ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
প্রত্যাশিত ভাবেই সোমবার বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল শুভেন্দু সরকারের আনা চারটি বিল। ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে জোড়া সংশোধনী বিল এবং গুন্ডাদমন ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে বিল। এই চারটি বিল পাশের ক্ষেত্রেই ভোটাভুটি হলেও ভোটের ফলে এমন কিছু ঘটেনি যা সরকার পক্ষকে ‘বিস্মিত’ করতে পারে। তবে ভোটের ফল এবং বিধানসভায় ভোটাভুটির সময়কার ছবি কিছুটা হলেও বিরোধী শিবিরকে নিয়ে আলোচনা এবং জল্পনা তৈরির পরিসর দিয়েছে।
সোমবার অধিবেশনের প্রথমার্ধে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত জোড়়া সংশোধনী বিল পেশ করেন। আলোচনার পর ভোটাভুটি চান আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। দলের কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায় কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের তিন বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আলিফা আহমেদকে। উল্টো দিকে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরেও দেখা যায় তৎপরতা। দ্রুত আলোচনা সেরে নেন ঋতব্রত, সন্দীপন সাহা, সাবিনা ইয়াসমিনেরা।
ভোটাভুটির ঠিক আগে ওয়াকআউট করেন ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কদের বড় অংশ। কিন্তু থেকে যান বিদ্রোহী শিবিরেরই কাজল শেখ, তৌফিকুর রহমান, বাইরন বিশ্বাস, মোশারফ হোসেন পান্নালাল হালদার-সহ কয়েক জন। সময় মতো বেরিয়ে না-যাওয়ায় স্পিকারের ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয় তাঁদের। ভিতরে থাকলেও তাঁরা ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
ভোটের ফল সামনে আসতে দেখা যায়, বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৮৬। বিপক্ষে ১৭। তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের দাবি, তাঁদের ১২ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন এবং সূত্রের খবর তাঁরা প্রস্তাবের বিপক্ষেই ভোট দিয়েছেন। অন্য দিকে কংগ্রেসের দুই বিধায়ক, সিপিএমের মুস্তাফিজুর রহমান এবং আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি যদি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে থাকেন, তবে বিরুদ্ধে ভোট পড়ার কথা ১৬টি। তা হলে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দেওয়া ১৭ নম্বর ভোটটি কার?
তা হলে কি তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যেই কেউ কি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন? জল্পনা বাড়তে থাকে ঋতব্রত শিবিরের কয়েক জন বিধায়ক ওয়াকআউট না-করে থেকে যাওয়ায়। যদিও ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক বাইরনের কথায় ইঙ্গিত যে ওয়াক আউটের সিদ্ধান্ত ‘সিস্টেমেটিক’ ভাবে হয়নি। ওই শিবিরের আরও এক বিধায়কের দাবি, ওয়াকআউট যে করা হবে তাঁরা জানতেন না। অর্থাৎ সমন্বয়ের অভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। বাইরনকে সোমবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায় ভোটভুটির পর।
দ্বিতীয়ার্ধে গুন্ডাদমন বিল এবং সম্পত্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে মন্ত্রী বিশাল লামার পেশ করা সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনার পর ভোটাভুটির দাবি করেন ঋতব্রত শিবিরের মুখ্যসচেতক আখরুজ্জামান। এই পর্বে কেউ ওয়াকআউট না-করলেও ভোটদানে বিরত থাকেন পুরো কালীঘাট তৃণমূল। ভোটের ফল, পক্ষে ১৭৬। বিপক্ষে ৪১ এবং ভোটদানে বিরত ২০। তা হলে কালীঘাট তৃণমূলের সঙ্গে আর কারা বিরত থাকলেন ভোটদানে?
প্রথমার্ধে ঋতব্রত শিবিরের ‘সমন্বয়ের অভাব’ দেখে অনেকেরই ধারণা, দ্বিতীয়ার্ধেও ‘বিদ্রোহী’ শিবির থেকেই কমপক্ষে ৮ জন বিধায়ক কালীঘাট তৃণমূলকে অনুসরণ করে ভোটদানে বিরত থেকেছেন। কারণ কুণাল ঘোষের বক্তব্য, তাঁদের ১১ জন বিধায়ক ছিলেন গুন্ডাদমন বিল নিয়ে ভোটাভুটির সময়। কুণাল বলেন, ‘‘তাঁরা এই বিলের বিরোধিতা করেন এবং বেশ কিছু সংশোধনী চেয়ে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর আবেদন করেছেন।’’ কৌশলগত কারণে তাঁরা ভোটদানে বিরত থেকেছেন বলে জানান কুণাল। প্রথমার্ধে ঋতব্রত শিবিরের কয়েক জন বিধায়কের ওয়াকআউট না-করা বা বিকেলে কালীঘাটপন্থী মোট বিধায়কের থেকে বেশি বিধায়ক ভোটদানে বিরত থাকা নিয়ে কুণালের কটাক্ষ, ‘‘আমরা তো ১১ জন ছিলাম। তা হলে বাকি ৯ জন কারা ভোটদানে বিরত থাকলেন?’’ ঋতব্রতের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবিরের অনেক বিধায়ক খুশি নন বলেও দাবি কুণালের।
কুণাল কটাক্ষ করলেও, ওয়াকআউট বিতর্ক থেকে শুরু করে ভোটদানে বিরত থাকা নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্ত জল্পনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি ঋতব্রত নিজে বা তাঁর শিবিরের কেউ। আর এই ‘মৌন’ পরিস্থিতি ফের বঙ্গ রাজনীতিতে তৃণমূলের তৃতীয় ‘শাখা’র জল্পনা জোরালো করছে।