দিল্লি ভোট এবং লোকসভা-রাজ্যসভায় বাজেট বিতর্কে এ বারের মতো দাঁড়ি পড়ার পরে সামান্য জিরোবার অবকাশটুকুও পেল না দেশ। মঙ্গলবার রাত গড়াতেই ভর্তুকিহীন রান্নার গ্যাস দাম বাড়ার যে হিসেব সামনে এল, তাতে কার্যত বাগ্স্তব্ধ আমজনতা। কলকাতায় ভর্তুকিহীন ১৪.২ কেজির গৃহস্থালির সিলিন্ডার ১৪৯ টাকা বেড়ে হয়েছে ৮৯৬ টাকা। এর আগে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ২১৯.৫০ টাকা বাড়ার পরে সিলিন্ডারের দাম আরও কখনও এতটা বাড়েওনি। প্রত্যাশিত ভাবে বুধবার সকাল হতে না হতেই এ নিয়ে বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছে মোদী সরকার।
কংগ্রেসের আক্রমণ, যে সরকার উজ্জ্বলা প্রকল্প এনে প্রতিটি ঘরে রান্নার গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার কথা বড়াই করে বলছে, তারাই আসলে এ ভাবে মহিলাদের হেঁশেলে ঢুকে আগুন লাগাচ্ছে। কারেন্ট মারছে গৃহিণীদের গৃহস্থে। অবিলম্বে গ্যাসের বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি তুলে তারা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে দেশ জুড়ে দাম এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামবে মহিলা কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, এক দিকে, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বাড়তি টাকা আয় করছে কেন্দ্র। অন্য দিকে, খাদ্য ভর্তুকিতেও কোপ ফেলছে।
এ দিন রাজ্যে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কেন্দ্রের এই সরকার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভাবে দেশকে বিপন্ন করছে। গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ের সুবিধে থেকে বঞ্চিত করছে। দেশ জুড়ে শুধু মানুষের উপর বোঝাই বাড়াচ্ছে।’’
বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিংহের অবশ্য দাবি, ‘‘গ্যাস এবং পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমে, বাড়ে। এটা চলতেই থাকে। দাম এক টাকা বাড়লে বিরোধীরা হইচই করেন। কমলে কেউ বলেন না। এখন গ্যাসের দাম বেড়েছে। পরে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে ওটাও কমে যাবে।’’
ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, যে দিন রাজ্যসভা ও লোকসভার বাজেট বিতর্ক মুলতুবি হল, সে দিন রাতেই নিশ্চুপে আচমকা কেন বাড়ানো হল রান্নার গ্যাসের দাম? তা-ও আবার আগের দাম সংশোধনের পরে মাত্র ১২ দিনের মাথায়। সাধারণ ভাবে তা মাস পয়লায় করার প্রথাই বরাবর প্রচলিত।
বিরোধীদের একাংশের দাবি, দিল্লি ভোটের জন্যই ১ ফেব্রুয়ারি গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম এক রাখা হয়েছিল। শুধু বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম বাড়ে। তা মিটতে না মিটতেই তাই এই পদক্ষেপ। ১৪.২ কেজির দাম বৃদ্ধির জেরে বেড়েছে সেই গ্যাসেরই ৫ কেজির সিলিন্ডারের দামও।
ভোটের সঙ্গে এই দাম বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই দাবি করে তেল সংস্থাগুলি সূত্রের অবশ্য যুক্তি, এলপিজি তৈরির উপাদানের দাম প্রায় ১২৫ ডলার বেড়েছে সম্প্রতি। পাশাপাশি ভর্তুকির সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে গ্রাহক পিছু ভর্তুকির অঙ্কও বাড়বে। সেই বিপুল ভর্তুকির বোঝার জন্য কেন্দ্রের ছাড়পত্র নিতে সময় লেগেছে। অনেকেই এই ছাড়পত্রের যুক্তিতে আসলে সেই ভোটের প্রভাবই দেখতে পাচ্ছেন।
রাজ্যের বিধানসভায় এ দিন কংগ্রেসের সচেতক মনোজ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘দিল্লিতে হেরে গিয়ে মোদী সরকার মাঝরাতেই দেশবাসীর রান্নাঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিল। আচ্ছে দিনের নাম করে বুঢ়ে দিন এনেছে এই সরকার।’’ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিধানসভায় দলমত নির্বিশেষে প্রস্তাব গ্রহণের আবেদনও জানান তিনি। সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের প্রতিক্রিয়া, ‘‘অমিত শাহরা শাহিনবাগে কারেন্ট মারতে চেয়েছিলেন। তার পর দিল্লিতে নিজেরাই কারেন্ট খেয়ে এ ভাবে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেশবাসীকে কারেন্ট মারতে চাইছেন।’’ বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, গত ছ’বছরে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।