বাজারে প্রথম বার ছাড়া কোনও সংস্থার শেয়ার হয়তো ইচ্ছে থাকলেও কেনার সাহস করে উঠতে পারেননি। পাছে ভুল জায়গায় লগ্নি করে পস্তাতে হয়! কারণ তখনও পর্যন্ত ভবিষ্যতে সেটির মুনাফা দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আপনি অনেকটাই অন্ধকারে। অথচ পরে যখন দেখলেন সেই শেয়ারই ঝুলিতে পুরে লাভের গুড় খাচ্ছেন আপনার সহকর্মী, তখন নিজের বান্ধবীকে বন্ধুর বাইকে ঘুরতে দেখার মতো মনের অবস্থা হল। তাঁর তৃপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হাত কামড়াতে কামড়াতে নিজের বোকামিকে দুষলেন বারবার। ভাবলেন, ইস্! আর এক বার যদি সুযোগ
পাওয়া যেত?
আজ সংস্থার বাজারে ছাড়া শেয়ার ঝুলিতে পোরার এই দ্বিতীয় সুযোগ নিয়েই কথা বলব আমরা।
এফপিও কী?
শেয়ার বাজারে লগ্নির বৃত্তে আইপিও (ইনিশিয়াল পাবলিক অফার) বা প্রথম শেয়ার ইস্যু খুবই জনপ্রিয়। এই ভাবে প্রথম বার শেয়ার ছেড়ে একটি সংস্থা নথিভুক্ত হয় স্টক এক্সচেঞ্জে। তারপর সেখানে শুরু হয় তার লেনদেন। এর পরে সংস্থাটি চাইলে আবার কোনও সময় বাজারে শেয়ার ছাড়তে পারে। একেই বলে এফপিও (ফলো অন পাবলিক অফার)। অর্থাৎ এটা হল— প্রথম বার শেয়ার ছেড়ে বাজারে নথিভুক্ত হওয়ার পরে কোনও সংস্থা যখন লগ্নিকারীদের জন্য ফের অতিরিক্ত কিছু শেয়ার ছেড়ে তহবিল সংগ্রহ করছে। একটি সংস্থা চাইলে একাধিক বার এফপিও আনতে পারে।
যেমন ধরা যাক, ‘ক’ নামের একটি সংস্থা প্রথম বার বাজারে শেয়ার ছেড়ে তহবিল সংগ্রহ করেছে এবং শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হয়েছে। এর পরে নতুন কারখানা তৈরি, নতুন ব্যবসা শুরু বা অন্য সংস্থাকে কিনে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তাদের হয়তো আরও টাকার দরকার। তাই অতিরিক্ত আরও কিছু শেয়ার বাজারে লগ্নিকারীদের কাছে বিক্রি করে সেই খরচ জোগাড় করতে চাইছে তারা। এই বাড়তি শেয়ার বিক্রিই এফপিও।
আপনার বাজি
এখন কথা হল, সংস্থা বাজারে আবার শেয়ার ছাড়লে আপনি তা কিনবেন কেন? সেই সুযোগের জন্য অপেক্ষায় বসে থাকারই বা কারণ কি? এতে কি আপনার পকেটে বাড়তি কিছু আসার সম্ভাবনা আছে?
