লোকসভা নিবার্চনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গেল। ৭ এপ্রিল শুরু হয়ে ভোট পর্ব শেষ হবে ১২ মে। ১৬ মে ফল ঘোষণা। ঈশ্বরের কাছে শেয়ার বাজারের লগ্নিকারীদের এখন একটাই প্রার্থনা, ফলাফল যেন কেন্দ্রে স্থায়ী সরকার তৈরির পক্ষে অনুকূল হয়। আশঙ্কা, উল্টোটা হলে সেনসেক্স নেমে যেতে পারে ১৩ হাজারের ঘরে।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার সেনসেক্স সামান্যই বেড়েছে। আগের দিনের থেকে ৬৭.১৩ পয়েন্ট। বাজার বন্ধের সময়ে তা থামে ২১,২৭৬.৮৬ অঙ্কে। তবে আর প্রায় ১০০ অঙ্ক বাড়লেই সেনসেক্স উচ্চতায় ওঠার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে। এর আগে ২৩ জানুয়ারি সেনসেক্স ২১,৩৭৩.৬৬-এ পৌঁছে সর্বকালীন রেকর্ড তৈরি করেছিল।
কেন্দ্রে নতুন সরকার গঠনের এখনও প্রায় আড়াই মাস বাকি। অনেকেরই প্রশ্ন, এ ক’দিন বাজার কেমন যাবে। উত্তরে একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রায় সকলেই একমত যে, এখন সূচকের উত্থান-পতন দ্রুত হবে। তার অঙ্ক বড় হবে বলে অবশ্য তাঁরা মনে করছেন না।
বস্তুত, কেন্দ্রে স্থায়ী সরকার গঠিত হওয়ার আগে বাজারের হাল ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের সিংহভাগই। কারণ, তাঁদের মতে, শুধু সরকার গঠনের বিষয়টি নয়, দেশের আর্থিক অবস্থার চিত্রটিও এই মুহূর্তে অত্যন্ত উদ্বেগের। ইউপিএ সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ যে তেমন কিছুই করতে পারেনি, দেশের বর্তমান আর্থিক হালই তার প্রমাণ বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।
শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ অজিত দে বলেন, “যে-সব তথ্য বাজার মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে প্রথম হল, চলতি অর্থবর্ষে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার যতটা হবে বলে মনে করা হয়েছিল, তা যে হচ্ছে না, ইতিমধ্যেই তার যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। আর্থিক বৃদ্ধি ৪.৯ শতাংশ হবে বলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌছনো যাবে কি না, অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকের হার সে ব্যাপারে বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।”
তা ছাড়া রাজকোষ ঘাটিতও যে ঘোষিত অঙ্ক ছাড়িয়ে যাবে, ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে তারও। এই অর্থবর্ষে প্রথম ৯ মাসেই ২০১৩-’১৪ সালের বাজেটে ঘোষিত সম্ভাব্য ঘাটতির অঙ্ক ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাকি তিন মাসে ওই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে ঘাটতির পরিমাণ কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু শেয়ার বাজার ঢিমেতালে চলার জন্য সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ওই প্রয়াস এখনও তেমন কাজে দেয়নি। মরিয়া চিদম্বরম এ বার শেয়ার বাজারে নয়, এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কাছে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে রাজকোষ ঘাটতি মেটানোর কৌশল নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে অজিতবাবু বলেন, “অর্থমন্ত্রীর এই কৌশল লগ্নিকারীদের বুঝতে অসুবিধা হবে না। তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারবেন যে, এটা নিছক ‘বুক ট্রান্সফার’। এর সঙ্গে দেশের আর্থিক উন্নতির কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থনীতির হাল ফেরাতে কেন্দ্রে শক্ত নেতার অধীনে স্থায়ী সরকার এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি জরুরি।”
আরও যে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের সিংহভাগই একমত তা হল, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগে বাজার মোটমুটি প্রায় পুরোটাই বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলির দখলে থাকবে। ওই সব সংস্থা কিন্তু ভারতের বাজারে আস্থা হারায়নি। তাদের লগ্নিই বাজারকে ধরে রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের খবর, অক্টোবর থেক ডিসেম্বর, এই তিন মাসেই ভারতের শেয়ার বাজারে বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলি ৬০০ কোটি ডলার (যা প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার সমান) বিনিয়োগ করেছে।
তবে এ প্রসঙ্গে অজিতবাবুর মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত ওই সব সংস্থা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বল্পকালীন পরিকল্পনা তৈরি করবে। পরিকল্পনা তৈরির সময়ে ভারতের আর্থিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছাড়াও আমেরিকা, ইউরোপ এবং চিন-সহ এশিয়ার দেশগুলির কথাও তারা মাথায় রাখবে। ভারতের পক্ষে ভাল খবর যে, চিনের আর্থিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগের জন্য এই মুহূর্তে ভারতের শেয়ার বাজারকেই বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলি বেশি পছন্দ করবে।”
কেন্দ্রে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরেই বিদেশি সংস্থা ও ভারতীয় আর্থিক সংস্থা-সহ শেয়ার বাজারের লগ্নিকারীরা ঠিক করবেন, বিনিয়োগের সময়কাল দীর্ঘ না স্বল্প মেয়াদি হবে। এ ব্যাপারে বাজার বিশেষজ্ঞ এবং ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাক্তন ডিরেক্টর এস কে কৌশিক বলেন, “আমরা চাই কেন্দ্রে স্থায়ী সরকার আসুক। বর্তমান পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারের ধারণা, বিজেপির নেতৃত্বে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা হলে সূচকের লম্বা দৌড় যে দেখা যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে নির্বাচনের ফলাফলে যদি দেখা যায় যে, কেন্দ্রে বিভিন্ন দলের মিলিজুলি সরকার গঠিত হয়েছে, তা হলে সেনসেক্স ১৩ হাজারে নেমে গেলেও অবাক হব না।”