নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়ে সদ্য আন্তঃরাজ্য পরিষদের বৈঠক থেকে বেরিয়েছেন। গতকাল কলকাতার জন্য বিমান ধরার জন্য দিল্লি বিমানবন্দরের পথে গাড়ির পিছনের আসনে বসিয়ে নিলেন দু’জনকে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েনকে। আন্তঃরাজ্য পরিষদের বৈঠকে কেন্দ্রের দাদাগিরির বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের সুরটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁধে দিয়েছিলেন, সেটিই যাতে সংসদের অধিবেশনেও প্রতিফলিত হয়, তা কাল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন লোকসভা ও রাজ্যসভায় দলের দুই নেতাকে।
আর আজ হলও তাই। আগামিকাল থেকে শুরু হবে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। এক দিন আগে সর্বদল বৈঠকেও তৃণমূলের পক্ষ থেকে নেত্রীর সেই মনোভাবই তুলে ধরলেন দলের নেতারা। তৃণমূল সূত্রের মতে, সংসদেও এ বারে কেন্দ্র-বিরোধী অবস্থান নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল। রাজ্যে তৃণমূলের মূল লড়াইটা কংগ্রেস ও বামেদের সমঝোতার বিরুদ্ধে হলেও জাতীয় স্তরে মোদী-বিরোধী পরিসরটি বামেদের ছেড়ে দিতে রাজি নন মমতা। তাই দলের সংসদীয় নেতাদের কালই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, মোদীর প্রতি দল কোনও ভাবেই নমনীয় হবে না। বিজেপির ফাঁদেও পা দেবে না।
আজ তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে যে সবর্দল বৈঠক ডাকা হয়, সেখানে তৃণমূলের পক্ষ থেকে হাজির থাকা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুখেন্দু শেখর রায়রা দলনেত্রীর অবস্থানই তুলে ধরেন। গতকালই আন্তঃরাজ্য বৈঠকে মমতা ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলির বোঝা কী ভাবে লাঘব হতে পারে, তা নিয়ে একটি কমিটি গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আজ সুদীপরা তা নিয়ে সংসদে আলোচনার দাবি তুললেন। একই সঙ্গে সন্ত্রাস মোকাবিলায় কী ভাবে রাজ্য সরকারকে আরও আগাম তথ্য জানানো যায়, সমন্বয় কী ভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়েও সংসদে আলোচনার দাবি তোলা হয়েছে। নির্বাচনী সংস্কার নিয়েও পৃথক আলোচনা চায় তৃণমূল। ভোটের সময় নির্বাচন কমিশন-সহ কেন্দ্র ও রাজ্যের ভূমিকা, রাজনৈতিক তহবিল নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা নিয়েও সরব দল।
এর পাশাপাশি মোদী সরকার যে ভাবে বিদেশি লগ্নির দরজা একের পর এক ক্ষেত্রে খুলে দিচ্ছে, এমনকী প্রতিরক্ষা, ওষুধ ক্ষেত্রেও খোলা হচ্ছে, তার প্রভাব নিয়েও সরকারের জবাব চাইবে তৃণমূল। এতে কতজনের রোজগার বাড়ল, আর কতজন কাজ খোয়ালো- তারও হিসেব চায় তারা। তৃণমূল সূত্রের অবশ্য বক্তব্য, এর মানে এই নয় সংসদ অচল রাখার পক্ষে দল। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সূত্র ধরে কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্কই বজায় রাখতে চায় দল। তিন দিন দার্জিলিংয়ে থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কলকাতায় না গিয়ে দিল্লিতে আসতে খুব একটি উৎসাহী ছিলেন এমন নয়। অতীতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান বয়কট করার প্রবণতা দেখা গিয়েছে তাঁর মধ্যে। কিন্তু কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতেই তিনি দিল্লি এসেছেন। গোটা দিন রাষ্ট্রপতি ভবনের চৌহদ্দিতে আন্তঃরাজ্য পরিষদের বৈঠকে ধৈর্য ধরে বসেও ছিলেন। যে পণ্য ও পরিষেবা কর বিল নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আজও সর্বদল বৈঠকে বিরোধীদের সহযোগিতা চেয়েছেন, সেখানেও পূর্ণ সমর্থনের কথা বলা হয়েছে।
আরও খবর- কেন্দ্র কেন সব চাপিয়ে দেবে, প্রশ্ন ক্ষুব্ধ মমতার
কিন্তু তাই বলে জাতীয় রাজনীতিতে মোদী-বিরোধিতার পরিসরে কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে বামেরা সেই জায়গাটি কেড়ে নিক, তা চায় না তৃণমূল। জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মোদী-বিরোধী মঞ্চে যে কারণে সনিয়া গাঁধীও মমতাকে পাশে রাখতে চান, একইভাবে মমতাও সনিয়া গাঁধীকে অচ্ছুত করে রাখতে চান না। মমতার সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে, বিজেপির বি-টিম বলে তাঁর বদনাম হোক, সেটিও চান না তৃণমূল নেত্রী। তাই গতকাল আন্তঃরাজ্য বৈঠকের মতোই সংসদেও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে চলেছে তৃণমূল। সংসদের অধিবেশনে সনিয়ার দল যেমন মুদ্রাস্ফীতির মতো বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা চাইছে, তৃণমূলও তা নিয়ে দুই সভায় নোটিস দিয়ে বসে রয়েছে।