Marine Heatwaves

সমুদ্র তোলপাড় করে দিয়েছিল একটি স্রোতের গোলকধাঁধা! ২৩ বছর পরেও নেবেনি ‘আগুন’, দেখালেন বিজ্ঞানীরা

২০০৩-এ গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্রে এক অভূতপূর্ব সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা যায়। উষ্ণ স্রোতের গোলকধাঁধা ঘেঁটে দেয় বাস্তুতন্ত্র। এখনও সেই ক্ষত সারেনি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
আটলান্টিক মহাসাগরে তাপপ্রবাহের কারণে বদলে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র।

আটলান্টিক মহাসাগরে তাপপ্রবাহের কারণে বদলে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। —ফাইল চিত্র।

দু’পাঁচ বছর নয়, দীর্ঘ ২৩ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু সেই ‘আগুন’ এখনও নেবেনি। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে এখনও রয়ে গিয়েছে দুই দশক পুরনো তাপপ্রবাহের ক্ষত, যা সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রকেই বদলে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।

Advertisement

২০০২ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। তার ঠিক পরেই ২০০৩-এ গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্রে এক অভূতপূর্ব সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা যায়। গ্রিনল্যান্ডের উত্তরে রয়েছে আর্কটিক মহাসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর। এই দুই সমুদ্রের জলেই তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছিল। উষ্ণ স্রোত এসে জলের তাপমাত্রা আচমকা বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকটা। তাতে সমুদ্রের অধিকাংশের বরফ গলে যায়। বিজ্ঞানীদের দাবি, তাপপ্রবাহের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, তার ফলে নরওয়ে সমুদ্রের ৭০০ মিটার গভীরের জলও গরম হয়ে যায়। সেই ঘা এখনও শুকোয়নি।

সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ খুব বিরল নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সমুদ্রে কোনও না কোনও সময়ে এই ধরনের তাপপ্রবাহ দেখা যায়। তবে ২০০৩ সালের তাপপ্রবাহকে ‘প্রবল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের নেপথ্যে বিজ্ঞানীরা এক স্রোতের গোলকধাঁধাকে দায়ী করেন। বলা হয়, পারিপার্শ্বিকের উষ্ণতার কারণে সে সময়ে মেরু স্রোত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই সুযোগে উষ্ণ ক্রান্তীয় স্রোত আটলান্টিক হয়ে হু-হু করে ঢুকে পড়ে নরওয়ে সাগরে। একই সময়ে আর্কটিক মহাসাগরের কনকনে ঠান্ডা স্রোত, যা সাধারণত ওই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে, তা-ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সম্মিলিত পরিস্থিতিতে শক্তিশালী সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। শীতল সমুদ্রের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল সেই উষ্ণতার আঁচ। বিজ্ঞানীদের দাবি, এমন পরিস্থিতি সমুদ্রে আগে কখনও লক্ষ করা যায়নি।

জার্মানি ও নরওয়ের একদল সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী গ্রিনল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্রের তাপপ্রবাহ বিশ্লেষণের কাজ করেছেন। এই সংক্রান্ত পূর্বের ১০০টির বেশি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ঘেঁটে দেখে তাঁরা নিজেদের রিপোর্ট তৈরি করেছেন। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন জার্মান পরিবেশবিদ কার্ল মাইকেল ওয়ের্নার। তাঁর কথায়, ‘‘এখনও পর্যন্ত সমুদ্রে সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহ গোনা হয়েছে ২০০৩ সালেই। তবে ওই বছরের পর থেকে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ধরনও বদলেছে। এখন প্রতি বছরই বেশি সংখ্যায় তাপপ্রবাহ হচ্ছে। ক্রমে তা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।’’ সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে কার্ল বলেন, ‘‘পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই জীবের ধর্ম। সর্বত্র বাস্তুতন্ত্রে এই পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। ঠান্ডায় অভ্যস্ত প্রাণীরা উষ্ণ জলে খাপ খাইয়ে নিতে পারা প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আটলান্টিক বা নরওয়ের সমুদ্রও তার ব্যতিক্রম নয়।’’

উত্তর আটলান্টিকে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রভাব কতটা দীর্ঘমেয়াদি ছিল, তা সেখানকার সামুদ্রিক প্রাণীদের লক্ষ করলেই বোঝা যাবে। গত ৫০ বছরেও এই জলে যে ধরনের প্রাণী দেখা যায়নি, তারা ধীরে ধীরে এখানে জন্মাতে শুরু করেছে। বরফ গলে যাওয়ায় এই সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পেয়েছে বেলিন তিমির প্রজাতি। ২০০৩ সালের পর থেকে নতুন প্রজাতির মাছ, তিমি এখানে আরও বেশি করে দেখা যাচ্ছে। একই ভাবে, ঠান্ডায় অভ্যস্ত প্রাণী, যেমন হুডেড সিল, আর্কটিকের দাঁতযুক্ত তিমি বা নারওয়াল্‌সের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। তাপপ্রবাহের ফলে সমুদ্রের নীচের গাছগাছালিতেও পরিবর্তন এসেছে, পর্যবেক্ষণে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা।

আটলান্টিক কড মাছ তাপপ্রবাহের কারণে বিপদে পড়েছে। যে সমস্ত খাবারে তারা অভ্যস্ত ছিল, তা ওই এলাকার সমুদ্রে আর মিলছে না। ফলে ঠান্ডা জলের খোঁজে ক্রমে আরও উত্তরে সরে যাচ্ছে এই মাছগুলি। বিজ্ঞানীদের দাবি, এ ভাবে খুব বেশি দিন চলতে পারে না। কারণ, আর বেশি উত্তরে যাওয়ার জায়গা তারা পাবে না। সে ক্ষেত্রে ঠান্ডা জলের অভাবে আটলান্টিক কড বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

সমুদ্রে এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত, অভূতপূর্ব তাপপ্রবাহের জন্য মানুষের কার্যকলাপকেই দায়ী করেছেন বিজ্ঞানীরা। যথেচ্ছ ভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির দহন, গ্রিনহাউস গ্যাস পরিবেশের যে ক্ষতি করছে, তারই প্রভাব পড়ছে সমুদ্রেও। কারণ, গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি যে তাপ সঞ্চয় করে, তার অধিকাংশ সমুদ্র শুষে নেয় এবং উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ নামের পত্রিকায়।

Advertisement
আরও পড়ুন