Women going to Work

ঐতিহ্য রক্ষার দায় সবার

দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে ‘ঘর’ ও ‘বাহির’-এর দ্বৈততা আমাদের সামাজিক পরিসরকে বিভক্ত করে।

সোমা ষণ্ণিগ্রহী

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৭:২১
Share:

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে যে, দেশের কর্মশক্তিতে মেয়েদের যোগদানের হার বাড়ছে। ঠিক কতটা, এবং কোন ক্ষেত্রে, বেতনে লিঙ্গবৈষম্য কতখানি প্রকট, এ সব প্রশ্ন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তর্ক রয়েছে বটে, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আগের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের দেখা মিলছে বেশি। এই প্রগতি শুধু অর্থনৈতিক বা সামাজিক উন্নয়ন নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। কারণ, নারী যখন ঘর থেকে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন, তখন সমাজ ও পরিবারের প্রথাগত চিন্তাভাবনা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধরনেরও বদল ঘটে।

দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে ‘ঘর’ ও ‘বাহির’-এর দ্বৈততা আমাদের সামাজিক পরিসরকে বিভক্ত করে। এই বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ভূমিকার একটি পরিচয় তৈরি হয়। এই মর্মে ঘর হল পারিবারিক রীতিনীতি তথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য অপরিহার্য এবং বাইরের জাগতিক কার্যকলাপ দ্বারা অ-প্রভাবিত। আর নারী হল তার প্রতিভূ। উনিশ শতকে মহিলাদের নিয়ে এই বহুল চর্চিত ‘ডিসকোর্স’কে সামনে রেখে যদি আমরা দেখি, তা হলে দেখা যায়, সমকালীন সমাজে এই চিরাচরিত কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তার বড় কারণ উনিশ শতক ও একবিংশ শতকে মহিলাদের পরিসর এক নয়। বহির্জগতে নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে।

একটু পিছিয়ে জনগণনার রিপোর্ট দেখলে দেখা যাবে, ২০১১ সালে ভারতে মহিলাদের কর্মশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ২৫.৫১%। আগে যেখানে কর্মশক্তিতে অংশগ্রহণকারী মহিলা মানেই গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মূলত কৃষি ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদেরই সংখ্যাধিক্য দেখা যেত, সেখানে বর্তমানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প, বাণিজ্য ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রেই তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলাদের হাতে যে সময়ের স্বল্পতা তৈরি হচ্ছে, তা কি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করছে?

ঐতিহ্য হল সেই অনুশীলন, প্রথা, বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ, যা কোনও সম্প্রদায় বা সমাজের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে। ঐতিহ্য থাকে আমাদের প্রতি দিনের জীবনযাপনে, তাকে ভালবাসার মাধ্যমে ও স্মৃতিচারণের ধরনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লোকসাহিত্য ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত স্মর্তব্য, যেখানে তাঁরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনেক আগেই বুঝিয়েছেন। সে রকমই পারিবারিক ঐতিহ্য আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অঙ্গ।এই পারিবারিক ঐতিহ্য গোষ্ঠী বা সমাজ ভেদে ভিন্ন হয়। এই সমস্ত গৃহস্থালি সংস্কৃতি,আচার-অনুষ্ঠান, দৈনন্দিন অনুশীলন এক ধরনের জীবনচর্চা। এগুলি সময়, সংযম এবংসামাজিক সান্নিধ্যের উপর নির্ভরশীল। গৃহস্থালি পরিসরে এই ধরনের জ্ঞানচর্চা এক বিশেষ লিঙ্গভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হয়েছে, যেখানে নারীরা প্রধানত ধারক ও বাহকের ভূমিকা পালন করেছেন। পুরুষেরা প্রায়শই এই পরিসরের বাইরে অবস্থান করায়, তাঁরা এই দক্ষতার অংশীদার হয়ে ওঠেননি। ফলত, একটি বৃহৎ জ্ঞানভান্ডার সীমাবদ্ধ থেকেছে নারীদের মধ্যে।

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ যেমন নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নের দিক নির্দেশ করে, একই সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও জটিলতার সম্মুখীনও করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারের কাঠামোগত রূপান্তর। অনেকগুলি প্রজন্ম এক সঙ্গে বসবাস করার যে সুবিধা তাঁরা একান্নবর্তী পরিবার থেকে পেতেন, তা আর পান না। অন্য দিকে, বাইরে কাজের সঙ্গে গৃহপরিসরে গৃহিণীর বহুমাত্রিক ভূমিকা সামলাতে গিয়ে তাঁকে গৃহস্থালির জন্য বরাদ্দ সময়ের পুনর্বিন্যাস ঘটাতে হয়। সময়, যা এক সময় তাঁর কাছে ধীর ও বিস্তৃত ছিল, আজ তা খণ্ডিত, সঙ্কুচিত, এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ। ফলে, বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্য, সে উৎসব-অনুষ্ঠানে আলপনা আঁকা বা পিঠেপুলি তৈরিই হোক বা ঘরোয়া শিল্পকলা বা ব্রতকথা পালন হোক, তার জন্য সময় বার করা তাঁর কাছে এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে সেই সব অনুশীলন, যা দীর্ঘ সময়, মনোযোগ এবং ধীর শিক্ষণ প্রক্রিয়ার দাবি করে, তা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন হল, আমরা কি আমাদের সামাজিক কাঠামোকে এমন ভাবে পুনর্গঠন করতে পারি, যেখানে এই গৃহস্থালি জ্ঞান, সময় এবং দায়িত্বের বণ্টন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়? সমসাময়িক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের অংশ; যেখানে গৃহস্থালি জ্ঞানচর্চা, সময়, শ্রম, এবং লিঙ্গভূমিকার পুনর্গঠন ঘটছে। অবশ্যই তা ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক, স্বতন্ত্র। অনেক পরিবারে পুরুষেরাও এই সমস্ত পারিবারিক রীতিনীতি পালনে এগিয়ে আসছেন। তাঁরা পুরো দায়ভার মহিলাদের উপরে ছেড়ে দিচ্ছেন না। গৃহস্থালি জ্ঞান আজ ডিজিটাল মাধ্যমেও নথিবদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ, ঐতিহ্য এক দিকে সঙ্কটের মুখে, আবার অন্য দিকে তা রূপান্তরের সম্ভাবনাময়।

ঐতিহ্য তখনই টিকে থাকে, যখন তা কেবল স্মৃতিতে নয়, চর্চায় বেঁচে থাকে। আর সেই চর্চার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছা, সময় এবং অংশগ্রহণ, যা একক কোনও গোষ্ঠীর নয়, বরং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন