দেশের মধ্যে ছোট-ছোট আঞ্চলিক রুটে বিমান চালানোয় জোর দিতে চায় কেন্দ্র। চায় আকাশে ওড়ার সাধকে আরও বেশি মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে। আর মূলত এই দুই লক্ষ্যকে পাখির চোখ করেই শুক্রবার খসড়া বিমান পরিবহণ নীতি প্রকাশ করল তারা।
সেখানে আঞ্চলিক রুটে প্রতি ঘণ্টার উড়ানে কোনও মতেই ২,৫০০ টাকার বেশি ভাড়া না-নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব রয়েছে প্রায় সব উড়ানের টিকিটে বাড়তি ২% কর বসানোর। যাতে সেই খাতে হাতে আসা ১,৫০০ কোটি টাকা দিয়ে গড়া যায় বিমানবন্দর। তৈরি করা যায় আঞ্চলিক বিমান পরিবহণের পরিকাঠামো। একই সঙ্গে, ‘খোলা আকাশ’ নীতির সম্ভাবনা উস্কে দিয়ে বলা হয়েছে বিমান পরিবহণে বিদেশি লগ্নির ঊর্ধ্বসীমা ৪৯% থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা। রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক উড়ান চালুর শর্ত শিথিলের প্রসঙ্গও। আপাতত এই খসড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত চেয়েছে কেন্দ্র।
বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের মতে, আঞ্চলিক বিমান পরিবহণে জোর দিলে দেশের মধ্যে যোগাযোগ যেমন উন্নত হবে, তেমনই বিমানে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন অনেক বেশি মানুষ। তবে বাড়তি কর চাপলে, ভাড়া বাড়বে।
সরকারি খামখেয়ালিপনায় নয়, যে সব ছোট শহর থেকে নিয়মিত যাত্রী পাওয়া যাবে, বিমানবন্দর গড়া হবে সেখানেই। এ জন্য আগে কথা বলা হবে সংস্থাগুলির সঙ্গে। দেখা হবে, সেখান থেকে বিমান চালাতে তাদের আগ্রহ।
ইন্ডিগো বা স্পাইসজেট যেমন সস্তার বিমান সংস্থা, তেমনই তৈরি হবে ‘সস্তার’ বিমানবন্দরও। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সেখানে বিপুল ব্যয়ে ঝকঝকে টার্মিনাল না-গড়ে বরং তৈরি করা হবে সাদামাটা পরিকাঠামো। যতটা সম্ভব কমানো হবে তার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। যেমন, হয়তো দিনে এক বারই বিমান ওঠানামা করবে কোনওখানে। সে ক্ষেত্রে তার দু’ঘন্টা আগে বিমানবন্দর খোলা হবে। পুলিশ, দমকল, অ্যাম্বুল্যান্সের মতো জরুরি পরিষেবা দেবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য। কম নেওয়া হতে পারে বিদ্যুৎ, জল ইত্যাদির দাম। কম হবে বিমান জ্বালানির করও।
এ দেশে নিয়মিত বিমান ওঠা-নামা করে ৯০টি বিমানবন্দর থেকে। কেন্দ্রের মতে, এর বাইরে এমন অন্তত ৩০০টি পরিত্যক্ত রানওয়ে বা বিমানবন্দর রয়েছে, যেগুলিকে উন্নত করে সেখান থেকে নিয়মিত বিমান চালানো সম্ভব। এর বাইরেও নতুন বিমানবন্দর গড়তে অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে জমি দিতে পারে সংশ্লিষ্ট রাজ্য। এই পরিকাঠামো গড়তে বাড়তি করের প্রস্তাব।
আঞ্চলিক উড়ান অনেক বেশি মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আনতে তার টিকিটের দামের ঊর্ধ্বসীমা (ঘণ্টায় ২,৫০০ টাকা) বেঁধে দিতে চায় কেন্দ্র। যাতে খেয়াল-খুশি মতো ভাড়া চাইতে না পারে সংস্থাগুলি।
এই দুই প্রস্তাবকেই স্বাগত জানিয়েছেন স্পাইসজেটের কর্ণধার অজয় সিংহ এবং ইন্ডিগো কর্তা আদিত্য ঘোষ। তাঁদের মতে, টিকিটে ২% বাড়তি কর চাপলে আপত্তি নেই। কারণ, সেই টাকা পরিকাঠামো গড়তে ঢালা হলে, আখেরে লাভ হবে তাঁদেরই। তা ছাড়া, আঞ্চলিক রুটে যে বিভিন্ন রকম করছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সুবিধা হবে সেগুলি কার্যকর হলেও।
ঠিক কোন ধরনের রুট আঞ্চলিক হিসেবে চিহ্নিত হবে?
বিমান মন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কলকাতা থেকে অন্ডালই যেমন একটি আঞ্চলিক রুট হিসেবে গণ্য হবে। বিভিন্ন রাজ্যে এমন বহু শহর রয়েছে, যেখান থেকে বিমান নিয়মিত ওঠা-নামা করে না এখনও। সেখান থেকে দেশের আর যে কোনও শহরে যাওয়ার রুটই চিহ্নিত হবে আঞ্চলিক হিসেবে।’’ কেন্দ্র জানিয়েছে, সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বহু অকেজো হয়ে পড়ে থাকা বিমানবন্দরকে এ জন্য নতুন করে গড়া হবে। প্রয়োজনে গাঁটছড়া বাঁধা হবে বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে। এই সমস্ত বিমানবন্দরগুলি থেকে পরিষেবা চালু করলে, জ্বালানি কর, বিমানবন্দর কর-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একগুচ্ছ সুবিধা পাবে সংস্থা।
আগামী দিনে বিমান পরিবহণের গতিপথ কেমন হবে, তার এই খসড়া পরিকল্পনা এ দিন দিল্লিতে প্রকাশ করেন বিমানমন্ত্রী অশোক গজপতি রাজু। তিনি জানান, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা হবে। তার আগে অবশ্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (সংস্থা, বিমানযাত্রী ইত্যাদি) কাছ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ ও মতামত চাইছেন তাঁরা।
এই খসড়ায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক উড়ান চালুর নিয়ম কিছুটা শিথিল করারও। এখন দেশের মধ্যে অন্তত পাঁচ বছর উড়ান চালালে এবং সংস্থার হাতে কমপক্ষে ২০টি বিমান থাকলে, তবেই আন্তর্জাতিক উড়ান চালানোর ছাড়পত্র পায় দেশীয় সংস্থাগুলি। তা বদলানোর পক্ষে সওয়াল করছে বিস্তারা, এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়ার মতো নতুন সংস্থাগুলি। সেই নিয়মে বদলের আগে সব পক্ষের মত চায় কেন্দ্র। সেই সঙ্গে আরও কিছুটা উন্মুক্ত করতে চায় বিমান পরিবহণে বিদেশি লগ্নির দরজাও।
শেষমেশ চূড়ান্ত খসড়া কী দাঁড়ায়, সে দিকেই এখন নজর সকলের।