Review of Books

জলকে শ্রদ্ধা করলে নিরাপদ হবে ভবিষ্যৎ

১৯৭৬-এ লেখক তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমিতে ভূগর্ভ-জল অনুসন্ধানের মাধ্যমে।

কল্যাণ রুদ্র

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৬:১১
Share:

জলপীঠ বইটি এক অশীতিপর ভূবিজ্ঞানীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার কথকতা। জলের কথা বলা সহজ নয়, জানতে হয় বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি। প্রকৃতিতে জল চক্রাকারে আবর্তিত হয়, বাষ্প হয়ে আকাশে ভাসে, বৃষ্টি ও তুষার হয়ে মাটিতে ফিরে আসে এবং নদী ও ভূগর্ভের পথে আবার সাগরে মিশে যায়। এই জলচক্র হল পৃথিবীর সাগর-মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে ঘটে চলা এক গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে কোনও কিছুই বিনষ্ট হয় না, শুধু রূপান্তরিত হয়। এই জল সভ্যতাকে লালন করেছে অনাদি কাল থেকে। ২০২৩-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে কয়েকজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই সময় বিশ্বজোড়া জলের ব্যবহার ও অপচয় আমাদের অস্তিত্বের নিরাপদ মাত্রা বা ‘প্ল্যানেটারি লিমিট’ অতিক্রম করেছে। আর এই বইয়ে লেখকের অনুধাবন, “সভ্যতা জলকে কেবল সম্পদ হিসেবে দেখেছে, তাকে শিখতে হবে জলকে সহচর হিসেবে দেখা। জল— যা আকাশ থেকে ঝরে পড়ে, মাটির তৃষ্ণা মেটায়, নদী হয়ে গেয়ে ওঠে জীবনের গান— সে জলকে যদি মানুষ শ্রদ্ধা করতে শেখে, তবেই তার ভবিষ্যৎ নিরাপদ।”

১৯৭৬-এ লেখক তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমিতে ভূগর্ভ-জল অনুসন্ধানের মাধ্যমে। তখন গ্রামের মানুষ পানীয় ও গৃহস্থালির কাজে ঝর্না বা কূপের জল ব্যবহার করতেন। সেচের কাজে ব্যবহৃত হত নদী ও জলাশয়ের জল। ১৯৮০-র দশকে শুরু হওয়া শুখা মরসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) শুরু হল বোরো ধানের চাষ, সেচের চাহিদা মেটাতে বসানো হল অগভীর ও গভীর নলকূপ। লেখক বলেছেন, ১৯৮০-র দশক হল নলকূপের দশক। যে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পাম্প বসানোর আর্থিক সঙ্গতি ছিল না, তাঁরা সেচের জন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে জল কিনতে শুরু করলেন। জীবনদায়ী জল হয়ে গেল প্রাকৃতিক পণ্য। লাগামছাড়া উত্তোলনের ফলে হাজার বছর ধরে জমে থাকা ভূ-জলস্তর বা জলপীঠ চলে গেল আরও গভীরে। ভূগর্ভের পলিমাটিতে জমে থাকা আর্সেনিকের বিষ জলে মিশে প্রবেশ করল খাদ্যশৃঙ্খলে। লেখক দেখেছেন, ভূগর্ভের জলস্তর নেমে যাওয়ায় শুকিয়ে গেছে বহু নদী। একদা বহমান নদীখাত এখন ধান চাষের জমি।

জলপীঠ

প্রদীপ কুমার সেনগুপ্ত

৭৫০.০০৯

ঋকাল বুকস

আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে মানুষ গম, যব ও অন্য কয়েকটি নির্বাচিত ফসলের চাষ শুরু করে পশ্চিম এশিয়ার ইরান ইরাক তুরস্ক সিরিয়া লেবানন ইজ়রায়েল প্যালেস্টাইন ও মিশরের উর্বর ভূমিতে। যাযাবর মানুষ থিতু হওয়ার পর ধীরে কৃষি-সভ্যতা ছড়িয়ে গেল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। নব্য প্রস্তর যুগেই মানুষ জেনেছিল, মাটির গভীরে লুকিয়ে এক বিপুল জলভান্ডার; শিখেছিল কূপ খননের বিজ্ঞান। কৃষিব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ল সেচের জলের চাহিদা; প্রয়োজন হল নদীর জলকে খালপথে দূরান্তের জমিতে নিয়ে যাওয়ার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শিখল ভূগর্ভ ও নদীর জল ব্যবহারের প্রকৌশল। বৈদিক যুগে ভারতে জল সংরক্ষণ ও খালের মাধ্যমে দূর অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা চালু ছিল। ঋগ্বেদে কূপ ও খাল খননের মাধ্যমে শুখা এলাকায় সেচের কথা বলা হয়েছে। মৌর্য যুগে জল সংরক্ষণ ও পরিবহণ ব্যবস্থার আরও উন্নতি হয়।

বিংশ শতাব্দীতে শুরু হল বড় জলাধার নির্মাণের এক নতুন যুগ। আমেরিকার হুভার ড্যাম, চিনের থ্রি গর্জেস ড্যাম, ভারতের ভাকরা-নাঙ্গল, মাইথন, পাঞ্চেৎ বা ফরাক্কা— নদীরা বন্দি হল কংক্রিটের শৃঙ্খলে। বড় বাঁধের লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হল সারা বিশ্বে। ১৯২২-এ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন মুক্তধারা— যা পরে হয়ে ওঠে বাঁধ-বিরোধীদেরও হাতিয়ার। যে নদীর জল একদা সীমান্ত পেরিয়ে যেত, সেই নদী প্রতিহত হল ড্যাম-ব্যারাজের ফাঁসে। শুরু হল জল ভাগাভাগি নিয়ে দেশে দেশে মতান্তর।

দশটি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত এই বইয়ে আলোচিত মানবসভ্যতা ও জলের আন্তঃসম্পর্ক, কূপ খননের কথা, জল বহন ও উত্তোলনের ইতিহাস, জল পরিবহণ ও বণ্টন ব্যবস্থা, নদী শাসন ও সেচব্যবস্থার বিবর্তন, মানুষের জল অনুসন্ধানের কথা, জল-সংঘাত ও জল-শাসন ইত্যাদি বিষয়। প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে নৌনির্মাণ, সমুদ্রযাত্রা ও জল নিয়ে দেশে দেশে সংঘাতের কথাও। বিষয় নির্বাচন ও বিন্যাসে পারম্পর্য সঠিক ভাবে রক্ষিত না হলেও, মাঝে মাঝে একই বিষয়ের পুনরুক্তি থাকলেও বইটির নির্যাস উন্মুখ পাঠকদের কৌতূহল ও তৃষ্ণা মেটাবে— নির্দ্বিধায় বলা যায়।


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন