Women's Day

‘এখানে মেয়েদের স্বপ্ন দেখা বারণ’, নারীর আলাদা ‘দিবস’ নেই যে সীমান্তে

এখানে ‘নারীশক্তি’ মানে এক নিরন্তর যুদ্ধ করে যাওয়ার সাহস আর উদ্যম। কখনও খিদের সঙ্গে, কখনও নিরাপত্তাহীন রাতের সঙ্গে, লড়াই অনবরত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:০৯
Women\\\\\\\'s Day Special

যে কোনও বিশেষ ‘দিবস’-ই তাঁদের জীবনে আর একটা দিনমাত্র।— নিজস্ব চিত্র।

কোনও বিশেষ দিবস তাঁদের জীবনে আলাদা কোনও অর্থ আনে না। সপ্তাহের আর ছ’টা দিনের মতো ৮ মার্চ-ও তাঁদের কাছে গড়পড়তা আর একটা দিন। শহর, মফস্‌সল নারীশক্তির জয়গানে মুখর। নাটক, কবিতা, গান, গল্পে যখন ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উদ্‌যাপন হচ্ছে সর্বত্র, তখন নদিয়ার সীমান্তবর্তী চাপড়া, তেহট্ট কিংবা ভীমপুরে তার কোনও ছাপ নেই।

Advertisement

নদিয়ার প্রায় ২০৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে দিন শুরু হয় ঘড়ির কাঁটা দেখে নয়, সীমান্তের ভারী লোহার গেট খোলার কর্কশ শব্দে। এখানে ‘নারীশক্তি’ মানে এক নিরন্তর যুদ্ধ করে যাওয়ার সাহস আর উদ্যম। কখনও খিদের সঙ্গে, কখনও নিরাপত্তাহীন রাতের সঙ্গে, লড়াই অনবরত এবং অনিবার্য। চাপড়া থানার হৃদয়পুর সীমান্তের ধুলোমাখা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রেবেকা খাতুন। বছর চল্লিশের যুবতীর চোখেমুখে অকাল বার্ধক্যের ছাপ। নিজের মেয়ের কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে আসে তাঁর— ‘‘এখানে মেয়েদের স্বপ্ন দেখা বারণ। স্কুলটা ক্রোশ তিনেক দূরে। একটু বড় হলেই পাড়া জুড়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। তার পর ও পার থেকে উটকো লোকের আনাগোনা। কত ক্ষণ লুকিয়ে রাখব ওদের? তার চেয়ে ঘরে আটকে রাখাই ভাল।’’

এই আক্ষেপ শুধু রেবেকার একার নয়। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫-এর পরিসংখ্যানেও সেই নিদারুণ ছবি ধরা পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের এই সীমান্ত এলাকাগুলিতে স্কুলছুট ছাত্রীদের হার জেলা সদরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। খেলার বয়সেই এখানে কিশোরীদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংসারের ভারী জোয়াল। মুরুটিয়ার খেতে যখন রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন মালা বিশ্বাসেরা, তখন সেখানে পুষ্টির হিসাব কেউ রাখে না।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এই তল্লাটে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার প্রায় ৬০ শতাংশের উপরে। মালার কথায়, ‘‘শরীরটা যখন চলে না, তখন বিএসএফের অনুমতি নিয়ে ভ্যানে চড়ে শহরে যেতে হয় (হাসপাতালে)। সময়মতো গেট না খুললে বা বর্ষার সময় ঠিক সময়ে নৌকা না পেলে সব শেষ।’’ শুধু স্বাস্থ্য নয়, অর্থনৈতিক বঞ্চনাও এখানে পাহাড়প্রমাণ। স্বামীর নামে জমি আছে, ছেলের নামে আছে, কিন্তু যে মহিলা ঘর সামলে রোদে পুড়ে ফসল ফলাচ্ছেন, জমির দলিলে তাঁর নাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সীমান্তের নারীদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও রয়েছে।

সীমান্তের কাঁটাতার শুধু জমিকে দুই ভাগ করেনি, ভাগ করে দিয়েছে সুযোগ এবং সুবিধাকেও। শহরের আলো থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা সীমান্তের অন্ধকার ঘুপচিগুলো থেকে মেয়েদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএসপি শিল্পী পাল অবশ্য আশার আলো শুনিয়ে বললেন, ‘‘সীমান্তবর্তী এলাকায় নারী নিরাপত্তা আমাদের কাছে অগ্রাধিকারের বিষয়। বাল্যবিবাহ আর নারীপাচারের মতো অভিশাপ রুখতে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছোচ্ছি। নারীরা যাতে বিপদে পড়লে পুলিশের উপর ভরসা রাখতে পারেন, তার জন্য নিয়মিত জনসংযোগ চালানো হচ্ছে। সীমান্তের প্রতিকূলতা ভেঙে তাঁদের স্বাবলম্বী করাই আমাদের লক্ষ্য।’’

Advertisement
আরও পড়ুন