজাহাজের উপর লড়াকু জেট বসিয়ে সেটিকে ব্রিটিশ উপকূলের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করেন তাঁরা। তাতে অবশ্য যুদ্ধজাহাজটি জলের উপরে থাকায় দূর থেকে সেটিকে দেখতে পাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তবে তাতে এতটুকু দমে যাননি জার্মান সেনা অফিসাররা।

০৭ ২২
Underwater Aircraft Carrier

বার্লিনের ফৌজি কর্তাদের যুক্তি ছিল, ডুবোজাহাজে চাপিয়ে লড়াকু জেটকে ব্রিটিশ উপকূলে পৌঁছে দিতে পারলে অতর্কিতে আক্রমণ শানানো অনেকটাই সহজ হবে। যত ক্ষণ যুদ্ধবিমানটি ডুবোজাহাজের উপরে থাকবে, তত ক্ষণ বন্ধ রাখা হবে এর ইঞ্জিন। এ ভাবে ইংরেজদের বোকা বানাতে চেয়েছিলেন তাঁরা। জার্মানির এই পরিকল্পনার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল প্রথম বিমানবাহী ডুবোজাহাজের বীজ।

Advertisement
০৮ ২২
Underwater Aircraft Carrier

যুদ্ধের সময় অবশ্য বার্লিনের ফৌজিকর্তাদের চিন্তাভাবনা সে ভাবে কাজে আসেনি। কারণ, ব্রিটিশ নৌবাহিনী ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। তাঁদের চোখ এড়িয়ে ডুবোজাহাজের ঘাড়ে বসানো লড়াকু জেট থেকে অতর্কিত হামলা করা ছিল কার্যত অসম্ভব। পাঁচ বছর ধরে চলা ওই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় জার্মানি।

০৯ ২২
Underwater Aircraft Carrier

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বার্লিন নৌসেনার বহু হাতিয়ার চলে যায় আমেরিকার দখলে। জার্মান নৌকম্যান্ডারদের বিমানবাহী ডুবোজাহাজের পরিকল্পনায় যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিল ওয়াশিংটন। পরবর্তী বছরগুলিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষকেরা ঠিক ওই ধরনের আরও উন্নত লড়াকু জেট বহণকারী ডুবোজাহাজ তৈরিতে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েন।

১০ ২২
Underwater Aircraft Carrier

কিছু দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে অনেকটাই সাফল্য পায় যুক্তরাষ্ট্র। ডুবোজাহাজের মধ্যে হ্যাঙ্গার বা গ্যারাজের মতো একটি জায়গা তৈরি করেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা। সেখানে লড়াকু জেটকে রেখে বন্ধ করা হত সামনের দরজা। এ ভাবে হ্যাঙ্গারে জল ঢোকার রাস্তা বন্ধ করেন তাঁরা। ফলে যুদ্ধবিমান নিয়ে সমুদ্রের গভীরে যেতে পারত ওই ডুবোজাহাজ।

১১ ২২
Underwater Aircraft Carrier

গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকে আমেরিকার তৈরি এই ধরনের জলযানকে বিশ্বের প্রথম বিমানবাহী ডুবোজাহাজের আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই এতে একটি সমস্যা ধরা পড়ে। মার্কিন নৌঅফিসারেরা বুঝলেন, সংশ্লিষ্ট ডুবোজাহাজ থেকে বিমান উড়িয়ে আক্রমণ করা যাবে। কিন্তু সেই জেটকে ডুবোজাহাজের হ্যাঙ্গারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ, সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় জলযানটির ডেকে যুদ্ধবিমান অবতরণ করানো সম্ভব হচ্ছিল না।

১২ ২২
Underwater Aircraft Carrier

ফলে জার্মানির পর আমেরিকাও বিমানবাহী ডুবোজাহাজ নির্মাণের চিন্তাভাবনা থেকে সরে আসে। কিন্তু হার মানেনি জাপান। সম্পূর্ণ অন্য প্রযুক্তিতে এই ধরনের জলযান নির্মাণে মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন টোকিয়োর প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। কারণ, গোটা এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার লোভ তত দিনে সেখানকার রাজনৈতিক নেতাদের মাথায় চেপে বসেছিল।

১৩ ২২
Underwater Aircraft Carrier

৩০-এর দশকের মধ্য ভাগে এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে আমেরিকার প্রভাব বাড়ছিল। প্রথম থেকেই এই বিষয়টিকে মানতে পারেনি জাপান। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সুযোগের খোঁজে ছিল টোকিয়ো। লড়াই চলাকালীন অতর্কিতে হামলা চালিয়ে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মার্কিন নৌসেনাঘাঁটি পার্ল হারবারকে উড়িয়ে দেয় জাপানি বায়ুসেনা। আক্রমণের তারিখ ছিল ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১।

১৪ ২২
Underwater Aircraft Carrier

পার্ল হারবারে জাপানি হামলার সঙ্গে সঙ্গেই টোকিয়োর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রটি বুঝেছিল সুযোগ পেলেই বদলা নেবে যুক্তরাষ্ট্র। আর তাই আমেরিকার কোমর ভাঙতে পাল্টা ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেন তৎকালীন জাপানি নৌসেনাপ্রধান অ্যাডমিরাল ইসোরকু ইয়ামামোতো। অতি দ্রুত অন্তত ১৮টি বিমানবাহী ডুবোজাহাজ নির্মাণের নির্দেশ দেন তিনি।

