ছবি: ভিডিয়ো থেকে নেওয়া।
৫০ বছরের সঙ্গী। জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের পথে, ঝড়ঝাপটায় ভালবাসার মানুষটি ৫০ বছর ধরে শক্ত করে হাত ধরেছিলেন। গত ১০৫ দিন ধরে অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে জীবনসঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেললেন ৮২ বছরের বৃদ্ধ।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, বৃদ্ধের নাম চেন আচং। চিনের জ়েজিয়াং প্রদেশের জ়ৌশান এলাকার বাসিন্দা চেন। খেতখামারে চাষ করে রোজগার করেন তিনি। স্ত্রী এবং পুত্রকে নিয়ে সংসার তাঁর। চেনের পুত্র কর্মসূত্রে অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন। ৫০ বছর ধরে তিন জনের সংসারের মেরুদণ্ড হয়েছিলেন চেনের স্ত্রী শিউ। এক বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন শিউ। তার পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিউকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।
নিংবো এলাকার লি হুউলি হাসপাতালের আইসিউতে ভর্তি করানো হয়েছিল শিউকে। কাজের চাপের কারণে মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে অপারগ ছিলেন শিউয়ের পুত্র। তাই শিউয়ের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন চেন। হাসপাতালে রোগী দেখার সময় সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা। বাড়ি থেকে হাসপাতালের দূরত্ব অনেকটাই। কিন্তু স্ত্রীকে চোখের দেখাটুকু না দেখলে শান্তি পেতেন না চেন। প্রতি দিন ভোর সাড়ে ৪টেয় ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজকর্ম সেরে ফেলতেন। তার পর খেয়েদেয়ে বাসে চেপে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হতেন।
হাসপাতালে যাতায়াত করতে ১২ ঘণ্টা সময় খরচ হত তাঁর। তবে স্ত্রীর সঙ্গে আধ ঘণ্টার সাক্ষাৎই যেন সমস্ত ক্লান্তি মিটিয়ে দিত। হাসপাতালে গিয়ে শিউয়ের বিছানার পাশে বসে থাকতেন চেন। তাঁদের একসঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তের কথাই শিউকে শোনাতেন তিনি। শিউ কোনও কথা বলতে পারতেন না ঠিকই, কিন্তু চেনের কথা শুনে ইশারায় সম্মতি জানাতেন। শিউয়ের হাত ধরে কখনও চেন বলতেন, ‘‘আমি যখন চাষবাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, তখন তুমি কত সুন্দর করে সংসার সামলেছ! আমার জামাকাপড় কেচে দিয়েছ, আমায় কত সুস্বাদু রান্না করে খাইয়েছ! বাড়িতে মাছ রান্না হলে আমায় মাছের সবচেয়ে ভাল টুকরোটা খেতে দিতে। আর নিজের জন্য তুলে রাখতে ল্যাজা অথবা মুড়ো। সারাটা জীবন ধরে আমার যত্নই করে গেলে তুমি।’’
চেনের দাবি, স্ত্রীকে সুস্থ করে তোলার জন্য নিজের সঞ্চয়ের সর্বস্ব খরচ করে ফেলেছিলেন। তাঁর পুত্রও বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। চিকিৎসাবাবদ ১,০০,০০০ ইউয়ান (ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৩ লক্ষ ৭৪ হাজার ১২৫ টাকা) খরচ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। চেনের আর্থিক পরিস্থিতির কথা জেনে অনেকেই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কন্ডাক্টরের সঙ্গে চেনা-পরিচিতি হয়ে যাওয়ায় চেনের কাছ থেকে বাসের ভাড়াও নেওয়া হত না।
প্রতি দিনের মতো ১৩ মার্চও শিউয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন চেন। অসুস্থ স্ত্রীর হাত ধরে তিনি বলছিলেন, ‘‘আমরা সকলে খুব ভাল আছি। তুমি কোনও চিন্তা কোরো না। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসো।’’ চেনের কথা শুনে মাথা নাড়িয়েছিলেন শিউ। দেখা হওয়ার পর বাড়ি ফেরার বাসে উঠে পড়েছিলেন চেন। তখনই হাসপাতাল থেকে তাঁকে ফোন করা হয়।
শিউয়ের হৃৎস্পন্দন থেমে গিয়েছে শুনে সঙ্গে সঙ্গে পুত্রকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হন চেন। হাসপাতালে পৌঁছে মৃত স্ত্রীর হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কান্নাজড়ানো গলায় বলেন, ‘‘আমাদের যা কিছু ছিল, সব শেষ হয়ে গেল। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। ওকে ছাড়া কী ভাবে বাঁচব জানি না। প্রতি দিন ওর সমাধির সামনে বসে সময় কাটাব আমি।’’ ১০৫ দিন ধরে হাসপাতালে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মারা গেলেন শিউ। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর। হাসপাতালের ঘর থেকে যখন শিউয়ের মৃতদেহ বার করা হচ্ছিল, তখনও চেন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন। ৫০ বছরের জীবনসঙ্গিনীকে, সহধর্মিনীকে শেষ বারের মতো এক ঝলক দেখার জন্য।