(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্মলা সীতারমণ (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
দফায় দফায় সভা মুলতুবি হয়ে যাওয়ায় সোমবার কেন্দ্রীয় বাজেটের উপর বক্তৃতা করতে পারেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষপর্যন্ত মঙ্গলবার সেই সুযোগ পেলেন তিনি। ৪০ মিনিটের ভাষণে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয় ছুঁয়ে গিয়েও শেষমেশ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার অভিযোগেই সরব হয়েছেন লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা। শেষ দু’টি বিধানসভা এবং গত লোকসভা ভোটের ফলাফলের কথা উল্লেখ করে বাজেটের উপর আলোচনাতেই অভিষেক হুঁশিয়ারির সুরে বলে দিয়েছেন, ‘‘যতই রাজ্যের টাকা আটকে রাখুক কেন্দ্র, আমরা হিসাব বুঝে নেব।’’
১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক যোজনা, জলজীবন মিশন-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যের বকেয়ার কথা তৃণমূলের নতুন নয়। গত দু’বছর ধরে রাজ্যের কোষাগার থেকে টাকা দিয়েই সড়ক, আবাস যোজনা এবং ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালাচ্ছে নবান্ন। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অভিষেক বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী আত্মনির্ভর ভারতের স্লোগান দিয়েছিলেন। আর আমরা স্বনির্ভর বাংলা কাকে বলে, তা কাজে করে দেখিয়েছি।’’
নির্মলার পেশ করা বাজেটকে নানা শব্দবন্ধে কটাক্ষ করেছেন অভিষেক। কখনও বলেছেন, এই বাজেট ‘শিরোনাম সর্বস্ব’ তো কখনও বলেছেন ‘রবিনহুড মডেল’। নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের থেকে শুষে নিয়ে তাঁদেরই দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। স্বস্তি দেওয়া হয়েছে আর্থিক ভাবে ক্ষমতাসম্পন্নদের। পাশাপাশি, অভিষেক কেন্দ্রীয় বাজেটকে আজীবন করের ফাঁদ (লাইফটাইম ট্যাক্স ট্র্যাপ) বলেও অভিহিত করেছেন। উপমা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘একজন শিশু জন্মালে তার দুধ এবং ডায়াপার কিনতে কর দিতে হচ্ছে। বড় হলে শিক্ষা এবং শিক্ষার সামগ্রী কিনতে কর দিতে হচ্ছে। চাকরি পেলে আয়কর দিতে হচ্ছে। বেঁচে থাকতে গেলেও নানাবিধ কর চেপে যাচ্ছে। অসুস্থ হলে ওষুধ-সহ বিভিন্ন সরঞ্জামে কর বসানো হয়েছে। কেউ মারা গেলে তাঁর স্মরণসভায় ধূপকাঠি কিনতে গেলেও কর দিতে হচ্ছে। এই বাজেট আসলে আজীবন করের ফাঁদ।’’
অভিষেকের বক্তৃতার সময় কক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা। গোটা বক্তৃতায় বিভিন্ন উপমায় নরেন্দ্র মোদী জমানায় ‘দুই ভারত’-এর কথা উল্লেখ করেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। বলেন, ‘‘এক দিকে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর স্লোগান। অন্য দিকে বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি সন্দেহে প্রহার। এক দিকে কৃষকদের আন্দোলন রুখতে দিল্লিতে কংক্রিটের ব্যারিকেড, অন্য দিকে সেই দিল্লিতেই সন্ত্রাদবাদীদের বিস্ফোরণ। এক দিকে ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’, অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া প্রায় দু’লক্ষ কোটি টাকা। এক দিকে ‘বেটি বচাও, বেটি প়ড়াও’-এর ঢক্কানিনাদ, অন্য দিকে দেশে প্রতি ১৬ মিনিটে এক জন করে মহিলার উপর আক্রমণের ঘটনা অব্যাহত!’’
ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়েও সরব হন অভিষেক। একটি এক্স পোস্টের উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘‘আমেরিকার কৃষিসচিব দাবি করেছেন, এই চুক্তির ফলে তাঁদের দেশের কৃষকদের ফায়দা হবে। পাঁচ দিন হয়ে গেলেও কেন কেন্দ্রীয় সরকার তা নিয়ে কোনও বিবৃতি দিল না? কী লুকোনর আছে?’’ সাধারণত বিদেশনীতি নিয়ে দলগত ভাবে তৃণমূলের অবস্থান হয় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষেই। পহেলগাঁও পর্বেও তা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশ বা নেপালের হিংসার সময়েও সেই অবস্থানই নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল। পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের ‘স্বরূপ’ তুলে ধরতে কেন্দ্রীয় সরকারের বহুদলীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে বিদেশসফরে গিয়েছিলেন অভিষেক। তার পরে নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। এ বার ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়েও প্রশ্ন তুললেন লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা।
বক্তৃতায় অভিষেক কখনও উদ্ধৃত করেছেন বাবাসাহেব অম্বেডকরকে, কখনও মহাত্মা গান্ধী বা স্বামী বিবেকানন্দকে। বাজেটের উপর আলোচনা হলেও এসআইআরের কারণে রাজ্যে ১৫০ জন মানুষের মৃত্যু, কোটির উপর মানুষের হেনস্থা নিয়েও সরব হয়েছেন অভিষেক। সোমবার এসআইআরের ‘মৃত্যু উপত্যকা’ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন তৃণমূল সাংসদ। মঙ্গলবার সংসদে বাজেটের উপর বক্তৃতাও শেষ করলেন নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতার কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করে।