চাহিদায় কোনও খামতি ছিল না কোনও কালেই। কিন্তু স্রেফ উপযুক্ত বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে বরাবর মার খেয়ে এসেছে এ দেশের হস্তশিল্প। এ বার প্রযুক্তির হাত ধরে সেই ম্লান ছবিকেই দূরে সরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর তারা। সৌজন্যে, ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার বাজার। ব্যবসার নতুন এই রাস্তায় দালালদের টপকে সরাসরি ক্রেতার হাতে বেনারসি বা পোড়ামাটির প্রদীপ থেকে শুরু করে ডোকরার গয়না তুলে দিচ্ছেন কারিগরেরা।
এর ফলে হালে কিছু কারিগর লাভের মুখ দেখছেন। পাশাপাশি, হস্তশিল্পের বিপুল চাহিদার দৌলতে নজর কাড়া মুনাফা গুনছে নেট বাজারগুলিও। তা সে ই-বে, ফ্লিপকার্ট বা স্ন্যাপডিলের মতো রাঘব বোয়ালরাই হোক বা ক্রাফ্টিসান, গো-কোঅপ, আদিশাড়ি ডট কম-এর মতো স্টার্ট-আপ বা নতুন সংস্থা। সকলেই ঝাঁপাচ্ছে কারিগরদের হাত ধরতে। কারণ, প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার হস্তশিল্পের বাজার নেট দুনিয়ায় টেনে আনতে ওই সমস্ত পণ্য তৈরিতে দক্ষ মানুষদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধাই যে লাভজনক, তা নিয়ে নিঃসংশয় ই-কমার্স সংস্থাগুলি।
বস্তুত, হস্তশিল্পের বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খামতি থাকার দরুনই দালালদের রমরমা বেড়েছে। কারিগর তাঁর দক্ষতা ও সময়ের দাম পাননি। কিন্তু লাভের গুড় খেয়ে গিয়েছে উৎপাদক ও বিক্রেতার মাঝখানে থাকা ওই সব মধ্যস্থতাকারীরাই। ফ্লিপকার্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অঙ্কিত নাগোরি জানান, এ ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন তাঁরা। অঙ্কিতের কথায়, ‘‘কারিগরদের বড় মঞ্চ দরকার। ই-কমার্সের মাধ্যমে সেটা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাজার থেকে দেশের বাজারে এক লাফে পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁরা।’’
নতুন এই পথে ই-কমার্স সংস্থা ও কারিগরদের সরাসরি যোগাযোগের ফলে জিনিস কেনা ও বিক্রির ক্ষেত্রে দু’পক্ষই দালালদের এড়াতে পারছে। কারিগররা বেশি দাম পাচ্ছেন। এবং সংস্থাগুলিও তুলনামূলকভাবে কম দামে জিনিস কিনছে। আর এই লাভের অঙ্ক কষেই নেট দুনিয়ার জন্য কারিগরদের উপযুক্ত করে তুলতেও পা বাড়াচ্ছে নেট বাজারগুলি। কারিগরদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিতে টাকা ঢালছে তারা। যেমন, ই-বে সংস্থার অন্যতম কর্তা নবীন মিস্ত্রির দাবি, হস্তশিল্পের কারিগরদের প্রযুক্তির প্রথম পাঠ দেন তাঁরা। বাজারে কী ধরনের পণ্যের চাহিদা আছে, সে সম্পর্কেও কারিগরদের সঙ্গে আলোচনা চালায় সংস্থা। ওড়িশা স্টেট কোঅপারেটিভ হ্যান্ডিক্রাফট কর্পোরেশন, গুর্জরি, ক্রাফ্টসরুট-এর মতো সংস্থার সঙ্গে জোট বেঁধে এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ই-বে।
একই পথে হেঁটে ফ্লিপকার্টও কারিগরদের হাতে তৈরি জিনিসের ক্যাটালগ তৈরি করে দিচ্ছে। কারণ, নেটে কেনাকাটার ব্যবসায় প্যাকেজিং বা পণ্যের মোড়ক অন্যতম জরুরি শর্ত। এ নিয়ে কারিগরদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় বলে দাবি সংস্থা কর্তৃপক্ষের। অনলাইন ব্যবসায় ক্যাটালগ বা পণ্যের ছবি ও দাম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্রেতা তা দেখে জিনিস কেনার সিদ্ধান্ত নেন। একই ভাবে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছনোও অনলাইন বাজারে ক্রেতা ধরে রাখার আর এক শর্ত। স্ন্যাপডিল কর্তৃপক্ষের মতে, এ সব শর্ত পূরণের জন্য কারিগরদের সহায়তা না-করলে ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয় সংস্থা আদিশাড়ি ডট কমের দাবি, তাঁতির ঘর থেকেই বাংলার তাঁতের শাড়ি সোজা ক্রেতার হাতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৫০ জন কারিগর অনলাইনে পণ্য বেচছেন। দাবি, আগামী এক বছরে ১০০০ তাঁতিকে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে ৬৩০টি ক্লাস্টার বা হস্তশিল্পের গুচ্ছ রয়েছে। সঙ্গে ছ’লক্ষ সমবায়। সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিমাণ ২৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু উপযুক্ত বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে অধিকাংশ কারিগরই লাভের মুখ দেখেন না। শহরে দোকান খুলতে যে পুঁজি চাই, তা প্রায় কারওরই নেই।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিয়ে সেই খামতি অনেকটাই পুষিয়ে দিতে পারে অনলাইন ব্যবসা। শুধুই খুচরো বিক্রি নয়, নেট দুনিয়ার হাত ধরে বাড়তে পারে রফতানিও।