সরকারি কোষাগারে ঠিক ভাবে গচ্ছিত আছে দেশের সোনা? ফের এক বার সেই প্রশ্ন তুললেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তা-ই নয়, ভল্ট খুলে হলুদ ধাতুর পরিমাণ সরেজমিনে খতিয়ে দেখার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। প্রাক্তন গোয়েন্দাকর্তার বাড়ি থেকে সোনার বার উদ্ধার এবং ঠিক তার পরেই ট্রাম্পের এই মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
চলতি বছরের ৩১ মে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সরকারি কোষাগারের হলুদ ধাতু নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে ট্রাম্প লেখেন, ‘‘ফোর্ট নক্সের সোনা অবিলম্বে সরেজমিনে পরীক্ষার সময় এসেছে।’’ ওই পোস্টেই সরকারি হলুদ ধাতু চুরির অভিযোগে ধৃত প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্তা ডেভিড রাশ সংক্রান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের লিঙ্কও দেন তিনি।
সম্প্রতি, সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রাশকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ বা এফবিআই। দীর্ঘ দিন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’র (সিআইএ) পদস্থ আধিকারিক ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়িতে তল্লাশিতে উদ্ধার হয় প্রায় ৩০০টি সোনার বার, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং বিলাসবহুল ঘড়ি, যা দেখে চোখ কপালে ওঠে তদন্তকারীদের।
এফবিআই সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া হলুদ ধাতুর বাজারমূল্য আনুমানিক চার কোটি ডলার! তদন্তকারীদের অনুমান, ওই সোনা সরকারি কোষাগার অর্থাৎ ফোর্ট নক্সের হতে পারে। যদিও এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন তাঁরা। আর তাই বিষয়টি কানে যেতেই ভল্ট খুলে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যদিও এই নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও নির্দেশ দেননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বর্ণভান্ডারের পোশাকি নাম ‘ইউনাইটেড স্টেটস বুলিয়ান ডিপোজ়িটরি’। এটি ফোর্ট নক্স নামেও পরিচিত, যা প্রকৃতপক্ষে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। এর ভিতরে রয়েছে একটি ভল্ট। আর সেখানেই থরে থরে সাজানো রয়েছে আমেরিকার সরকারি কোষাগারে জমা থাকা সোনা। ওই দুর্ভেদ্য দুর্গটি কেন্টাকি প্রদেশের মার্কিন সেনাছাউনি সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফোর্ট নক্সে মজুত করা সোনার আনুমানিক মূল্য ৪২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রতি আউন্স সোনার দর ৪২.২২ ডলার ধার্য করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হলুদ ধাতুর দাম অনেকটা বৃদ্ধি পেলেও ফোর্ট নক্সে মজুত থাকা সোনার বাজারমূল্য নতুন করে মূল্যায়ন করেনি মার্কিন প্রশাসন। এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আমেরিকার ট্রেজ়ারি বিভাগের (ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রেজ়ারি) হাতে।
১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি নির্মিত ফোর্ট নক্সে আমজনতা তো বটেই, মার্কিন রাজনীতিকদের প্রবেশও এক রকম নিষিদ্ধ। ১৯৭৪ সালে ‘নো ভিজ়িটর’ নীতি থেকে সরে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজ়ারি বিভাগ। সে বছর দুর্ভেদ্য দুর্গটিতে পা রাখেন একদল সাংবাদিক এবং মার্কিন পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর প্রতিনিধি দল। কারণ, ওই সময় ফোর্ট নক্সের ভল্ট থেকে সমস্ত সোনা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
গুজবের জেরে মার্কিন জনতার সরকারের উপর থেকে বিশ্বাস প্রায় উবে গিয়েছিল। ফলে এক রকম বাধ্য হয়েই তৎকালীন ট্রেজ়ারি সচিব ফোর্ট নক্স পরিদর্শনের অনুমতি দেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজ়ভেল্ট অবশ্য স্বর্ণভান্ডারের ভিতরে পা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর কোনও প্রেসি়ডেন্ট ওই ভল্ট খুলে তার ভিতরে প্রবেশ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ফোর্ট নক্স কোনও উৎপাদনকেন্দ্র নয়। অর্থাৎ সেখানে ডলার ছাপানো হয়, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। সোনা ছাড়াও ওই দুর্ভেদ্য দুর্গে রাখা আছে বহু মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি। ভল্টে থাকা হলুদ ধাতুর বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য এক বার সেখান থেকে খুব সামান্য পরিমাণ সোনা সরানো হয়েছিল। সেটুকু বাদ দিলে বহু বছর ধরেই ফোর্ট নক্সে মজুত সোনা অবিকৃত অবস্থাতেই পড়ে আছে।
১৯৩৭ সালে কেন্টাকির দুর্ভেদ্য দুর্গে প্রথম বার সোনা নিয়ে যাওয়া হয়। এর ভিতরে থাকা ভল্টটি খোলার নিয়মকানুন সকলের জানা নেই। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মূল মার্কিন সংবিধান, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, কনফেডারেশনের প্রবন্ধ, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের দ্বিতীয় উদ্বোধনী ভাষণ ও তাঁর গেটিসবার্গ ভাষণের খসড়া এবং অধিকারের বিলকে ফোর্ট নক্সে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। লড়াই থামার এক বছর আগে ১৯৪৪ সালে সেগুলি আবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
একটা সময়ে ফোর্ট নক্সে বিদেশের কিছু মূল্যবান সামগ্রীও গচ্ছিত ছিল। সেই তালিকায় ছিল হাঙ্গেরির রাজা সেন্ট স্টিফেনের মুকুট, তরবারি, রাজদণ্ড এবং ম্যাগনা কার্টা। ১৯৭৮ সালে সেগুলি অবশ্য ফিরিয়ে দেয় মার্কিন সরকার। এর জন্য কেন্টাকির দুর্ভেদ্য দুর্গটির ভল্ট খুলতে হয়েছিল।
১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় জেমস বন্ড সিরিজ়ের ক্রাইম থ্রিলার ‘গোল্ডফিঙ্গার’। সেই হলিউড ছায়াছবিটির কাহিনি এগিয়েছিল ফোর্ট নক্সকে কেন্দ্র করেই। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর সরকারের ঘরে মজুত থাকা সোনা এবং ওই ভল্টকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ তীব্র হয়ে ওঠে। ‘গোল্ডফিঙ্গার’-এ বন্ডের ভূমিকায় ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা শন কনেরি।
গত বছর (২০২৫ সাল) ফোর্ট নক্সে মজুত থাকা সোনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন টেক্সাস থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান দলের কংগ্রেস সদস্য রন পল। ফলে নতুন করে শুরু হয় জল্পনা। ২০১১ সালে সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গকে পল বলেন, ‘‘জনগণকে বলা হচ্ছে, সমস্ত সোনা ঠিকঠাক মজুত রয়েছে। অথচ ভল্ট পরিদর্শন করতে দেওয়া হচ্ছে না। এ ব্যাপারে কোনও তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে না। ফলে সরকার কিছু লুকোতে চাইছে কি না, সেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।’’
এই পরিস্থিতিতে বিবৃতি দিয়েছেন মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগের ইনস্পেক্টর জেনারেল এরিক এম থরসন। তিনি বলছেন, ‘‘ফোর্ট নক্সে সবই ঠিক রয়েছে। এই নিয়ে অযথা গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করার কোনও মানে নেই।’’ ২০১৭ সালে তৎকালীন ট্রেজ়ারি সচিব স্টিভ মুচিন, কেন্টাকির গভর্নর ম্যাট বেভিন এবং কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল শেষ বার ওই ভল্ট পরিদর্শন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে মোট যে পরিমাণ সোনা মজুত রয়েছে, তার অর্ধেকই আছে ফোর্ট নক্সে। এর নিরাপত্তার দায়িত্ব রয়েছে মিন্ট পুলিশের উপর। দুর্ভেদ্য দুর্গটি তৈরি করতে ১৯৩৬ সালে জমি হস্তান্তর করে আমেরিকার সেনাবাহিনী। প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ফোর্ট নক্স। এটির নির্মাণে ওই সময় খরচ হয়েছিল সাড়ে চার লক্ষ ডলার।
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আমেরিকার সরকার অবশ্য নিউ ইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়ায় সোনা মজুত শুরু করেছিল। কিন্তু উপকূলবর্তী এলাকায় যে কোনও সময় হামলা চালাতে পারে শত্রু, এই আশঙ্কায় পরবর্তী কালে ফোর্ট নক্স নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৩৫ সাল থেকেই এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরব হয়েছিল মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগ।
মজার বিষয় হল, ফোর্ট নক্সের ভল্ট তৈরি হওয়ার পর সেখানে সোনা নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পায় যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ। সেই সময় ট্রেনে সোনা পরিবহণ করা হয়েছিল। হলুদ ধাতুর সুরক্ষায় বগিতে মোতায়েন থাকত মার্কিন সৈন্যদল। এ ছাড়া অশ্বারোহী বাহিনীর নিরাপত্তায় ফোর্ট নক্সে সোনা নিয়ে যাওয়ার কথাও লিপিবদ্ধ রয়েছে সরকারি নথিতে।
গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধনকুবের মার্কিন শিল্পপতি ইলন মাস্ককে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্য করেন ট্রাম্প। সরকারি খরচ কমাতে কর্মদক্ষতা বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বা ডজ) প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। কুর্সি পেয়েই মার্কিন স্বর্ণভান্ডারের কোষাগারে উঁকি দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) ‘জিরোহেজ়’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে টেসলা-কর্তাকে ট্যাগ করে লেখা হয়, ‘‘ইলন মাস্ক যদি এক বার ফোর্ট নক্সের ভিতরটা দেখে নেন, তা হলে আপামর মার্কিন জনতা নিশ্চিন্ত হতে পারবে। সেখানে ৪,৫৮০ টন সোনা মজুত থাকার কথা।’’ ওই পোস্টের অবশ্য কোনও জবাব দেননি তিনি।
ডজ প্রধানের দায়িত্বভার সামলানোর সময় ফোর্ট নক্সে যেতে পারেননি মাস্ক। তবে এই নিয়ে ইতিমধ্যেই মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল এনেছেন টমাস ম্যাসি। সেখান মার্কিন স্বর্ণভান্ডারের নিয়মিত স্বাধীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। যদিও বিলটি এখনও আইনে রূপান্তরিত হয়নি।