আমেরিকার সঙ্গে শান্তিচুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা চললেও অস্ত্রের সম্ভারের ঝলক দেখানো বন্ধ করছে না ইরান। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম পরস্পরবিরোধী বার্তার মাঝেই বিশেষ একটি হাতিয়ারকে প্রকাশ্যে আনল তেহরান। কূটনৈতিক আলোচনা বা রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই এই ধরনের অস্ত্র প্রদর্শনীতে সাবেক পারস্য রাষ্ট্রটি গভীর কৌশলগত বার্তা দিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আমেরিকার সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসেছে ইরান। কিন্তু, তার মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রত্যাঘাতের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে তেহরান। সেই লক্ষ্যেই নতুন অস্ত্রটিকে প্রকাশ্যে এনেছে তারা, যাকে ব্যবহার করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর মতো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ সামুদ্রিক রাস্তাগুলিকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দিতে দু’বার ভাববে না শিয়া মুলুকটির সরকার।
চলতি বছরের মে মাসে তেহরানের ‘রেভলিউশন স্কোয়্যার’-এ একটি অস্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইরান সেনার ‘এলিট ফোর্স’ অর্থাৎ ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর। সেখানেই ‘২৭ রজব’-কে প্রকাশ্যে আনে তারা। তা প্রকৃতপক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত দ্রুতগামী আক্রমণকারী রণতরী।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় যুদ্ধজাহাজগুলিকে ঠেকাতে অভিনব নৌ-রণকৌশল নিয়েছে ইরান। সেটা হল, ঝাঁক বেঁধে ভারী অস্ত্র সজ্জিত ছোট ছোট রণ-নৌকায় আক্রমণ। এই কায়দায় ঝটিতি আক্রমণে আমেরিকার বিশাল বিশাল বিমানবাহী রণতরী বা অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ারগুলিকে ডুবোতে চাইছে তেহরান।
বড় যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে ছোট ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত নৌকার ঝাঁক ব্যবহারের রণকৌশল ‘অ্যাসিম্যাট্রিক নেভাল ওয়ারফেয়ার’ বা অসম নৌ-যুদ্ধ নামে পরিচিত। ইরানি নৌসেনা কমান্ডারেরা গত চার দশক ধরে জলযুদ্ধের এই নীতিটি নিখুঁত ভাবে তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রতিপক্ষের কোটি কোটি ডলারের একটি বিশাল যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংস বা পঙ্গু করতে খুব বেশি অর্থ খরচ করতে নারাজ ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। আর তাই ডেস্ট্রয়ার জাহাজ না বানিয়ে ‘২৭ রজব’-এর মতো সস্তা ও দ্রুতগামী জাহাজেই ভরসা রাখছে ইরানি নৌসেনারা। প্রয়োজন পড়লে হরমুজ়ে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী শত শত স্পিডবোট দিয়ে চারপাশ থেকে ঝাঁক বেঁধে আক্রমণের কৌশল বেছে নিতে প্রস্তুতি সেরে রাখছে তেহরান।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট আকারের হলেও এই স্পিডবোটগুলির আক্রমণাত্মক ক্ষমতা ও গতি তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। নৌকাগুলির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার। এই গতির কারণে ‘রজব’কে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত গতির সামরিক নৌযানের মধ্যে একটি বলে গণ্য করা হচ্ছে।
অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ় মিসাইল (সম্ভবত নাসের-১ বা সমমানের ক্ষেপণাস্ত্র) দিয়ে সাজানো ক্ষুদ্র নৌযানটি সমুদ্রের যে কোনও বড় যুদ্ধজাহাজে নিখুঁত ভাবে নিশানা করে তাতে আঘাত হানতে পারে। জাহাজটি অত্যন্ত হালকা ও শক্তিশালী উপাদানে তৈরি। এর ফলে সমুদ্রে ৩ মিটার (প্রায় ১০ ফুট) উঁচু ঢেউয়ের মধ্যেও এটি পূর্ণ গতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
একটি আধুনিক মার্কিন ডেস্ট্রয়ার বা বিমানবাহী রণতরী একসঙ্গে কয়েকটি বড় জাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্রকে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু যখন ১০০ থেকে ১৫০টি ছোট ও দ্রুত গতির স্পিডবোট চারপাশ থেকে একযোগে ধেয়ে আসে, তখন যুদ্ধজাহাজের অত্যাধুনিক রাডার ও কম্পিউটার সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কোনটিকে ছেড়ে কোনটিকে নিশানা করবে, তা নির্ধারণ করার আগেই বোটগুলি জাহাজের রক্ষণাত্মক সীমানায় ঢুকে পড়ে।
ইরানি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তৈরি এই ছোট নৌকা বা বোটগুলি কিন্তু সাধারণ স্পিডবোট নয়। প্রতিটি ভারী সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত। রয়েছে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ় মিসাইল। স্বল্পপাল্লার কিন্তু অব্যর্থ কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র। তা জাহাজের ওয়াটারলাইনে আঘাত করে জল ঢুকিয়ে দিতে পারে। কিছু নৌকায় আবার জলের নীচ দিয়ে আঘাত করার জন্য রয়েছে হালকা ওজনের টর্পেডোও।
জাহাজের সেন্সর, রাডার এবং ক্রু-দের লক্ষ্য করে অবিরাম গুলি ও রকেট বর্ষণ করার জন্য রয়েছে রকেট লঞ্চার ও ভারী মেশিনগান। বিস্ফোরকভর্তি রিমোট-কন্ট্রোলড বোট, যা সরাসরি শত্রু জাহাজে গিয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। বড় জাহাজগুলি ঠাহর করার আগেই আক্রমণ হানে হালকা বোটগুলি।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এই নীতিটি অত্যন্ত লাভজনক। আমেরিকার একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার বানাতে খরচ হয় প্রায় ২০০ কোটি ডলার। অন্য দিকে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী স্পিডবোটের খরচ মাত্র কয়েক লাখ ডলার। আর এখানেই জয় ছোটখাটো কলেবরের রজবের। চিতার মতো ক্ষিপ্র গতিতে এসে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় করে দিতে পারে রথী-মহারথীদেরও।
সাধারণত ছোট স্পিডবোটগুলি উত্তাল সাগরে টিকতে পারে না, কিন্তু ৩ মিটার উঁচু ঢেউয়ে চলার সক্ষমতা এর অপারেশনাল এরিয়াকে শুধু পারস্য উপসাগরের শান্ত জলেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। ওমান সাগর এবং আরব সাগরের গভীর ও উত্তাল ঢেউয়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে স্পিডবোটগুলি, যা অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় যুদ্ধজাহাজের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই নৌ-অস্ত্রটির সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি হল এর ৭০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। এত ছোট একটি জলযান থেকে এত দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা থাকা মানে হল, ইরানের উপকূল থেকে বহু দূরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরীগুলি হরমুজ প্রণালীতে ঢোকার আগেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারবেন ইরানি নৌসেনারা।
সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরান যদি একটি বড় জাহাজ ডোবাতে ৫০টি স্পিডবোটও হারায়, তাও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভাবে আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ারকে মাত দেবে মোজতবা খামেনেইয়ের দেশই।
অপ্রচলিত সামুদ্রিক রণকৌশলে আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। ইরানের নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শন ও বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন এই বিভাজনের পেছনে ইরানের একটি সুনির্দিষ্ট সামরিক কৌশল রয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, যার মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ অংশটি মাত্র ৩ কিলোমিটারের মতো। এই সরু জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আকারের গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার বা ক্রুজ়ারগুলি তাদের পূর্ণ গতি বা কার্যক্ষমতা দেখাতে অক্ষম। গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে তাদের নিজস্ব বা মিত্রদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার অজুহাতে অতিরিক্ত নৌসেনা মোতায়েন করে। ঠিক সেই সময়ই বিশ্বের সামনে ইরান তাদের নতুন অস্ত্রটি প্রকাশ্যে এনেছে।
২৭ রজব’ এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি যেন ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের একটি সরাসরি সামরিক বার্তা। যদি ইরানি নৌবহরের উপর আঘাত হানার চেষ্টা হয় তাহলে ছেড়ে কথা বলবে না আইআরজিসির নৌসেনারা। রজবের মতো ‘মৌমাছি নৌবহর’ কয়েক হাজার কোটি ডলারের নৌবাহিনীকে মুহূর্তের মধ্যে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতে পারে, প্রচ্ছন্ন হুমকি তেহরানের।