নিজস্ব সংবাদদাতা, বাঁকুড়া: সিমলাপালের আশ্রম থেকে পালিয়ে এসে সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ তুলেছিল কয়েকজন বালক। এ বার সেই আশ্রমে গিয়ে অন্য আবাসিকদের কাছেও সেই একই অভিযোগের কথা শুনে এলেন জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা। শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মঙ্গলবারই পুলিশ আশ্রমের অন্যতম কর্তা স্বামী দয়ানন্দ ওরফে দীননাথ কারককে গ্রেফতার করেছে।

ওই আশ্রমে আবাসিকদের উপর যৌন নিগ্রহ হতো বলে সোমবার সিমলাপাল থানায় এক আবাসিকের আত্মীয়া অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনার তদন্তে নেমে প্রাথমিক ভাবে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন আশ্রম সম্পর্কে যে তথ্য পেয়েছেন তা চাঞ্চল্যকর। ওই আশ্রমের সঙ্গে তৃণমূলের কোনও কোনও নেতার যোগাযোগ ছিল বলে শোনা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে আশ্রমের অনুষ্ঠানে রাজ্যের দুই মন্ত্রীও এসেছেন। আশ্রম পরিচালনার জন্য টাকা বরাদ্দেও শাসকদলের কারও হাত রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিধানসভা ভোটের আগে আশ্রম-কাণ্ড অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্বের।

কী অভিযোগ উঠেছে সিমলাপালের আমডাঙার ওই আশ্রমের বিরুদ্ধে?

সোমবার ওই আশ্রম থেকে কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে ১০ বছরের নীচের সাত আবাসিক বেরিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একজনের পিসির বাড়ি সিমলাপালে। সেখানে গিয়ে তারা ওই মহিলার কাছে অভিযোগ করে, আশ্রমের আড়ালে তাদের উপর যৌন নিগ্রহ চালানো হচ্ছে। সব শুনে ওই ছাত্রের পিসি স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য ও বাসিন্দাদের সব কথা জানান। এরপর ওই আত্মীয়া সিমলাপাল থানায় গিয়ে লিখিত ভাবে আশ্রম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন।

সেই মোতাবেক তদন্তে নামে পুলিশ। খবর পেয়ে চাইল্ড লাইন ওই বালকদের উদ্ধার করে বিষ্ণুপুর ও ছাতনার হোমে পাঠায়। যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ওই আশ্রমের স্বামী দয়ানন্দ ওরফে দীননাথ কারককে গ্রেফতার করে পুলিশ। মঙ্গলবার তাকে বাঁকুড়ার বিশেষ আদালতে তোলা হয়ে ১৪ দিনের জেল হাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতে অবশ্য আশ্রমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুখ খুলতে চায়নি ধৃত ব্যক্তি। ‘‘পরে বলব’’ বলে যাবতীয় প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। অজয় মহারাজ নামে আশ্রম পরিচালন কমিটির এক সদস্যকে এ নিয়ে ফোন করা হলে তিনি ‘‘থানা থেকে সব জেনে নিন’’ বলে ফোন কেটে দেন।

এ দিন আশ্রম পরিদর্শনে যান জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটি) সম্পাদক দুর্গাশঙ্কর রানা ও জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক পার্থসারথি মণ্ডল। আমডাঙার আশ্রম ঘুরে পাশের ছাত্রদের আবাসনেও যান তাঁরা। পার্থসারথীবাবু বলেন, “আমরা বেশ কিছু ছাত্রের কাছ থেকে যৌন নিগ্রহ ও অত্যাচারের অভিযোগ পেয়েছি। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” পুলিশও জানিয়েছে, তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, তদন্তে নেমে এখনও তারা জানতে পেরেছে আবাসিকদের রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না ওই আশ্রমের কাছে। জেলা প্রশাসনের নজরের আড়ালেই সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে ওই আশ্রম চলছিল বলেই দাবি করছেন প্রশাসনিক কর্তারা। অথচ এই আশ্রমে হস্টেল গড়তে টাকাও নাকি বরাদ্দ হয়েছে সরকারি তহবিল থেকে। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ মন্ত্রী সুকুমার হাঁসদা ওই হস্টেলের উদ্বোধন করেন। গত জানুয়ারিতেই ওই আশ্রম চত্বরে স্বামী বিবেকানন্দের বিরাট মূর্তি উদ্বোধন করেন রাজ্যের বস্ত্রমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আর তাতেই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অমিয় পাত্রের কটাক্ষ, ‘‘ভুয়ো সংস্থাকে সরকারি টাকা দেওয়ার অনেক অভিযোগ আগেও উঠছে। এই আশ্রম সেই তালিকাতেই নতুন সংযোজন। জনগণের টাকা পয়সা সব অপচয় করছে এই সরকার।”

রাজ্যের বর্তমান অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী সুকুমার হাঁসদা বলেন, ‘‘ওই আশ্রম পিছিয়ে পড়া ছেলেদের নিয়েই কাজ করে বলে জানতাম। কিন্তু এই ধরনের অভিযোগ যে উঠতে পারে তা জানা ছিল না।’’ তৃণমূলেরই এক নেতা জানিয়েছেন, কাগজপত্র দেখেই টাকা বরাদ্দ হয়ে থাকতে পারে। সেই কাগজ আসল না কি জাল, তা প্রশাসনের দেখা দরকার। জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু বলেন, “প্রশাসনের কোনও অনুমতি ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবেই চলছিল ওই আবাসিক আশ্রম। ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসার পরেই আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছি।’’

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০০২ সাল থেকে সিমলাপাল থানার আমডাঙা গ্রামে ওই আশ্রম চালু হয়। গ্রামবাসীর একাংশের কথায়, প্রথমে এলাকায় গোশালা ও পশু চিকিৎসালয় গড়া হবে বলে গ্রামবাসীকে জমি দান করতে বলে আশ্রম কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জমি পেয়ে গোশালা না গড়ে আশ্রম ও ফ্রি কোচিং সেন্টার চালু করা হয়। জেলায় বিভিন্ন এলাকায় ২৩টি কোচিং সেন্টার রয়েছে এই সংস্থার। সেখানে বিনামূল্যেই ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। গরিব পড়ুয়াদের বিনামূল্যে রাখার প্রলোভন দেখিয়ে আশ্রমের আবাসনে নিয়ে আসা হয়। আমডাঙার এই আবাসনেই ঝাড়খণ্ড-সহ এই রাজ্যের নানা এলাকার ৫৩ জন ছাত্র রয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।

আমডাঙা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছাত্রীদের একটি আবাসনও রয়েছে এই সংস্থার। সেখানে ন’জন ছাত্রী থাকে। এ ছাড়া রাইপুরেও একটি আবাসন রয়েছে। সেখানেও বেশ কিছু ছাত্র থাকে বলে প্রশাসনিক আধিকারিকেরা জানিয়েছেন। বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা থেকে মোটা অঙ্কের টাকার দানেই এই আশ্রম চলত বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। আক আধিকারিক জানান, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।