Aroop Biswas

তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে বিপুল টাকা! লেনদেন বন্ধে কেন চিঠি দিলেন অরূপ? পিঠ বাঁচাতেই ‘বিশ্বাস’ ভাঙলেন মমতার?

চিঠিতে অরূপ বলেছেন, অতীতে দলীয় তহবিলের লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে বিস্তর হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। আর এখন এই টালমাটাল সময়ে তহবিলের অপব্যবহার হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। সে ক্ষেত্রে তিনি বিপদে পড়বেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ২০:৩৪
Why has Aroop Biswas written a letter to restrict transactions in the TMC\\\\\\\'s bank accoun

তৃণমূলের তহবিলে লেনদেন বন্ধ রাখার আর্জি জানিয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছেন অরূপ বিশ্বাস। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তৃণমূলের অন্দরে ফিরহাদ হাকিম এবং অরূপ বিশ্বাসের ডাক নাম ছিল মমতার ‘ডান কান’ আর ‘বাঁ কান’! ‘ডান কান’ আগেই হাতছাড়া হয়েছেন। কলকাতার মেয়র পদ ছাড়ার পরে বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে যোগ দিয়েছেন ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে। বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশনের সময় বসেছেনও তাঁদের সঙ্গেই। ঘটনাচক্রে এ দিনই জানা গেল ‘বাঁ কান’ও আর মমতার নাগালে নেই! একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে চিঠি দিয়ে সেই শাখায় থাকা তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করে রাখার আর্জি জানিয়েছেন তিনি। চিঠিতে নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষ বলে দাবি করেছেন অরূপ.

Advertisement

মমতাপন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ এ দিন বলেন, ‘‘অরূপ তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ৫ জুন দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সাংগঠনিক রদবদল ঘটিয়ে শুভাশিস চক্রবর্তীকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে।’’ কিন্তু সেই খবর ব্যাঙ্ককে জানিয়ে খাতায়কলমে পরিবর্তন করা হয়েছে কি? এই প্রশ্নের জবাবে কুণালের বক্তব্য, ‘‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’’ তৃণমূল সূত্রে অবশ্য খবর, ব্যাঙ্কের খাতায় এখনও অরূপই তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ।

তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকার অঙ্ক নেহাত কম নয়। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া দলের অডিট রিপোর্ট বলছে, ৬৭৫ কোটি টাকা জমা আছে ওই ব্যাঙ্কে। দলের একটি সূত্র বলছে, এখন অঙ্কটা অতটা না হলেও সাড়ে চারশো কোটির কম নয়। নির্বাচনী বন্ডে বিজেপির পরেই যে দলটি সব থেকে বেশি টাকা পেয়েছিল, তার নাম তৃণমূল। ফলে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের স্বাস্থ্য যে ভাল হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

কিন্তু দিদির বিশেষ আস্থাভাজন, মেসি-কাণ্ডের পরে যাঁর ক্রীড়ামন্ত্রী পদ কেড়েই ছাড় দিয়েছিলেন মমতা, অন্য আঁচ লাগতে দেননি, তিনি কেন তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ রাখতে বলে চিঠি দিলেন? এই প্রশ্নের কোনও জবাব অরূপ এ দিন দেননি। মেসি-কাণ্ডের তদন্তে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পরে এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘এখনই কিছু বলব না। পরে বলব।’’

তৃণমূল ভেঙে যাওয়ার এবং অধিকাংশ বিধায়ক ও সাংসদ মমতার হাতের বাইরে চলে যাওয়ার পরে জোড়াফুল প্রতীক এবং দলের তহবিল কোন পক্ষের হাতে থাকবে সেটা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। ঋতব্রতপন্থীরা নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করেছেন। পরিষদীয় দল দখলের পরে সাংগঠনিক ভাবে তৃণমূলকে দখল করা তাঁদের লক্ষ্য। অন্য দিকে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা দীর্ঘ আইনি লড়াই এড়ানোর লক্ষ্যে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া নামে একটি অখ্যাত দলে যোগ দিয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁদেরও লক্ষ্য তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ আদায় করা। বিদ্রোহীদের হাতে দলের দখল চলে যেতে পারে আন্দাজ করে কালীঘাট তহবিল বাঁচাতে উঠেপড়ে লেগেছিল বলে দলীয় সূত্রেই খবর। সমমনস্ক অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া যায় কি না, সে ব্যাপারে আইনি শলাপরামর্শ শুরু হয়। কারও কারও মতে, ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য মমতার সঙ্গে ৭ তারিখ দিল্লি যাওয়ার কথা থাকলেও আচমকা আগের দিন অভিষেকের দিল্লি চলে যাওয়ার মূল কারণ এটাই।

তহবিল বাঁচানোর এই তোড়জোড়ের খবর বিদ্রোহী শিবিরের কাছে পৌঁছতে দেরি হয়নি। অনেকের মতে, বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে অরূপকে চাপ দেওয়া হয়। এটাও বলা হয় যে, তহবিলের টাকা অন্যত্র সরানো হলে অরূপ আইনি ফাঁদে পড়ে যেতে পারেন। কারণ, তৃণমূল ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, খাতায়কলমে তিনিই এখনও দলের কোষাধ্যক্ষ। কারণ, কোষাধ্যক্ষ বদলের বিষয়ে গৃহীত প্রস্তাবের কপি ব্যাঙ্কের কাছে জমা দেওয়া হয়নি। নতুন কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস চক্রবর্তীও ব্যাঙ্কে গিয়ে সই করে নিজের নাম নথিভুক্ত করেননি। এই অবস্থায় আগে থেকে অরূপের সই করে রাখা চেকে টাকা তোলা হলে তার দায়ভার অরূপকেই নিতে হবে।

ব্যাঙ্ককে দেওয়া চিঠিতে সেই আশঙ্কার কথাই উল্লেখ করেছেন অরূপ। তিনি লিখেছেন, ‘‘তৃণমূলের আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অতীতে দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, হেনস্থাও শিকার হতে হয়েছে। দলের আচমকা টাকাকড়ির প্রয়োজন হলে যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সে জন্য সাধারণ ভাবে আমি কিছু চেকে আগাম সই করে পার্টি অফিসে রেখে দিতাম। কিন্তু এখন, দলের নেতৃত্ব এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন আমার আশঙ্কা, যাঁদের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরা ওই সই করা চেকগুলি ব্যবহার করে টাকা তুলে নিতে পারেন বা অন্য ভাবে সেগুলির অপব্যবহার করতে পারেন।’’

অরূপের চিঠি প্রসঙ্গে বিধানসভায় ঋতব্রতের অন্যতম ডেপুটি তথা এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহার মন্তব্য, ‘‘অরূপ বিশ্বাস হয়তো মনে করেছেন, ওই তহবিল নিয়ে কোনও অনিয়ম হতে পারে। তাই তিনি চিঠি দিয়েছেন।’’ মমতাপন্থী কয়েক জন তৃণমূল নেতারও বক্তব্য, নিজের পিঠ বাঁচাতেই দিদির ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ করতে ‘বাধ্য’ হয়েছেন অরূপ। যদিও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর কটাক্ষ, ‘‘অরূপ বিশ্বাসের এই চিঠি আসলে বিজেপি-কে মিস্‌ কল দেওয়া। তিনি এখন মমতা-অভিষেককে টাইট দিয়ে ভাল তৃণমূল সাজতে চাইছেন।’’

Advertisement
আরও পড়ুন