Advertisement
E-Paper

রাস্তা গুলিয়ে বিকেভঞ্জন হয়ে সান্দাকফুর দিকে না গিয়ে ঢুকে পড়লাম নেপালে

একনাগাড়ে বরফ পড়ে চলেছে আর রাস্তাঘাট ক্রমে সাদা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কিচ্ছু চোখে পড়ছে না। সান্দাকফু ট্রেকিংয়ের আজ দ্বিতীয় পর্ব।দু’পাশে খাড়া পাহাড় আর জঙ্গল। মাঝখানে দোতলা কাঠের বাড়ি, সামনে টানা বারান্দা। চুপচাপ বসে থাকলে মনে হবে এত শান্তি আর কোথাও নেই। বাঁদিকে শুরু হয়ে গিয়েছে সিঙ্গালিলা রেঞ্জ। অনেকে এই বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে আসতে পছন্দ করে— কপাল ভাল থাকলে এক-আধটা ভল্লুক বা রেড পন্ডার দেখা পাওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। হিসেব মতো গৈরীবাস হল প্রায় অর্ধেক রাস্তা। এর পর থেকে শুধু চড়াই।

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০১৭ ২১:৫২
গৈরীবাসের পথে পড়বে জোবারি

গৈরীবাসের পথে পড়বে জোবারি

মেঘমা ছাড়িয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই ‘তুমলিং’, আর তুমলিং মানেই নীলাদির ‘শিখর লজ’। সান্দাকফু যেতে এখানে এক রাত থাকেনি এমন ট্রেকার খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। প্রথম দু’বার আমি তুমলিং ছাড়িয়ে গৈরীবাস চলে গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু শেষবারে নীলাদি’র আতিথেয়তা পাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ডিনারে গরম ভাত-ডাল আলুর তরকারি আর ডিমের ঝোল যেন সাক্ষাৎ অমৃত। পরদিন সকালে বেরোবার আগে মারমালেড আর পেঁয়াজের আচার সহযোগে তাওয়া গরম টিবেটান রুটি না খাইয়ে ওঁরা ছাড়বেনই না। অথচ সব মিলিয়ে থাকা খাওয়ার খরচ কিন্তু নামমাত্র। তবে আমার মতে সান্দাকফুর রাস্তায় সেরা ট্রেকার্স হাট হল গৈরীবাসে।

দু’পাশে খাড়া পাহাড় আর জঙ্গল। মাঝখানে দোতলা কাঠের বাড়ি, সামনে টানা বারান্দা। চুপচাপ বসে থাকলে মনে হবে এত শান্তি আর কোথাও নেই। বাঁদিকে শুরু হয়ে গিয়েছে সিঙ্গালিলা রেঞ্জ। অনেকে এই বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে আসতে পছন্দ করে— কপাল ভাল থাকলে এক-আধটা ভল্লুক বা রেড পন্ডার দেখা পাওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। হিসেব মতো গৈরীবাস হল প্রায় অর্ধেক রাস্তা। এর পর থেকে শুধু চড়াই।

কালাপোখরি

আর বসতি বলতে কালাপোখরি। ধীরেসুস্থে উঠব মনে করলে এখানেও এক দিন জিরিয়ে নেওয়া ভাল। তা হলে পরের দিন দুপুরের আগে সান্দাকফু পৌঁছে যাওয়া যায়। কালাপোখরি বেশ ছড়ানো বড় একটা গ্রাম। থাকার জায়গাও প্রচুর। গ্রামে ঢুকতেই একটা মাঝারি সাইজের পুকুর পড়বে। চারিদিকে বহু পুরনো, রং চটে যাওয়া ফ্ল্যাগ টাঙানো। হলের রংটাও ঘোলাটে। কেন কালো বলে সে ইতিহাস জানা হয়নি। তবে পুকুরটা এদের কাছে খুবই পবিত্র।

এবং এর থেকেই জায়গাটার নাম। সে বার সঙ্গে গিয়েছিল সদ্য কলেজে ঢোকা ভাগ্নে সায়ন। কালাপোখরিতে এ দিক-ও দিক কিছু বরফ দেখে ও সাঙ্ঘাতিক উত্তেজিত। হিমালয় ভ্রমণ ওর এই প্রথম। প্রায় একটা গোটা দিন এখানে থেকে স্কেচ করেছিলাম বেশ কয়েকটা।