আমার জবাব একটাই, বান্ধবী হাত ফস্কে গেলে ফিরিয়ে আনা শক্ত। কিন্তু শেয়ার বাজার লাভের সুযোগ বারবার দেয়। যার অন্যতম একটি পথ এই ফলো অন পাবলিক অফার বা ফের শেয়ার ইস্যু।
এর আওতায় দু’টি কারণে শেয়ার কিনতে পারেন লগ্নিকারীরা—
১) কম দামে শেয়ার। সংস্থা যখন প্রথম বার শেয়ার ছেড়েছিল তখন তার দাম কম থাকলেও হয়তো কেনা হয়ে ওঠেনি। অথচ স্টক এক্সচেঞ্জে পা রাখার পরেই সেই শেয়ারের দাম চড়েছে। আপনিও ততদিনে কম দামে ভাল শেয়ার কেনার সুযোগ হাতছাড়া করেছেন ভেবে পস্তাতে শুরু করেছেন। এমন একটা সময়ে সংস্থাটি যদি ফের বাজারে কিছুটা শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে জানবেন আপনার কপাল খুলল এবং সুযোগ এল আবার।
কারণ, আইপিও-র মতো হয়তো নয়, তবে শেয়ারের দাম সাধারণত রোজকার লেনদেনের থেকে কম রাখা হয় এফিপিও-তেও। না-হলে লগ্নিকারীর নজর টানা যাবে না। নজর টানা না-গেলে তাঁরা পুঁজি ঢালবে না। আর পুঁজি না-ঢাললে সংস্থা তার প্রয়োজনের তহবিল জোগাড় করবে কী করে? সুতরাং সংস্থার লক্ষ্য পূরণের হাত ধরে বাজিমাতের দান দেওয়ার রাস্তা খুলল আপনার সামনেও।
২) সুরক্ষার ঢাল। বাজারে সংস্থার ছাড়া প্রথম শেয়ার কেনা মানে কার্যত জন্মলগ্নেই তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের উপর বাজি ধরা। অথচ তার খুঁটিনাটি বাজারে নথিভুক্ত সংস্থার মতো জানা নয়। এই অবস্থায় ওই শেয়ার কিনতে টাকা ঢালার অর্থ ঝুঁকি নিয়েই লগ্নি-ঝাঁপ। যে কারণে বাজারে প্রথম আসা শেয়ারে বিনিয়োগ করে মোটা মুনাফা ঘরে তোলার উদাহরণ যেমন হাতের সামনে রয়েছে, তেমনই সেই লগ্নিতে টাকা তলিয়ে যাওয়ার উদাহরণও ভুরিভুরি। কোথাও প্রথম দিনের দামের তুলনায় পরে শেয়ারের দর অনেক নীচে নেমেছে। তো কোথাও আবার হয়তো পাততাড়িই গুটিয়েছে সংস্থা। এই পরিপ্রেক্ষিতে এফপিও তুলনায় সুরক্ষিত। বলতে পারেন, এটি স্রেফ প্রথম দেখে জন্ম নেওয়া মোহ নয়, বেশ খানিকটা চেনা ও বোঝার পরে কারও হাত ধরার মতো।
ঝুঁকিও আছে
এ বার আপনি যদি ভেবে বসেন, তা হলে এফপিও-তে তুলনায় কম দামে শেয়ার ঝুলিতে পুরলেই বাজিমাত হয়ে গেল, তা হলেই মুশকিল। দেখে-শুনে নিজের পছন্দে করা বিয়েও তো ভাঙে! এটাও খানিকটা সে রকম।
মনে রাখবেন, শেয়ার বাজার মানেই ভরপুর ঝুঁকি। আইপিও বা এফপিও যখন, যে-দামেই শেয়ার কিনুন না কেন, তার দর যে রোজকার লেনদেনে আরও নামবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। যে-কারণে ভাল করে যাচাইয়ের পরে শেয়ার বাছার কথা বারবার বলা হয়। জোর দেওয়া হয় কখন, কোন সংস্থার শেয়ার কিনতে নামছেন, সেটাও মাথায় রেখে এগোনোর উপর। এমনকী ভাল সংস্থার দরও নামতে পারে নানা কারণে। তবে মজবুত ভিতের সংস্থার শেয়ার দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখলে যে চোখে পড়ার মতো মুনাফা দিতে পারে, সেটা পরীক্ষিত সত্য। সে জন্য সংস্থার লাভ-লোকসানের বিষয়টি যেমন নজরে রাখতে হয়, তেমনই ওয়াকিবহাল থাকতে হয় আশেপাশের ঘটনা সম্পর্কে। যা সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্য বুঝতে সাহায্য করে।
ফারাক কোথায়?
আইপিও না এফপিও? কখন শেয়ার কেনা বুদ্ধিমানের কাজ?
আমি বলব, দু’টোরই নিজস্ব কিছু ভাল-মন্দ রয়েছে। দু’ক্ষেত্রেই লগ্নি করে আপনি বিপুল লাভ গুনতে পারেন। আবার দু’টোতেই পা আটকাতে পারে পাঁকে। তবে লগ্নিকারীর পক্ষে সুবিধাজনক অবশ্যই এফপিও।
কারণ, বাজারে দ্বিতীয় বার যখন কোনও সংস্থা শেয়ার ছাড়ে, তখন তা আসে আগের থেকে আরও কিছুটা পরিচিত হয়ে। তখন যে সংস্থা ফের শেয়ার ছাড়ছে, আগেই তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়ার রাস্তা থাকে। তার ব্যবসা, মুনাফা, পরিচালন ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে তৈরি করে নেওয়া যায় প্রাথমিক ধারণা। নথিভুক্ত সংস্থার শেয়ার কেনায় লগ্নির ঝুঁকি নিশ্চয়ই আছে, যেমন শেয়ার বাজারের বিনিয়োগে থাকে। কিন্তু ভাল-মন্দ একেবারে না জেনে পা ফেলা আর কিছুটা বুঝে এগোনোর মধ্যে ফারাক তো থাকেই। এই বিচারে আইপিও-র তুলনায় খানিকটা এগিয়ে এফপিও।
সংস্থার ভিত কতটা শক্ত বুঝলেন, মুনাফা থেকে শুরু করে ব্যবসার প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিচার করলেন, কেন তার শেয়ার দর উপরে উঠছে ও আরও উঠতে পারে, সেটারও ধারণা পেলেন। এ বার যদি আইপিও-র তুলনায় কিছু বেশি দামেও তা আপনার ঝুলিতে আসে মন্দ কি? দীর্ঘ মেয়াদে চোখে পড়ার মতো রিটার্ন দেওয়ার সম্ভাবনা আছে, এটা জেনে বুঝেই তো লগ্নি করছেন।
তেমনই আবার খারাপ শেয়ার চিনে নিয়ে তার থেকে দূরে থাকাও সহজ হয় এফপিও-তে।
দেখে এগোন
এফপিও তিন রকম পথে হতে পারে। ১) নতুন কিছু শেয়ার বাজারে ছাড়তে পারে সংস্থা।
২) হাতের শেয়ারের একাংশ বিক্রির জন্য আনতে পারে সংস্থার প্রোমোটার ও লগ্নিকারী সংস্থার মতো শেয়ারহোল্ডাররা।
৩) দু’টিই একসঙ্গে করা হতে পারে। আর এই তিন ক্ষেত্রেই লম্বা মেয়াদে তহবিল বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে সংস্থার শেয়ারে পুঁজি ঢালতে পারেন সাধারণ লগ্নিকারী।
কিনবেন কী ভাবে?
• শেয়ার কেনা-বেচার প্রথম শর্ত, ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা। আগে থেকে না-থাকলে, এফপিও-তে অংশ নেওয়ার আগে খুলুন। এটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট। কেনা শেয়ারগুলি জমা থাকে এখানে। খোলা যায় ব্যাঙ্ক বা কোনও ব্রোকার সংস্থায়।
• খুলতে হবে ট্রেডিং অ্যাকাউন্টও।
এর মাধ্যমে চলে শেয়ার কেনা-বেচা। যে ব্রোকার সংস্থার মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার লেনদেন করবেন, তারাই খুলে দেবে।
• দু’টি ক্ষেত্রেই নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে কেওয়াইসি জমা দিতে হবে।
• ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও লাগবে। শেয়ার লেনদেনের জন্য টাকা দিতে বা নিতে কাজে লাগে এটি।
• কোন কোন সংস্থা বাজারে আবার শেয়ার ছাড়তে চলেছে, নিয়মিত তার খবর রাখার চেষ্টা করুন। তাদের সম্পর্কে বিশদ খোঁজ নিন। ঠিক করুন, কতটা টাকা ঢালবেন এবং কেন।
• আবেদনের সঙ্গে অবশ্যই জমা দিতে হবে ডিপোজিটরি অ্যাকাউন্টের বিশদ তথ্য এবং প্যান নম্বর।
• যে-শেয়ারকে নিশানা করছেন, খেয়াল রাখতে হবে, তা বাজারে আসছে কখন (ওপেনিং ডেট)।
ইস্যু বন্ধই বা হচ্ছে কবে (ক্লোজিং ডেট)। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কেনার পুরো পদ্ধতি শেষ করতে হবে।
আর বিক্রি?
শেয়ার বাজার থেকে বিপুল লাভ করার সব থেকে ভাল উপায় শেয়ার দীর্ঘ দিনের জন্য ধরে রাখা। তাতে ঝুঁকি অনেক কমে। আবার মনমতো দামে ওঠার পরেও আকাশছোঁয়া মুনাফার লোভে শেয়ার আঁকড়ে পড়ে থাকাও খুব কাজের কথা নয়। তবে শেয়ার চিনতে যদি ভুল হয়, তা হলে লোকসানও গুনতে হতে পারে। কিংবা আচমকা যদি আপনার লগ্নি করা সংস্থাটি বিপাকে পড়ে। তাই চারপাশের খবর সম্পর্কে সচেতন থাকুন। পরিস্থিতি বেসামাল দেখলে সিদ্ধান্ত নিতে যাতে সময় না লাগে।
মন দিয়ে দেখুন
শেয়ার ছাড়ার আগে সংস্থার প্রকাশিত নথি (অফার ডকুমেন্ট)
• কতগুলি শেয়ার ছাড়া হচ্ছে (ইস্যু সাইজ) এবং তার দাম
• শেয়ার ছেড়ে টাকা তোলার কারণ। থাকলে প্রকল্পের বিবরণও
• সংগৃহীত টাকা খরচ হবে কীসে এবং কী ভাবে
• সংস্থার ব্যবসা, এখনকার অবস্থা এবং অতীতের রেকর্ড
• প্রোমোটারদের বিশদ বিবরণ
• লগ্নিতে ঝুঁকি কতখানি। তা আপনার পক্ষে বেশি কি না
খেয়াল রাখুন
• আবেদন করেও শেয়ার না পেলে, টাকা ফেরত পাবেন
• নির্দিষ্ট সময়ে তা না-পেলে, সংস্থার কাছে অভিযোগ জানান
সাবধান
• গুজবে কান দেবেন না
• বিজ্ঞাপন ও টিভি-ওয়েবসাইটে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এড়িয়ে চলুন
• সংস্থা, প্রোমোটার, পরিচালন ব্যবস্থা না-দেখে টাকা ঢালা নয়
• ব্রোকার ও পরামর্শের জন্য বিশেষজ্ঞ বাছুন ভেবে-চিন্তে
• শুধু সংস্থার লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতিতে গলবেন না
• শুরুতে শেয়ারের দাম খুব বেশি হলে, দু’বার ভাবুন
• তেজী বাজারে সব এফপিও-ই আকর্ষণীয় ঠেকতে পারে। দেখে এগোন
কেনার পরেও মাথায় থাকুক
• দামের ওঠা-পড়া নজরে রাখুন
• সামান্য উঠলেই উচ্ছ্বাস নয়। একই ভাবে ভেঙে পড়ার কোনও কারণ নেই শেয়ার দর সামান্য পড়লেও
• শেয়ারের দাম হঠাৎ খুব বেশি ওঠা-পড়া করলে সাবধান
• হঠাৎ শেয়ারের খুব বেশি হাতবদলও নজর করার মতো
লেখক শেয়ার বাজার ও মিউচুয়াল ফান্ড বিশেষজ্ঞ
(মতামত ব্যক্তিগত)