শুক না শিখণ্ডী
জলপাইগুড়ির ‘কলাকুশলী’ প্রযোজিত নাটক ‘শুক’ মঞ্চস্থ হল সম্প্রতি। দ্বিতীয় বার মঞ্চায়ন ঘটল আর্ট কমপ্লেক্সে। রচনা ও নির্দেশনা তমোজিৎ রায়। মহাভারতের যুদ্ধের আগের রাত্রে ব্যাসদেবের কাছে ভীষ্মের আগমন ঘটে। ব্যাসের পুত্র শুক অন্নজল ত্যাগ করে আত্মনাশী হতে চায়। কারণ পৃথিবীতে ছেয়ে থাকা প্রবঞ্চনা ও পাপ থেকে পিতাও মুক্ত নন। ভীষ্ম সে সময় শুককে আত্মধ্বংসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। ভীষ্মের কাছে প্রতিভাত হয় শুক আসলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। নারীর অবমাননা, পাপাচারী, কুরুবংশের পক্ষ নির্বাচন সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের মুখে ভীষ্মকে দাঁড় করিয়ে দেয় শুক। ভীষ্ম শুককে আঘাত করতে গেলে শুক বলে সে শিখণ্ডী। ভীষ্মকে হত্যা করতে গিয়েও অদৃশ্য হয়ে যায় শিখণ্ডীরুপী শুক। ব্যাসদেব ও ভীষ্মের কথোপকথনে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে শিখণ্ডীরুপী শুক কি কল্পনা না বাস্তব? দুর্যোধন সম্পদ সংগ্রহের জন্য ব্যাসের আশ্রমে বলপূর্বক প্রতিনিধি প্রেরণ করে। শিষ্যরা প্রতিরোধ করতে গেলে ব্যাসদেব তাদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হতে নিষেধ করে। জ্ঞান বিতরণের মধ্য দিয়ে মানুষকে জাগানোই যে প্রকৃত যুদ্ধ , সে যুদ্ধে অংশ নিতে বলে শিষ্যদের। শেষ পর্যন্ত শুককে জ্ঞান বিতরণের মধ্য দিয়েই শেষ হয় নাটক। শুক ঘুমিয়ে থাকা যুব সম্প্রদায়ের প্রতীক হয়ে আসে। শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ব্যাসদেব ও তার শিষ্যরা। রাষ্ট্রশক্তির রূপ পরিগ্রহ করে ভীষ্ম। আবহে শৌভিক ধর, মঞ্চ ও পোষাক পরিকল্পনায় অভিজিৎ বসু। ভীষ্মের চরিত্রে প্রিয়জিৎ রায়, শুক ও শিখণ্ডী অভিজিৎ বসু এবং ব্যাসদেবরূপী অপূর্ব সাহা অভিনয়ের গুণে দর্শকদের প্রশংসা আদায় করে নেন। প্রতিযোগিতায় (ফালাকাটা ‘রাণার’ নাট্যসংস্থা আয়োজিত) বিভিন্ন বিভাগে নাটকটি সাতটি পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়ে আসে।
মণিপুরী নিক্কণে জলপাইগুড়ি
সম্প্রতি শহর জলপাইগুড়িতে হয়ে গেল মণিপুরী নৃত্যের কর্মশালা। আয়োজক নটনিক্কণ সংস্থা। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন জাভেরি সিস্টার্সদের অন্যতম পদ্মশ্রী দর্শনা জাভেরি। ৬ দিনের এই কর্মশালায় শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখলেন বিভিন্ন ডান্ডা ড্রামা বা নৃত্যনাট্য। রথযাত্রা উপলক্ষে ফেস্টিভ্যাল ডান্স খুবাক ইসেই রপ্ত করলেন তাঁরা। মণিপুরী নৃত্যের ক্লাসিক্যাল ফর্ম, অঙ্গচালন, লাস্য, তাণ্ডব, মিউজিক্যাল কম্পোজিশনের মধ্যে স্বরের ওপর ভিত্তি করে সরমালা প্রবন্ধ, মুদ্রা, তাল, বোল, ঝনতা আয়ত্ত করলেন শিক্ষার্থীরা। গুরু বিপিন সিংহের বিভিন্ন কম্পোজিশন এমনকী মৃদঙ্গ বাদনও শেখানো হল এই নৃত্য শিবিরে। অংশ নেন ৫০ জন ছাত্রী। শেষ দিন ছিল শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠান। সংস্থার পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় মণিপুরী নৃত্যের প্রখ্যাত শিল্পী দর্শনা জাভেরিকে। তার পরিবেশিত ‘মানভঞ্জন’ মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদের। সংস্থার কর্ণধার ঝিনুক রায় চক্রবর্তী জানান, ১৯৯৬ থাকে আমরা ফি বছর মণিপুরী নৃত্যের কর্মশালার আয়োজন করে আসছি। কলাবতী দেবী, গুরু বিপিন সিংহ, পৌষালী চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্টরা এখানে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা বাড়াতেই এই ধরনের কর্মশালার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে আসছে।
লেখা ও ছবি : অনিতা দত্ত।
ভাষা, কৃষ্টি
আমাদের একটি নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব কৃষ্টি আছে’। আমাদের অর্থাৎ শেরশাহ বাদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের। তাদের ভাষার নামও শেরশাহ বাদিয়া। সেই ভাষাতেই তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘চিকাস’ (সূর্য)-কে সাজালেন নুরুল হাসান। তুলে আনলেন বিশেষ সম্প্রদায়টির নিজস্ব সংস্কৃতি। তাঁর কবিতায় ধরা পড়ল শেরশাহ বাদিয়াদের ‘একদিন-প্রতিদিন’এর সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন, স্বপ্নভাণ্ডার, নানা গল্পগাথাও। একই সঙ্গে নুরুল শোনালেন ‘টাপুরওয়ালা বলদের গাড়ি/চইড়্যা যাব বাপের বাড়ি’ বা ‘ক্যাঁচোর-কোঁচর টাপুরের গাড়ি/ভাল লাগে না আইস্যা বাড়ি’—এমন সব ভুলতে বসা সুরেলা ছন্দ।
লেখা ও ছবি: সুদীপ দত্ত