সাংবাদিক বৈঠকে উর্জিত পটেল। বুধবার। ছবি: পিটিআই।
আমেরিকা সুদ বাড়াতে পারে, এই আশঙ্কায় অনিশ্চিত বিশ্ব অর্থনীতি। ভারতেও খণে সুদ কমলে নগদের জোগান বাড়বে, যা টেনে তুলে পারে মূল্যবৃদ্ধিকে। সব দিক ভেবেই বুধবার সুদের হার কমানোর পথে হাঁটল না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ধারণা একটু অপেক্ষা করে দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিতেই সুদ বাড়ায়নি আরবিআই। আর, আগে থেকে এটাই তাঁরা আঁচ করছিলেন। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের মতেও এটা সঠিক পদক্ষেপ।
গভর্নর উর্জিত পটেলের নেতৃত্বে ছ’সদস্যের ঋণনীতি কমিটি একমত হয়েই এ দিন অপরিবর্তিত রেখেছে সুদের হার। যার জেরে অপরিবর্তিত থাকছে রেপো রেট (যে-হারে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক আরবিআইয়ের কাছ থেকে ঋণ নেয়) ও সিআরআর বা নগদ জমার অনুপাত (আমানতের যে-অংশ আরবিআইয়ের কাছে গচ্ছিত রাখতে হয় ব্যাঙ্ককে)। নোট বাতিলের জেরে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ নভেম্বরের মধ্যে জমা পড়া বাড়তি আমানতের ১০০ শতাংশই সিআরআর খাতে জমা দিতে বলে আরবিআই। এ দিন ওই নির্দেশ তুলে নিল তারা। শীর্ষ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, ১০ ডিসেম্বর থেকে তা উঠে যাচ্ছে, যা স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক।
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক সুদ ধরে রাখার ব্যাপারে আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তকে সাহসী পদক্ষেপ তকমা দিয়েছে। কারণ, সুদ কমলে বিদেশি লগ্নি সংস্থাগুলির বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত বলেই মন্তব্য করেছে অর্থ মন্ত্রক। আগামী সপ্তাহেই মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভ সুদ বাড়াবে, এমন সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সেই কারণেই আরবিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরাও। ফেডের প্রভাব ভারতীয় অর্থনীতির উপর কতটা পড়ে, তা খতিয়ে দেখে পরের বার আরবিআই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদের হার না-কমানোকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। কারণ, সুদ কমলে বাড়তি নগদের চাপে মূল্যবৃদ্ধি আরও বেশি করে থাবা বসাত বলেই তাঁদের আশঙ্কা।
এক নজরে
• সুদ এক জায়গায় ধরে রাখা নিয়ে ঋণনীতি কমিটি একমত • রেপো রেট ৬.২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত • নগদ জমার অনুপাত ৪ শতাংশে অপরিবর্তিত • বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.৬ শতাংশ থেকে কমে ৭.১ শতাংশ • মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশেই, তবে ঝুঁকি রয়েছে তা ছাড়িয়ে যাওয়ার
• বিদেশি মুদ্রার সম্পদ ২ ডিসেম্বরের হিসেবে বেড়ে ৩৬,৪০০ কোটি ডলার • পরবর্তী ঋণনীতি ৮ ফেব্রুয়ারি
তবে শিল্প ঋণে ও ব্যক্তিগত স্তরে গাড়ি-বাড়ি ঋণে সুদ কমলে তা আর্থিক বৃদ্ধি চাঙ্গা করায় ইন্ধন জোগাত বলে মনে করছেন কেউ কেউ। শেয়ার বাজারেও সুদ ধরে রাখার প্রভাব তেমন পড়েনি। তবে লগ্নিকারীদের একাংশ কিছুটা হতাশ হয়েই শেয়ার বেচতে শুরু করলে বাজার দ্রুত পড়তে শুরু করে। দিনের শেষে সেনসেক্স ১৫৫.৮৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ২৬,২৩৬.৮৭ অঙ্কে। নিফ্টি ৪১.১০ পয়েন্ট কমে হয় ৮,১০২.০৫। বাজার সূত্রের খবর, যে-সব শিল্পে শেয়ার দরের ওঠা-নামা ব্যাঙ্ক সুদের উপর বেশি নির্ভর করে, এ দিন সেগুলির দরই বেশি পড়েছে। যেমন ব্যাঙ্ক, আবাসন, গাড়ি।
ঋণনীতি প্রসঙ্গে ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞ এবং ইউবিআইয়ের প্রাক্তন সিএমডি ভাস্কর সেন বলেন, নোট বাতিলের জমানায় এমনিতেই ব্যাঙ্কের ঘরে মোটা অঙ্কের টাকা জমা পড়েছে। তা সংগ্রহের খরচও কম। এ ছাড়া হালে ব্যাঙ্কে জমা পড়া যে-টাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছিল, তা খুব শীঘ্রই তারা ব্যাঙ্কগুলিকে ফেরত দেবে। সে ক্ষেত্রে নগদের জোগান আরও দ্রুত বাড়বে। এই অবস্থায় ঋণ বাড়ানোর জন্য ব্যাঙ্কগুলি নিজেরাই সুদের হার কমানোর রাস্তায় হাঁটতে শুরু করবে বলে আমার ধারণা। তার উপর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার কমালে সমস্যা সৃষ্টি হত। ’’
ভাস্করবাবুর সঙ্গে একই সুরে মতিলাল অসওয়াল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর সিএমডি মতিলাল অসওয়াল বলেন, ‘‘ফেডের সিদ্ধান্তের পরে বিশ্ব অর্থনীতি কোন পথে হাঁটে, তা দেখে নিতে চায় আরবিআই।’’ এ নিয়ে একমত ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞ এবং ওম ক্যাপিটালের চেয়ারম্যান বি কে দত্ত বলেন, ‘‘যখন নদগের জোগান বাড়ে, তখন মূল্যবৃদ্ধির থাবা অর্থনীতির উপর পড়াটাই স্বাভাবিক। অর্থনীতির নিয়ম মেনে এই অবস্থায় বরং সুদের হার বাড়ানোর রাস্তায় হাঁটাটাই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ভারতে এখন চাহিদা কম, ফলে সেটা সম্ভব ছিল না। অন্তত সুদের হার না-কমিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’ তবে ফিকি অবশ্য সুদের হার না-কমায় অখুশি। সংগঠনের সভাপতি হর্ষবর্ধন নেওটিয়া মনে করেন, চাহিদা বাড়ানোর জন্য সুদের হার অন্তত ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো উচিত ঠিল ।
এ দিন অবশ্য ডলারে টাকার দাম ২৭ পয়সা বাড়ার ফলে প্রতি ডলারের দাম দাঁড়ায় ৬৭.৬৩ টাকা।