বছর শুরুতেই মেঘের আভাস। ইঙ্গিত, গত ডিসেম্বরে কল-কারখানায় উৎপাদন সরাসরি কমে যাওয়ার। দু’বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম।
দেশে উৎপাদন শিল্পের হাল কেমন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমীক্ষা করে সে বিষয়ে পূর্বাভাস দেয় নিক্কেই-এর ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স (পিএমআই) সূচক। উপদেষ্টা সংস্থা মার্কিটের করা ওই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে, গত বছরের শেষ মাসে ওই সূচক নেমেছে ৪৯.১-এ। নভেম্বরের ৫০.৩-এর তুলনায় তো বটেই, গত ২৮ মাসের মধ্যেও তা সব থেকে নীচে।
ওই সূচক ৫০-এর উপরে থাকার মানে কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি। আর তা তার নীচে নেমে যাওয়ার (যেমনটা ডিসেম্বরে ঘটেছে) অর্থ, উৎপাদন শিল্পে সংকোচন। সুতরাং ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, সদ্য বিদায় নেওয়া বছরের শেষ মাসে কল-কারখানায় উৎপাদন তো বাড়েইনি, বরং তা সরাসরি কমার সম্ভাবনা। এই সূচকের ওঠা-পড়া অনুযায়ী, ২০১৩ সালের অক্টোবরের পরে এই প্রথম সরাসরি উৎপাদন কমেছে দেশের কল-কারখানায়।
মার্কিটের অর্থনীতিবিদ পলিআন্না দ্য লিমার মতে, প্রথমত ভারতের বাজারে চাহিদা এখনও সে ভাবে মুখ তোলেনি। তার উপর নভেম্বরের শেষ এবং ডিসেম্বরে চেন্নাই-সহ দক্ষিণ ভারতে অতিবৃষ্টি ও বন্যার জেরে মার খেয়েছে বিভিন্ন সংস্থার উৎপাদন। মূলত তার প্রতিফলনই দেখা গিয়েছে ডিসেম্বরের পিএমআই সূচকে।
গত বছরের শেষ দিনে পরিকাঠামোর ঘর থেকেও ভাল খবর পায়নি দেশের অর্থনীতি। কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান জানিয়েছিল, নভেম্বরে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি তো দূর অস্ত্, বরং তা সরাসরি কমেছে ১.৩%। কয়লা, অশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, শোধিত পেট্রোপণ্য, সার, ইস্পাত, সিমেন্ট এবং বিদ্যুৎ— এই আট শিল্প রয়েছে পরিকাঠামো ক্ষেত্রের মধ্যে। সেখানে এমন সঙ্কোচন গত এপ্রিলের পরে এই প্রথম।
অনেকের মতে, পরিকাঠামোয় ওই ধাক্কা খাওয়ার পরে এ বার উৎপাদন শিল্পও যদি সঙ্কুচিত হয়, তবে সুদ কমানোর জন্য ফের চাপ বাড়বে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের উপর। যদিও মুল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকলে, তবেই জুনের মধ্যে আবার সুদ ছাঁটাইয়ের রাস্তায় হাঁটার কথা ভাবতে পারবেন শীর্ষ ব্যাঙ্কের গভর্নর রঘুরাম রাজন।
এমনিতে বিচ্ছিন্ন ভাবে হঠাৎ এক মাসে কল-কারখানায় উৎপাদন মার খেলে, সব সময় তাকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেন না বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত যেখানে সমীক্ষাই জানাচ্ছে যে, বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় তার কারণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে উৎপাদন শিল্প সঙ্কুচিত হওয়ার পূর্বাভাস তাঁদের ভাবাচ্ছে একাধিক কারণে। যেমন—
(১) কেন্দ্র যেখানে এক দিকে উৎপাদন শিল্পে এত জোর দিচ্ছে, পাখির চোখ করছে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পকে, তখন কল-কারখানায় উৎপাদন সরাসরি কমার পূর্বাভাস অর্থনীতির আদৌ ভাল বিজ্ঞাপন নয়।
(২) যে গতিতে এ বার পিএমআই সূচক পড়েছে, গত সাত বছরে তা সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ সে হিসেবে দেখলে, ২০০৮ সালের বিশ্বজোড়া মন্দার পরে এই প্রথম।
(৩) শুধু যে পণ্য উৎপাদন কমেছে, তা-ই নয়। চোখে পড়ার মতো করে নেমেছে নতুন বরাতের সংখ্যা। যা শিল্পোৎপাদন তথা আর্থিক বৃদ্ধির চাকায় গতি ফেরার পরিপন্থী।
(৪) মার্কিন অর্থনীতি ছন্দে ফিরতে শুরু করলেও, তা পুরোদস্তুর ঘুরে দাঁড়ায়নি এখনও। ইউরোপের অনেক দেশ এখনও বেহাল। তলানিতে ঠেকা তেলের দামের জেরে নড়বড়ে পশ্চিম এশীয় দেশগুলির অর্থনীতির পায়ের তলার মাটিও। ফলে রাতারাতি রফতানি চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে যদি দেশের বাজারের চাহিদাতেও ভাটা থাকে, তবে শিল্প তথা দেশের অর্থনীতি কী ভাবে চাঙ্গা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
এই সব কিছুর সঙ্গে আবার মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভের ধাপে ধাপে সুদ বৃদ্ধির ধাক্কা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলি কী ভাবে সামাল দেবে, সম্প্রতি তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডারের (আইএমএফ) কর্ণধার ক্রিস্টিন ল্যাগার্দে। ২০০৮ সালের ভয়াল মন্দার কোপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দীর্ঘ দিন আমেরিকায় সুদ শূন্যের কাছাকাছি বেঁধে রেখেছিল ফেড রিজার্ভ। কিন্তু হালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে বারাক ওবামার দেশের অর্থনীতি। বেকারত্বের হারও নেমেছে অনেক নীচে। ফলে এ বার কম সুদের জমানা থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ফেড রিজার্ভ। ডিসেম্বরেই সুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে তারা। সম্ভাবনা এ বছরে ধীরে ধীরে তা আরও বৃদ্ধির।
আর ঠিক এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন ল্যাগার্দে। তিনি মানছেন যে, এই সুদ বৃদ্ধি স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। তার ধাক্কা সামলাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি তৈরি উন্নয়নশীল দেশগুলি। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন মুলুকে সুদ বৃদ্ধি বহু দেশ ও সংস্থাকে বিপদে ফেলবে বলে তাঁর আশঙ্কা। কারণ, আমেরিকায় সুদ শূন্যের কাছাকাছি থাকাকালীন সেখানকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ধার নিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। এ বার সুদ বৃদ্ধির ফলে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে তাদের। সেই ফাঁস আরও শক্ত হয়ে চেপে বসবে, যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে ডলারের দাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আশঙ্কা অনেক ভারতীয় সংস্থার জন্যও অমূলক নয়।
এক দিকে মার্কিন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। অন্য দিকে, ফেড রিজার্ভের সুদ আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা। এই জোড়া কারণে টাকা-সহ প্রায় সব মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের দাম বাড়ছে বেশ কিছু দিন ধরে। এই প্রবণতা বজায় থাকলে, আগামী দিনে আরও চড়তে পারে ডলারের দর। ল্যাগার্দের আশঙ্কা, তখন আক্ষরিক অর্থেই হাঁসফাঁস দশা হবে বিভিন্ন সংস্থার। কারণ, একে তো সুদ বাড়বে। তার উপর ডলার দামী হওয়ায় ধার শোধার জন্য গুনতে হবে আরও বেশি অর্থ। ফলে তখন ধার শোধ করতে খাবি খাবে অনেক সংস্থা।
নভেম্বরে পরিকাঠামো সঙ্কুচিত। ডিসেম্বরে ইঙ্গিত কল-কারখানায় উৎপাদন কমার। এই সব কিছুর উপরে এ বার ল্যাগার্দের আশঙ্কাগুলিও সত্যি হলে, ভারতের শিল্প তথা বৃদ্ধির চাকায় নতুন বছরেও গতি কী ভাবে ফিরবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা।