বিনিয়োগের দুনিয়া এখন থমথমে। ধীরে ধীরে আশঙ্কা গ্রাস করছে গোটা বাজারকে। একসঙ্গে সব কিছুই যেন নিম্নগামী।
নামতে নামতে আশঙ্কাজনক জায়গায় পৌঁছেছে শেয়ার বাজার। সুদের হার কমছে সর্বত্র। সুদ কমলে সাধারণত বাজারে বন্ডের দাম বাড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাও হচ্ছে না। ইকুইটি নেমে আসায় এবং বন্ডের বাজার দর থমকে দাঁড়ানোয় বেশ চাপের মধ্যে আছে মিউচুয়াল ফান্ডের জগৎ। অনিশ্চিত বাজারে সাধারণত সোনার দাম বাড়ে। এ বার কিন্তু হয়েছে উল্টোটা। বেশ কিছু দিন হল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ফ্ল্যাট ও বাড়ির দামও। ফলে লগ্নির জায়গা হিসেবে আকর্ষণ হারাচ্ছে সম্পত্তির দুনিয়া। এই অবস্থায় ব্যাপক চাপে আছেন মধ্যবিত্তরা— যাঁরা দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ।
যে-কারণে শেয়ার বাজার নামছে, তা রাতারাতি শোধরানোর নয়। বাজার উঠতে পারে, যদি ডিসেম্বরে মার্কিন ফেড রেট না-বাড়ে। অর্থবর্ষের দ্বিতীয় তিন মাসে কোম্পানি ফলাফল খারাপই হয়েছে বলা যেতে পারে। এর পর অপেক্ষা করতে হবে তৃতীয় ত্রৈমাসিক ফলের জন্য। বিহারে বিজেপি পরাজিত হওয়ায় বেশ চাপের মধ্যে থাকবে মোদী সরকার। আর হাত খুলে ব্যাট করা যাবে না। এই সব কারণে সূচক এখন বেশ দুর্বল। এ যাত্রায় লগ্নিকারীদের অন্যতম প্রার্থনা, ফেড রেট যেন না-বাড়ে।
অপ্রত্যাশিত ভাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট এক লপ্তে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোয় সুদ কমেছে ঋণ ও জমা উভয়ে। জমার উপর সুদ যে-জায়গায় পৌঁছেছে, তা বেশ আশঙ্কায় রেখেছে সুদ-নির্ভর এক বিরাট জনতাকে। গত বছর নভেম্বর মাসের তুলনায় এ বার ব্যাঙ্ক এবং অন্যত্র সুদের হার ১ থেকে ১.৫% কম। অর্থাৎ গত বছর যিনি ৫০ লক্ষ টাকা নিয়ে অবসর নিয়েছেন, তাঁর তুলনায় এ বার যিনি একই তহবিল নিয়ে অবসর নেবেন, তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৬,০০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। যাঁরা আরও আগে অবসর নিয়েছেন ও আরও বেশি সুদে টাকা লগ্নি করেছেন, তাঁরাও মেয়াদ শেষে সেই টাকা পুনরায় লগ্নি করলে সুদ বাবদ আয় অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি, বাজারে জিনিসের দাম কমা তো দূরের কথা, তা বেড়েই চলেছে। ভোজ্য তেল ও ডালের দাম এখন অনেকেরই ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিল্পঋণে সুদ কমলে পণ্যমূল্য কমার কথা। বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার আবার ঊর্ধ্বমুখী। ঋণের উপর সুদ কমায় অবশ্য গাড়ি বিক্রি বেড়েছে। বাড়ি/ ফ্ল্যাট বিক্রি এখনও তেমন গতি পায়নি চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকায়।
ঝুঁকে পড়া সুদের বাজারে ডাকঘরই এখন বড় ভরসা। লম্বা মেয়াদে এখানে এখনও সুদ কমেনি। ব্যাঙ্ক সুদ অনেকটা নেমে আসায় ডাকঘর ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পগুলির আকর্ষণ হু-হু করে বেড়ে উঠেছে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ডাকঘরে দ্রুত স্থানান্তরিত হতে থাকায় ব্যাঙ্ক শিল্প এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দরবার করছে, ডাকঘরে সুদ কমানোর জন্য। সরকারও ব্যাপারটি বিবেচনা করছে এবং আশঙ্কা, ২০১৫ সালটি শেষ হওয়ার আগেই যে-কোনও দিন ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে সুদ কমানোর বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া এখন মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা।
হলমার্ক করা সোনাও এখন ২৫,০০০ টাকার নীচে। নতুন করে সোনা কেনার জন্য সময়টা ভাল হলেও যাঁরা আগে সোনা কিংবা গোল্ড ইটিএফ-এ লগ্নি করেছেন, তাঁরা কিন্তু হাত কামড়াচ্ছেন। সরকার এখন যে-দামে গোল্ড বন্ড বিক্রি করছে, পাকা সোনার দাম তার থেকেও নীচে নেমে এসেছে। গ্রাম পিছু গোল্ড বন্ডের দাম যেখানে ২,৬৮৪ টাকা, সেখানে বাজারে পাকা সোনা (২৪ ক্যারাট) কিনতে পাওয়া যাচ্ছে ২,৫৯৩ টাকায়। ফলে প্রকল্পটি গোড়ায় কতটা সাফল্য পাবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তবে খারাপ লগ্নির এই পরিবেশে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সময় থাকতে উপযুক্ত পদক্ষেপ করতে হবে, যাতে মন্দ থেকেই ভাল লাভ ঘরে তোলা যায়। একনজরে সঙ্গের চিত্রণ থেকে দেখে নেওয়া যাক, কী ভাবে তা সম্ভব হতে পারে।