চার্বাক দর্শনের পরামর্শ ছিল, ধার করে ঘি খাও। মানুষ মরে গেলে তার আর দেনা শোধের দায় নেই। একটা রাজ্যের ক্ষেত্রে সেই যুক্তি খাটে না। সরকার বদলালেও ঋণের বোঝা বয়ে যেতে হয় রাজ্যবাসীকে।

সম্প্রতি কলকাতায় এসে অর্থনীতির প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিন-লালিত রোগটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বলেছেন, ধার করে সরকার চালানোর যে রোগ বামফ্রন্টের ছিল, তৃণমূলও তার থেকে মুক্ত নয়। এবং তাঁর মন্তব্যে যুগপৎ চটেছেন অর্থ দফতরের সাবেক কর্ণধার অসীম দাশগুপ্ত এবং বর্তমান অমিত মিত্র।

কিন্তু দেদার বেহিসেবি খরচ, আর তা সামলাতে গিয়ে প্রতি মাসে ধার করার সংস্কৃতিটি যে কেবল অরুণ জেটলিই নজর করেছেন এমন নয়। সরকারি হিসাব পরীক্ষক প্রিন্সিপ্যাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের (পিএজি) দফতরও চলতি আর্থিক বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, বাজেট বরাদ্দের মাত্র ২৭ শতাংশ পরিকল্পনা খাতে রেখেছে রাজ্য। অর্থাৎ ২০১৪-’১৫ অর্থবর্ষে উন্নয়ন খাতে মাত্র ৪২ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা আছে রাজ্য সরকারের। আর ১ লক্ষ ১৪ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা তারা খরচ করতে চায় মূলত বেতন-পেনশন দিতে আর ঋণ শোধ করতে। মেলা-খেলা-উৎসব, ইমাম-মোয়াজ্জিনদের ভাতা, সৌন্দর্যায়ন, নীল-সাদা রঙ করানো, নানা কিসিমের পুরস্কার, শ’য়ে শ’য়ে ক্লাবকে টাকা বিলি ইত্যাদি খাতেও খরচ হবে বিস্তর। যা থেকে রাজ্যের আখেরে লাভ কিছু হবে না।

অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাত এমনকী বিহার, ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্য যখন পরিকল্পনা বহির্ভূত খরচে ক্রমশ লাগাম টানছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ তার বর্ধিত আয়ের আড়াই গুণ খরচ বাড়াতে চলেছে ওই খাতে! নবান্নকে পাঠানো রিপোর্টে পিএজি বলেছে, ২০১৪-’১৫ সালের শেষে রাজ্যের নিজস্ব কর বাবদ আয় বাড়তে পারে ৬৩১৩ কোটি টাকা। অথচ এই সময়কালে অর্থ দফতর পরিকল্পনা-বর্হিভূত খাতে ১৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে চলেছে। পিএজি-র মতে, পরিকল্পনা বর্হিভূত খাতে এই খরচ বাড়ানোটা আর্থিক বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কিছুই নয়। পিএজি নবান্নকে জানিয়ে দিয়েছে, এ ভাবে চললে রাজস্ব ঘাটতি, আর্থিক ঘাটতি এবং ঋণের বহর আরও বাড়বে। বাজেট নথিই বলছে, চলতি অর্থবর্ষের গোড়ায় রাজ্যের ঘাড়ে থাকা প্রায় ২ লক্ষ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা বছর শেষে বেড়ে হবে ২ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি।

এখন প্রশ্ন হল, পরিকল্পনা বর্হিভূত খাতের সব খরচই কি বাজে?

অর্থ দফতরের এক শীর্ষ কর্তার দাবি, “পরিকল্পনা-বহির্ভূত খাতে বেতন-পেনশনের খরচ সবচেয়ে বেশি। এ বছর তার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর পর ঋণ শোধ করতে যাবে আরও ৩০ হাজার কোটি। ৫৮টি সরকারি অধিগৃহীত সংস্থা চালাতে বছরে ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে ২২৪০ কোটি টাকা। এই সব খরচ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।” তাঁর প্রশ্ন, “সরকার কি বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেবে? নাকি ঋণ শোধ করবে না? পরিকল্পনা-বহির্ভূত খরচে লাগাম টানতেই তো সুদ-আসল শোধের উপর তিন বছরের স্থগিতাদেশ চাওয়া হচ্ছে।”

যার উত্তরে পিএজি-র এক কর্তা জানাচ্ছেন, বৈধ উপায়ে নিযুক্ত কর্মচারীদের বেতন-পেনশন দিতেই হবে। কিন্তু ভিলেজ পুলিশ, সিভিক পুলিশ, গ্রিন পুলিশ, চুক্তিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ, ইমাম-মোয়াজ্জিন ভাতা, যুবশ্রী-বেকার ভাতার জন্য বছরে যে কয়েক হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে, সেই খরচ কি সরকার এড়িয়ে চলতে পারত না? তাঁর বক্তব্য, সরকার পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে এড়িয়ে গিয়ে যথেচ্ছ নিয়োগ করছে। এতেই প্রমাণ হয়, বেতন খাতের বোঝা কমাতে তারা মোটেই আগ্রহী নয়।

অর্থ দফতর সূত্রের খবর, ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক পুলিশের বেতন বাবদ বছরে ২২১ কোটি, প্রায় ৫০ হাজার ইমাম-মোয়াজ্জিনের ভাতা বাবদ ২০০ কোটি,  ক্লাবের জন্য ৮০ কোটি, জঙ্গলমহল-সুন্দরবনে ফুটবল প্রতিযোগিতার জন্য ৩০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এ ছাড়া, মাটি উৎসব,   বঙ্গ সম্মান, ১ লক্ষ বেকারের জন্য যুবশ্রী ভাতা ইত্যাদির পিছনেও খরচ আরও ২০০ কোটির বেশি। বেতন-ভাতা খাতে গত বছরের তুলনায় এ বছর খরচ বেড়েছে ৪৫০১ কোটি টাকা। নিয়োগে রাশ টানলে এই বোঝা চাপত না বলেই অর্থ দফতরের একাংশের দাবি, বিশেষ করে যেখানে ছোট মেয়েদের জন্য কন্যাশ্রীর ভাতা দিতে হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হয়ে যায়।

খরচ বাড়ছে অন্যত্রও। গত তিন বছরে মুখ্যমন্ত্রী সপার্ষদ জেলা সফরে গিয়েছেন ৭০ বার। নবান্নের কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, প্রতিটি সফরের জন্য মোতায়েন হওয়া এক হাজার পুলিশের টিএ থেকে কয়েকশো গাড়ির তেল, অনুষ্ঠানস্থল তৈরি থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের উপভোক্তাদের আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করা, এলাহি খাওয়াদাওয়া সব মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে থাকে। যদিও বিভিন্ন তহবিল থেকে এই খরচ মেটানোর ফলে জেলা প্রশাসন আলাদা করে এর হিসাব কষে না। এ ছাড়া মেলা-খেলার খরচ তো রয়েছে। গত আর্থিক বছরে মেলা-খেলা-উৎসবের জন্যই ট্রেজারি থেকে ১৮১ কোটি টাকার অগ্রিম (এসি ডিসি বিল) তুলেছেন বিভিন্ন স্তরের অফিসাররা। এর মধ্যে মোটা টাকা খরচ হয়েছে পুলিশের নানা অনুষ্ঠানে। বছর ঘুরলেও যার হিসাব জমা পড়েনি। পিএজি-র কর্তারা জানাচ্ছেন, এ ভাবেই বেহিসেবের কড়ি কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর বাড়ছে ঋণের বোঝা।

ঋণ শোধের ব্যাপারেও অর্থ দফতরের যুক্তি মানতে নারাজ হিসাব পরীক্ষক সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের একাংশ জানাচ্ছেন, খরচ বেঁধে রাখতে পারলে রাজ্যের নিজস্ব আয় এবং কেন্দ্রীয় অনুদান ও করের টাকায় সংসার চালানো অনেকটাই সম্ভব। কিন্তু বেহিসেবি খরচ কমানো যায়নি বলেই প্রতি মাসে ঋণ নিতে হচ্ছে। যার ফলে বছর শেষে সুদ-আসল শোধের পরিমাণও উত্তরোত্তর বাড়ছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, ঋণ কম নেওয়ার অবস্থায় পৌঁছতে পরিকল্পনা-বর্হিভূত খাতেই খরচ কমাতে হবে। বাজেটে তার দিশা নেই।

অর্থ দফতরের কর্তাদেরও একাংশ জানান, আয় বাড়ানোর পাশাপাশি অনাবশ্যক খরচে লাগাম টানলেই উন্নতি সম্ভব। কিন্তু গত তিন বছরে পরিকল্পনা-বর্হিভূত খাতে লাগাম ছাড়া খরচ হচ্ছে। তার জেরেই আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার মুখে। জেটলি কলকাতায় এসে ঠিক এই দাওয়াই-ই দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এক দিকে যেমন রাজ্যের নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে, তেমনই কমাতে হবে অনাবশ্যক ব্যয়। সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনীতি ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রীকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবেই ফিরতে পারে রাজ্যের আর্থিক হাল।”

কিন্তু রাজ্যের আয় বাড়বে কী ভাবে? মুখ্যমন্ত্রী জমি অধিগ্রহণ না-করার নীতিতে অনড় থাকায়, শহরে জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন তুলে না দেওয়ায়, গ্রামাঞ্চলে ১৪ ওয়াইয়ের লাল ফিতে বহাল রাখায় রাজ্যে লগ্নিতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না বড় শিল্প। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি। যার জেরে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, না হয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে একের পর এক ছোট ও মাঝারি কারখানা। ফলে শিল্পক্ষেত্র থেকে কর বাবদ আয়ের পরিমাণও তেমন ভাবে বাড়ার সুযোগ নেই। গত অর্থবর্ষের বাজেটে কর বাবদ ৮৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা আদায় করার কথা বলা থাকলেও বাস্তবে আদায় হয়েছে ৭২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা।

পাশাপাশি শিল্প না-থাকায় যুবকদের হাতে কাজ নেই। ভোট ব্যাঙ্ক বজায় রাখতে শাসকদল চুক্তিতে বা ঘুরপথে নিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে। যা বাড়াচ্ছে পরিকল্পনা-বহির্ভূত খরচ।

আয় তেমন নেই, অথচ খরচ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় সাহায্যের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই অর্থসঙ্কট নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা, এমনই মত অর্থ দফতরের অন্দরমহলেও।