মাইক ডালা লিখে দিয়েছিল ওর ই-মেল ঠিকানা

আরও পড়ুন: সান্দাকফু রওনার আগে ব্যাগে ভরলাম ড্রইংখাতা

প্রথম এসে এই কালাপোখরিতে আলাপ হয়েছিল সিয়াটল থেকে আসা আমেরিকান টুরিস্ট মাইক ডালা আর ওর বান্ধবী ডিয়ান মারির সঙ্গে। বললাম, ‘তোমাদের ছবি আঁকব।’ বেশ মজা পেল দু’জনে। ...‘are you an artist?’ মাইক বলল, ‘আমার নাকটা কিন্তু বেশ লম্বা। সেটা খেয়াল রেখো। ওঁর ছবির পাশে অনেক কিছু লিখে দিয়েছিল। সঙ্গে ই-মেল ও ঠিকানাও। সেটা ১৯৯৯ সাল। আমরা তখনও এ সব বুঝতে শুরু করিনি। কালাপোখরিতে একটা ছোট খাবারের দোকান চালায় ‘মনু’। পরিপাটি সাজগোজ করে বসে থাকে। মেয়েটির চেহারাটাও সুন্দর। এখন টুরিস্ট কম। তাই দোকানটা ফাঁকাই ছিল। আমায় ঢুকতে দেখে হয়তো ভেবেছিল খদ্দের। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ওকে আঁকার। মনু অবশ্য তাতেই খুশি। সে বার সায়নকে নিয়ে সকালবেলা কালাপোখরি থেকে কিছুটা এগিয়েই দেখলাম চারদিক অন্ধকার করে প্রথমে বৃষ্টি, তার পর ঝুপঝুপ করে বরফ পড়তে শুরু করল। আমাদের সঙ্গে তখন যোগ দিয়েছে কলকাতার দুই জোয়ান ছেলে রাজা ও অর্ণব। গতকাল রাতেই ফুটফুটে চাঁদের আলো দেখতে দেখতে ঘুমিয়েছি আর আজ এই অবস্থা।

ডিয়ান মারি

একনাগাড়ে বরফ পড়ে চলেছে আর রাস্তাঘাট ক্রমে সাদা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কিচ্ছু চোখে পড়ছে না। সব শুনশান। কোনওরকমে এগোতে এগোতে শেষে রাস্তা গুলিয়ে গেল। বিকেভঞ্জন হয়ে সান্দাকফুর দিকে না গিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম নেপালের মধ্যে। বোঝার কোনও উপায় ছিল না। ঘণ্টা দু’য়েক যাবার পর উল্টো দিক থেকে আসা একটা গ্রাম্য লোক আমাদের পথ দেখিয়ে বিকেভঞ্জন পৌঁছে দিল। সে দিন আর সান্দাকফু যাবার প্রশ্নই নেই। বরফ সমানে পড়েই চলেছে, সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড়। আমরা ভিজে একেবারে চুপচুপে। আজকের মতো বিকেভঞ্জনেই থেকে যেতে হবে। অনেক কষ্টে আশ্রয় জুটল এক চাষির ঝুপড়িতে। গরিবগুর্বো লোক হলেও আমাদের কিন্তু জামাই আদর করে রেখেছিল। পরদিন অবধি গরম গরম দুধ থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাবার আগে দু’গ্লাস করে ব্রান্ডি। রাতেই বরফ পড়া থেমে গিয়েছিল। সকালে দেখলাম আকাশটাও একটু পরিষ্কার হয়েছে। চটপট বেরিয়ে পড়লাম। সান্দাকফু বড় জোর ঘণ্টা দেড়েকের পথ। কিন্তু রাস্তা বলে তখন তো কিছুই নেই। শুধু হাঁটু অবধি ডুবে যাওয়া বরফ। কী ভাগ্যি! গাইড হিসেবে এক জন ছোকরা সঙ্গে ছিল। ওরই মধ্যে ক্যামেরা বার করে রাজার ছবি তোলার বহর দেখে সবার হাসি পেয়ে গেল।

কেয়ার টেকার প্রেম শর্মা

প্রথমবার গিয়ে সান্দাকফুর বিশাল খোলা চত্বরটা দেখেছিলাম শুকনো খটখটে। এ বার ধবধব করছে সাদা। ট্রেকার্স হাট তিনটে প্রায় ডুবে গিয়েছে বরফে আর সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া। কোনওরকমে মালপত্র নিয়ে যে যার মতো ঘরে ঢুকে পড়ে বাঁচলাম। কেয়ারটেকার সেই প্রেম শর্মাই রয়েছেন। তিন বারই ওঁকে পেয়েছি আর স্কেচ করেছি। কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশনে বহু দিন কাজ করেছেন প্রেম। ঝরঝরে বাংলা বলেন আর কলকাতার লোকেদের একটু বেশি খাতির করেন। প্রায় বারো হাজার ফুট উঁচু সান্দাকফু থেকে গোটা কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জটা আসাধারণ সুন্দর দেখায়। পান্ডিম, রাতং, কাব্রু, কুম্ভকর্ণ— চূড়াগুলো মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে মাউন্ট এভারেস্টকেও উঁকি মারতে দেখা যায়। এ সব দিনে ভোর থাকতেই দামী দামী ক্যামেরা নিয়ে সবাই হাঁচোড়পাঁচোড় করে পাহাড়ের মাথার গিয়ে পাথরে বসে থাকে। সূর্যোদয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে হিমালয়ের চূড়োয় আলো এসে পড়ার মারকাটারি ছবি তুলতে হবে তো! আমার তেমন লেন্সওয়ালা ক্যামেরা নেই। আর থাকলেও যা দু’চোখ ভরে দেখেছি তা ক্যামেরার ও ছোট ফ্রেমে কত দূর ধরা যেত সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

প্রথমবার দেখেছিলাম শুকনো খটখটে সান্দাকফু

লেখক পরিচিতি: লেখক প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট। কিন্তু তুলি-কলমের বাইরেও আদ্যন্ত ভ্রমণপিপাসু। সুযোগ পেলেই স্যাক কাঁধে উধাও। সঙ্গে অবশ্য আঁকার ডায়েরি থাকবেই।

অলঙ্করণ:লেখকের ডায়েরি থেকে।

Travel Spots Tourist Attractions Holiday Trip Sandakphu সান্দাকফু
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy