Advertisement
E-Paper

মেঘনাদ বধ রহস্য: ফের ছন্দ ভাঙলেন অনীক

ছবির চিত্রনাট্য খুবই টানটান। থ্রিলার ছবিকে সফল করে তুলতে যা যা এলিমেন্ট দরকার হয়, পরিচালক নিপুণ ভাবে সেগুলো এই ছবিতে বুনেছেন। ছবিতে প্রায় কোন লজিকাল মিস্টেক নেই। মুখ্য অভিনেতাদের সকলের অভিনয় যথাযথ।

মেঘদূত রুদ্র

শেষ আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৭ ১৫:২০

মেঘনাদ বধ রহস্য

পরিচালনা: অনীক দত্ত

অভিনয়: সব্যসাচী চক্রবর্তী, গার্গী রায়চৌধুরী, আবির চট্টোপাধ্যায়, বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, সায়নি ঘোষ, কল্যাণ রায়চৌধুরী, অনিন্দ্য পুলক।

“সীতার নাম জানকী (জান কি)”! বাক্যটি একই সঙ্গে একটি প্রশ্ন, আবার একই সঙ্গে উত্তর। মানে প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর লুকিয়ে আছে। ঠিক অনেকটা থ্রিলার গল্পের মত। মধুসূদন দত্তের “মেঘনাদ বধ কাব্য”-তে অবশ্য সীতা আছে কিন্তু অনীক দত্তের “মেঘনাদ বধ রহস্য” ছবিতে? না বলা যাবে না। থ্রিলার ছবির সমালোচনা লেখার এটাই বোধহয় সব থেকে কঠিন দিক। এমন কিছু লেখা যাবে না যাতে ছবির রহস্য নষ্ট হয়ে যায়। তবে বিন্দু বিন্দু কিছু সংকেত দিতে কোনও বাধা নেই। যার মাধ্যমে রহস্যের একটা জাল বোনা যায়। কিছু কিছু প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, যার মাধ্যমে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যায়। যেমন “হু ডান ইট”, “হাউ ডান ইট” এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ “হোয়াই ডান ইট”।

আরও পড়ুন: লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা: কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলা এক গল্প

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র অসীমাভ বসু (সব্যসাচী চক্রবর্তী) একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। ওনার গল্প, উপন্যাসের বিষয় হল কল্পবিজ্ঞান। তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ইন্দ্রাণী (গার্গী রায়চৌধুরী) একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী। অসীমাভর প্রথম পক্ষের একটি পুত্র আছেন যার নাম ঋক (বিক্রম চট্টোপাধ্যায়)। অসীমাভর সহকারী হলেন এলিনা (সায়নি ঘোষ)। কাছের বন্ধু নিখিলেশ (কল্যাণ রায়চৌধুরী)। আর একজন আশ্রিত ভাগ্নে আছেন যার নাম ধীমান (অনিন্দ্য পুলক)। ইন্দ্রাণীর প্রথম পক্ষের একজন মেয়ে আছে যার নাম গুলি। ইন্দ্রাণীর বিশেষ বন্ধু হলেন কুণাল সেন (আবির চট্টোপাধ্যায়)। মূলত এদেরকে নিয়েই ছবির গল্প শুরু হয়। দেখা যায় যে এদের প্রত্যেকেরই অসীমাভর সাথে এক ধরনের স্বার্থের সম্পর্ক বা সংঘাত আছে। এমত অবস্থায় এক দিন অসীমাভ বসু রহস্যজনক ভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কিডন্যাপ, খুন না অন্য কিছু তা বোঝা যায় না। একমাত্র ক্ষীণ সূত্র হচ্ছে “মেঘনাদ বধ কাব্য”। ছবিতে অজ্ঞাত কেউ এক জন এই বইটি দু-দুবার তাকে উপহার দেয়। প্রথম বার লন্ডনে থাকাকালীন বাই পোস্ট, আর দ্বিতীয় বার কলকাতায় তাঁর অন্তর্ধান হওয়ার ঠিক ক’দিন আগে জন্মদিনের উপহার হিসেবে। কিন্তু উনবিংশ শতকের এই মহাকাব্যের সাথে তাঁর অন্তর্ধানের কি সম্পর্ক? আদৌ কি কোনও সম্পর্ক আছে? কে তাকে এই বইটি পাঠিয়েছে? কেনই বা পাঠিয়েছে? এই প্রশ্নগুলিকে কেন্দ্র করেই ছবির রহস্য উদ্ঘাটিত হতে থাকে।

সব্যসাচী চক্রবর্তী।

ছবির চিত্রনাট্য খুবই টানটান। থ্রিলার ছবিকে সফল করে তুলতে যা যা এলিমেন্ট দরকার হয়, পরিচালক নিপুণ ভাবে সেগুলো এই ছবিতে বুনেছেন। ছবিতে প্রায় কোন লজিকাল মিস্টেক নেই। মুখ্য অভিনেতাদের সকলের অভিনয় যথাযথ। একমাত্র আবির চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় নিয়ে দু’এক কথা বলার অবকাশ আছে। যে অভিনয় উনি ব্যোমকেশ বা ফেলুদা করার সময় করে থাকেন, হুবহু সেই একই অভিনয় উনি এই ছবিতেও করেছেন। ব্যোমকেশ ব্রিটিশ আমলের গোয়েন্দা, ফেলুদা সত্তরের দশকের আর ২০১৭-র এই ছবিতে আবিরবাবু একজন চিত্র পরিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। কিছু পার্থক্য তো থাকতে হবে।

ছবির সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রর কাজ ভাল। ছবির দুটি গানের ব্যবহার গল্পের সিচুয়েশনের সঙ্গে একেবারে সম্পৃক্ত। ছবির সিনেমাটোগ্রাফার অভীক মুখোপাধ্যায় এবং এডিটর অর্ঘকমল মিত্রের কাজ প্রায় ক্লিনিক্যাল। শুধু ছবির একটি লম্বা স্বপ্নদৃশ্যের ভিজুয়াল কিছুটা সমস্যাজনক লেগেছে। এটি অন্য ভাবে ব্যবহার করলে ভাল হত। না থাকলেও হয়ত ছবির কোনও ক্ষতি হত না। ছবির প্রথম অর্ধের দৈর্ঘ সামান্য কম হলে অর্থাৎ কিছু দৃশ্য একটু ছোট হলে ছবিটি আরেকটু ক্রিস্প হত বলে মনে হয়েছে। থ্রিলার ছবি হয়ত আরেকটু বেশি গতি দাবি করে। ছবিতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর রেফারেন্স রয়েছে। কিছু ক্লাসিক ছবির, ক্লাসিক বই-এর, কিছু ক্লাসিক চরিত্রের, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সূচকের, কিছু মতবাদের। কিছু রেফারেন্স সংলাপের মাধ্যমে আবার কিছু প্রপস এবং শব্দের মাধ্যমে এসেছে। সেগুলি খুবই তৃপ্তিদায়ক কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’, হিচককের ‘সাইকো’ আর আন্তোনিওনির ‘ব্লো আপ’ নামগুলি পিন পয়েন্ট না করলে মজাটা হয়ত আর একটু বাড়ত। কিছু জিনিস দর্শকের ইন্টেলেক্টের ওপর ছাড়তে হয়। সব বলে দিতে নেই। আসলে কোনও ছবিই ত্রুটিমুক্ত হয় না। তবে ছবি যদি খুব ভাল হয়, তা হলে দর্শকের মনে হতে থাকে যে ছোট ছোট এই ত্রুটিগুলো না থাকলে ছবিটা আরও জমে যেত।

অনীকের এটা তৃতীয় ছবি। প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যত্’ বাংলা সিনেমার দর্শকের কাছে একদম অন্য রকম একটা অভিজ্ঞতা ছিল। পরের ছবি ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ বাজারের হিসেবে তেমন সফল না হলেও অনীকের ছক ভাঙা ভাবনার ছোয়া তাতেও ছিল। নতুন ছবিতেও সেই ধারা বজায় রেখেছেন তিনি। মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দে ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’টি লিখেছিলেন। চিরাচরিত ১৪ মাত্রার পয়ারের ছন্দকে ভেঙে তিনি এই নতুন ছন্দটি তৈরি করেছিলেন। যা সেই সময়ের বাংলা কাব্য জগতের নিরিখে একটি মারাত্মক বৈপ্লবিক কাজ ছিল। তার সঙ্গে কোনও তুলনায় না গিয়েও বলা যায় যে অনীক দত্তের ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ এই সময়ের বাংলা ছবির নিরিখেও অনেকটাই বৈপ্লবিক কাজ। এই সময়ের অন্যান্য ছবির সঙ্গে যার কোনও ছন্দের মিল নেই, কিন্তু একটা আলাদা মাত্রা আছে।

Meghnad Badh Rahasya Film Review Sabyasachi Chakraborty Abir Chatterjee Anik Dutta Gargi Roy Chowdhury Vikram Chatterjee মেঘনাদ বধ রহস্য অনীক দত্ত সব্যসাচী চক্রবর্তী গার্গী রায়চৌধুরী বিক্রম চট্টপাধ্যায় আবির চট্টোপাধ্যায়
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy