কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ তারক সিংহ। —ফাইল চিত্র।
বিধানসভা ভোটে দলের হারের পর থেকে বহু তৃণমূলের কাউন্সিলর পদত্যাগ করা শুরু করেছেন। সেই তালিকায় এ বার নাম জুড়ল কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (নিকাশি) তারক সিংহেরও। দল এবং মেয়রের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে পদ ছাড়লেন তিনি।
ক্ষোভ উগরে দিয়ে তারক বলেন, ‘‘আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে ১১ বছর কাজ করেছি। কলকাতায় যে জল জমে, আমরা অনেক কমিয়েছি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, এটা প্রমাণ করে দেব কলকাতায় কোনও দিন জল জমবে না। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলের পর দেখলাম দলের লোকেদের পুরসভায় আসা-যাওয়া কমে গিয়েছে।’’ তাঁর দাবি, মেয়রকে বর্ষা নিয়ে বৈঠকের কথা বলা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন যে, কমিশনারের সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু সে সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। কমিশনারের তরফ থেকেও কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ তারকের।
তারকের কথায়, ‘‘পুরসভায় শুধু আসা-যাওয়াই করতাম। আউটপুট কিছুই দিতে পারিনি। এটা আমার আত্মসম্মানে লেগেছে। আমি যদি আউটপুট না দিতে পারি, তা হলে পদের অপব্যবহার কেন করব? তাই আমি ইস্তফা দিচ্ছি। তবে আমাকে ডাকলে পূর্ণ সহযোগিতা করব।’’ মেয়র সম্পর্কেও তাঁর অভিযোগ আছে বলে জানান তারক। তাঁর কথায়, ‘‘এই যে মেয়র পারিষদদের নিয়ে বৈঠক হল না, মেয়র তো এক বারও বললেন না কেন এটা হল না, কিংবা বৈঠক করা দরকার। হাউস বন্ধ হল, সেটি নিয়েও মেয়র আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি।’’
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারক। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বদল চাই বলেও দাবি করেছেন তিনি। তারকের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেককে সঠিক ভাবে শাসন করেননি। অভিভাবক হিসেবে তিনি ব্যর্থ। সঠিক ভাবে শাসন করলে আজকে এক জনের চুরির দায় গোটা দলকে বইতে হত না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও চোর স্লোগান শুনতে হচ্ছে। তিনি চোর নন। কিন্তু ভাইপোকে শাসন করেননি, ভাইপোকে বাড়তে দিয়েছেন। সেই ভাইপোর বিরুদ্ধেই চুরি দুর্নীতির অভিযোগ। সেই সব কিছুর দায় দলের সবাইকে নিতে হচ্ছে।’’
রাজ্যে ক্ষমতা হাতছাড়া হলেও পুরসভাগুলি এখনও তৃণমূলের দখলে। কিন্তু সেখানেও ভাঙন ধরতে শুরু করেছে। প্রসঙ্গত, দিন কয়েক আগেই কলকাতার পুরসভার অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন তৃণমূলের অন্যতম মুখপাত্র তথা কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী এবং বরো চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দেন সুশান্ত ঘোষ এবং দেবলীনা বিশ্বাস। এ বার সেই পথেই হাঁটলেন মেয়র পারিষদ তারক সিংহও। মঙ্গলবার পুরসভায় গিয়ে ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে এলেন তিনি।
সম্প্রতি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন তারক। দলের ভূমিকা এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে তৃণমূল নেত্রী এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তাঁর নিশানায়। এই কঠিন মুহূর্তে দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পাশে দাঁড়াচ্ছেন না বলেও অভিযোগ তোলেন তারক। দলের বিরুদ্ধে মুখ খোলার পর থেকেই জল্পনা বাড়ছিল। প্রশ্ন উঠছিল, এ বার কি তা হলে তারকও অরূপ, সুশান্তদের রাস্তায় হাঁটবেন? অবশেষে সেই জল্পনা সত্যি করেই মেয়র পারিষদ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তারক। প্রসঙ্গত, ৯০-এর দশক থেকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন তারক। ১৯৯৫ সালে ১১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। পরে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ২০১০ সালে ১১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হন তিনি। ১১৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ২০১৫ এবং ২০২১ সালে জেতেন তারক। পরে মেয়র পারিষদ (বাজার, নিকাশি) হয়েছিলেন। পদত্যাগের আগে পর্যন্ত তিনি মেয়র পারিষদ (নিকাশি) ছিলেন। সূত্রের খবর, ঘনিষ্ঠমহলে তারক বহু বার বলেছিলেন, বিধানসভার টিকিট পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে দল হেরে যাওয়ার পর শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারক।