ফের বিতর্কে জড়ালেন জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ এবং ইউটিউবার ‘খান স্যর’। বিহারের ফয়জ়ল খান ওরফে খান স্যরের কোচিং সেন্টার এবং জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে প্রথমে হাতাহাতি, পরে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। বিহারের রাজধানী পটনায় খান স্যরের কোচিং ইনস্টিটিউট এবং জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের সদস্যদের মধ্যে অশান্তির ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুই নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার হওয়া রক্ষীরা হলেন প্রদীপ ও তালেশ্বর। এই দু’জন নিরাপত্তাকর্মী খান স্যরের কোচিং ইনস্টিটিউটেরই। এ ছাড়াও সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের পরিচালক রোশন আনন্দ। খান স্যরের কোচিংয়ের দুই নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতারের পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। গুলি চালানোর ঘটনায় দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে খান স্যরকে।
মঙ্গলবার ২ জুন রাতে গুলি চালানোর ঘটনায় প্রথমে খান স্যরের দাবি ছিল যে, তাঁর কোচিং সেন্টারের বাইরে গুলি চালানো হয়েছে। কোচিং সেন্টারের বাইরে কমপক্ষে ১০ রাউন্ড গুলি চলেছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন তিনি। সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলে তিনি জানান, রাতে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে তিনি স্পষ্ট ভাবে কিছু বুঝতে পারেননি।
পুলিশের এফআইআর-এও গুলি চালানোর উল্লেখ ছিল না। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে গুলি চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়নি। পরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মোড় নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ খান স্যরকে তাঁর কোচিং ইনস্টিটিউটে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ বেশ কিছু ক্ষণ ধরে চলে। জানা গিয়েছে, খান স্যরকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে খান স্যরের গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, গুলি চালানোর ঘটনায় প্রথমে জ্ঞান বিন্দু কোচিং সেন্টারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছিল। সেই অভিযোগ পেয়ে পুলিশ কোচিং সেন্টারটির পরিচালককে গ্রেফতার করে। কিন্তু পরবর্তী কালে পুলিশ তদন্ত করতে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। গুলি চালানোর ঘটনায় দুই পক্ষই জড়িত বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
প্রাথমিক তদন্তের পর পটনা পুলিশ জানিয়েছিল, গুলি চালানোর কোনও ঘটনা ঘটেনি। এটি দু’টি কোচিং ইনস্টিটিউটের মধ্যে বিবাদের ঘটনা বলে উল্লেখ করেছিল পুলিশ। এফআইআর-এ গুলি চালানোর কোনও অভিযোগ করা হয়নি।
খবর পেয়ে সেই রাতেই কোচিং সেন্টারে ছুটেছিলেন খান স্যর। সমাজবিরোধীরা তাঁর কোচিং সেন্টারে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে, নিরাপত্তারক্ষীকে মারধর করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কোচিং সেন্টারেরও ক্ষতি করা হয়। খান স্যরের দাবি, তাঁর কোচিং সেন্টার থেকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে সম্প্রতি বিহার পুলিশ নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
সেই সমস্ত সফল ছাত্রছাত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল সেন্টারে। এর পর থেকেই হুমকি আসতে শুরু করে। খান স্যর জানিয়েছেন, দু’দিনের মধ্যে কোচিং সেন্টার উড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। খান স্যরের অভিযোগের তির ছিল রোশনের কোচিং সেন্টারের দিকেই।
খান স্যরের দাবি, কম খরচে ছেলেমেয়েদের পড়ান তিনি। এতে অন্য কোচিং সেন্টারগুলির ব্যবসা মার খাচ্ছে। এ ব্যাপারে বলে রাখা ভাল যে খান স্যর এবং রোশন আনন্দের কোচিং সেন্টারের মধ্যে শত্রুতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
পটনায় ‘খান জিএস রিসার্চ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালান খান স্যর। ইউটিউবে প্রতিনিয়তই তাঁর পড়ানোর ভিডিয়ো শেয়ার করেন। পড়ানোর অদ্ভুত কৌশলের জন্য শুধু পটনা নয়, গোটা দেশে খ্যাত তিনি।
প্রাথমিক তদন্ত করে পুলিশ জানায়, জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের পরিচালকের নির্দেশে তাঁর কর্মী ও অন্যরা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছিল। পরে একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই পরিস্থিতি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়েরা।
গোলমালের রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক ব্যক্তি গুলি চালানোর একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করেছিলেন। অভিযোগ, খান স্যরের কোচিং সেন্টারের কর্মীরা তাঁকে জোর করে মোবাইল ফোন থেকে ভিডিয়োটি মুছে ফেলতে বাধ্য করেন। তবে, ভিডিয়োটি কোনও ভাবে পরে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ভাইরাল ভিডিয়োয় খান স্যরের দুই রক্ষীকে গুলি চালাতে দেখা যায়। ভিডিয়োটি পুলিশের নজরে প়়ড়তেই মামলাটি সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়েছে। পটনা পুলিশ গুলি চালানোয় দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে।
প্রথমে দুই রক্ষীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল পুলিশ। পরে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। দু’জনের অস্ত্রও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের লাইসেন্স যাচাই করা হচ্ছে। আর এখানেই ঘনীভূত হচ্ছে খান স্যরের গ্রেফতারির আশঙ্কা।
দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ সেই জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। জ্ঞান বিন্দু কোচিংয়ের পরিচালকের বিরুদ্ধে পুলিশ যখন ব্যবস্থা নিয়েছে তখন একই ঘটনায় খান স্যরের বিরুদ্ধে একই পদক্ষেপ করতে পারে পটনা পুলিশ, এমনটা মনে করছেন অনেকেই।
এর আগেও ২০২২ সালে খান স্যরের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোয় মদত জোগানোর অভিযোগে এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। রেলের নিয়োগে দুর্নীতির প্রতিবাদে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, রেলের সম্পত্তি ভাঙচুর চালানোর মতো ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদের বয়ানের উপর ভিত্তি করে খান স্যরের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে পুলিশ। ২০২৪ সালেও বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) প্রার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দিয়ে পুলিশের হাতে আটক হতে হয়েছিল খান স্যরকে।
কোচিং সেন্টারে গুলি চালানোর ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিহার সরকার। শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি জানিয়েছেন যে, যারা এই হামলা চালিয়েছে, কোনও অবস্থাতেই তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজন পড়লে পাতাল থেকেও দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বার করা হবে এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর এবং সরকার এটিকে হালকা ভাবে নিচ্ছে না।