১৫ ২২
Underwater Aircraft Carrier

ইয়ামামোতোর আদেশ মিলতেই কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়েন জাপানি ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। মাত্র তিন বছরে এই ধরনের একটি ডুবোজাহাজের নির্মাণ শেষ করে সেটিকে সমুদ্রে নামিয়েও দিয়েছিলেন তাঁরা। জার্মানি এবং আমেরিকার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জলযানটির নকশায় একাধিক বদলও করেছিল টোকিয়ো।

১৬ ২২
Underwater Aircraft Carrier

জাপানি বিমানবাহী ডুবোজাহাজটির উপরের দিকে ছিল সিলিন্ডার আকারের একটি হ্যাঙ্গার। সেখানেই তিনটি আইচি এম৬এআই বোমারু বিমান রাখা হয়েছিল। লড়াকু জেটগুলিকে আকাশে ওড়াতে বাষ্পশক্তিকে ব্যবহার করেন টোকিয়োর বিজ্ঞানীরা। হামলার পর যুদ্ধবিমানগুলিকে ফেরানোর প্রযুক্তিও জানা ছিল তাঁদের।

১৭ ২২
Underwater Aircraft Carrier

কিন্তু, বিমানবাহী ডুবোজাহাজটি থেকে আক্রমণ শানানোর আগেই পর পর দু’টি ধাক্কা খায় জাপান। ১৯৪২ সালে মিডওয়ে দ্বীপের যুদ্ধে টোকিয়োকে পর্যুদস্ত করে মার্কিন নৌবাহিনী। পরের বছর দ্বীপরাষ্ট্রটিতে হামলার ঝাঁঝ বাড়ায় ওয়াশিংটন। আর তাতে প্রাণ হারান ওই সমস্ত জলযানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ অ্যাডমিরাল ইয়ামামোতো।

১৮ ২২
Underwater Aircraft Carrier

১৯৪৩ সালের এপ্রিল মাসে লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ধুরন্ধর নৌসেনা অফিসারকে হারিয়ে বেকায়দায় পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’। ফলে গতি হারায় ১৮টি বিমানবাহী ডুবোজাহাজ প্রকল্প। শেষ পর্যন্ত এই ধরনের মাত্র দু’টি জলযান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল টোকিয়ো।

১৯ ২২
Underwater Aircraft Carrier

১৯৪৫ সালের ২৫ জুলাই দু’টি বিমানবাহী ডুবোজাহাজ নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে ডুব দেয় জাপানি নৌসেনার দল। উলিঠি দ্বীপের মার্কিন নৌঘাঁটি উড়িয়ে দিতে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন তাঁরা। কিন্তু পরের মাসেই (পড়ুন ৬ ও ৯ অগস্ট) দ্বীপরাষ্ট্রের হিরোসিমা এবং নাগাসাকিতে পরমাণু হামলা চালায় আমেরিকা। সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে টোকিয়ো। আর সেই খবর মিলতেই ফেরার রাস্তা ধরে ওই দুই বিমানবাহী ডুবোজাহাজ।

২০ ২২
Underwater Aircraft Carrier

জাপানি নৌঘাঁটিতে ফেরার পথে অবশ্য একটি জলযানকে চিহ্নিত করেছিল আমেরিকার ডুবোজাহাজ। সেটির ক্যাপ্টেন ছিলেন জাপানি নৌসেনা অফিসার তাতসুনোসুকে অ্যারিজ়ুমি। এক বার মার্কিন ডুবোজাহাজে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু তখন সদর দফতর থেকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পান তিনি। এর পর টোকিয়োর ওই অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজ চলে যায় ওয়াশিংটনের কব্জায়।

২১ ২২
Underwater Aircraft Carrier

জাপানি বিমানবাহী ডুবোজাহাজের নকশা দেখে আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রকৌশলীরা চমকে গিয়েছিলেন। ওই প্রযুক্তি হাতে পেতে ওয়াশিংটনের উপর প্রবল চাপ তৈরি করেছিল মস্কো। কিন্তু সবাইকে চমক দিয়ে ডুবোজাহাজটিকে ধ্বংস করে দেয় মার্কিন নৌসেনা। তাঁদের যুক্তি ছিল, ওই প্রযুক্তি অন্য কারও হাতে গেলে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

২২ ২২
Underwater Aircraft Carrier

পরবর্তী কালে অবশ্য নতুন প্রযুক্তি চলে আসায় কোনও দেশই আর বিমানবাহী ডুবোজাহাজ তৈরির দিকে নজর দেয়নি। উল্টে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পিছনে পরবর্তী দশকগুলিতে কোটি কোটি ডলার খরচ হয়েছিল। ডুবোজাহাজ প্রযুক্তিতেও এসেছে আমূল বদল। এক কথায় এর প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে যাওয়ায় জাপানি জলযানগুলি শুধুমাত্র ইতিহাসেই থেকে গিয়েছে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি