TMC Split Crisis

‘মহারাষ্ট্র মডেলে’ ঘাসফুল প্রতীক দখল? ‘নেত্রী’ মমতার সঙ্কট বাড়াতে চলেছেন ‘বহিষ্কৃত’-বিদ্রোহী ঋতব্রত?

বিধানসভার নতুন বিরোধী দলনেতা হিসাবে ‘বহিষ্কৃত’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেছে নিয়েছেন তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’রা। এ বার কি ‘মহারাষ্ট্র মডেলে’ ঘাস-ফুল প্রতীক দখল করবেন তাঁরা?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ১৫:১৪
Share:
০১ ২০

১০ দিনেই ‘অপারেশন যুবরাজ’-এ মেগা সাফল্য! দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও তৃণমূল কংগ্রেসে বড়সড় ভাঙন ধরালেন ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫৮ জনের সমর্থনে ইতিমধ্যেই রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতার কুর্সি পেয়ে গিয়েছেন তিনি। এ বার কি তবে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতছাড়া হবে ঘাসফুল প্রতীক? ‘মহারাষ্ট্র মডেল’-এর ছবিই স্পষ্ট হচ্ছে পশ্চিমবাংলায়? রাজনৈতিক মহলে তুঙ্গে জল্পনা।

০২ ২০

চলতি বছরের ৩ জুন, বুধবার বিরোধী দলনেতার তকমা পাওয়ার পর গণমাধ্যমে মুখ খোলেন উলুবেড়িয়া পূর্বের ‘বিদ্রোহী’ তথা বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত। তাঁর কথায়, ‘‘আইন ও প্রথা মোতাবেক সবটা করা হয়েছে। ঘাসফুল প্রতীকে জয়ী দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক বিধানসভার অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। সেটা গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেন তিনি।’’ প্রথম বার বিধায়ক হয়েই এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেন ঋতব্রত।

Advertisement
০৩ ২০

সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা ভোটে দলের ভরাডুবির পর বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা মনোনীত করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, পরিষদীয় দলের সেই প্রস্তাবে বেশ কয়েক জন বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করে বসেন ঋতব্রত। এই নিয়ে অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুকে চিঠি দেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা।

০৪ ২০

সই জালিয়াতির অভিযোগ মেলায় হেয়ার স্ট্রিট থানায় দায়ের হয় এফআইআর। এই ঘটনার তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্য দিকে দলকে না জানিয়ে অধ্যক্ষকে চিঠি দেওয়ায় ১ জুন ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা। তত ক্ষণে অবশ্য নির্বাচনী ভরাডুবির জন্য তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন ওই দুই ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক।

০৫ ২০

ঋতব্রত ও সন্দীপন মুখ খুলতেই ধীরে ধীরে তৃণমূলের অন্দরে চওড়া হতে থাকে ফাটল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন পেয়ে যান তাঁরা। এর পরই নতুন করে বিরোধী দলনেতার প্রস্তাব অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হলে, তিনি তা গ্রহণ করেন। পদ পাওয়ার পর উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক বলেন, ‘‘মুখ্য পরামর্শদাতা হিসাবে থাকার জন্য আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখব।’’ তাঁর ওই মন্তব্যে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

০৬ ২০

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, তৃণমূল আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে গেলেও ‘মহারাষ্ট্র মডেল’-এর সঙ্গে এ রাজ্যের বেশ কিছু অমিল রয়েছে। ফলে প্রতীক নিয়ে দড়ি টানাটানি হবে কিনা, সেটা বলা দুষ্কর। এ-হেন জটিল পরিস্থিতিতে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দিয়েছেন মমতা।

০৭ ২০

২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি ও বালাসাহেব ঠাকরে প্রতিষ্ঠিত শিবসেনার জোট। কিন্তু, ভোটের পর মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে শুরু হয় কোন্দল। আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে ‘ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি’ বা এনসিপির অজিত পওয়ারের সমর্থনে সরকার গঠন করে পদ্মশিবির। মুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির দেবেন্দ্র ফডণবীস। এর জেরে বিজেপির সঙ্গে ২৫ বছরের জোট ভেঙে দেয় ‘ক্ষুব্ধ’ শিবসেনা।

০৮ ২০

জোট ভাঙতেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুরু হয় মহানাটক। এর পর সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড় করতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মহাবিকাশ আঘাড়িতে যোগ দেয় শিবসেনা। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কুর্সি হারান ফডণবীস। অন্য দিকে অজিতকেও ঘরে ফেরান তাঁর কাকা তথা এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার। এ ভাবে ঘর গুছিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন বালাসাহেব পুত্র উদ্ধব ঠাকরে।

০৯ ২০

কিন্তু, ক্ষমতা পেলেও মতাদর্শগত কারণে শিবসেনার অন্দরে বাড়তে থাকে ফাটল। উদ্ধবের এ ভাবে মহাবিকাশ আঘাড়িতে চলে যাওয়া একেবারেই মেনে নিতে পারেননি একনাথ শিণ্ডে। শুধু তা-ই নয়, এই সিদ্ধান্তের জেরে বালাসাহেবের ‘হিন্দুত্ববাদী’ আদর্শের বিচ্যুতি ঘটছে বলেও সোচ্চার হন তিনি। ২০২২ সালে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন নিয়ে শিবসেনা ভেঙে দেন শিণ্ডে। তাঁর সমর্থন পায় পুরনো ‘বন্ধু’ বিজেপি।

১০ ২০

২০২২ সালে একনাথকেই মুখ্যমন্ত্রী করে পদ্মশিবির। এর পর তাঁরাই আসল শিবসেনা বলে দাবি করে বসেন শিণ্ডে। তাঁকেই ‘তির ও ধনুক’ দলীয় প্রতীকটি বরাদ্দ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন উদ্ধব। যদিও তাতে কোনও লাভ হয়নি। এর ঠিক পরের বছর একই কাণ্ড ঘটান অজিত পওয়ার। ফের এনসিপি ভেঙে বেরিয়ে যান তিনি।

১১ ২০

শিণ্ডে সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ পান অজিত। তাঁর দিকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন থাকায় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের থেকে দলীয় প্রতীক ‘ঘড়ি’ আদায় করে নিতে তাঁর বিশেষ সমস্যা হয়নি। ২০২৪ সালের জোটে লড়ে মহারাষ্ট্র বিধানসভার ২৮৮-র মধ্যে ২৩৫ আসন জেতে বিজেপি, শিণ্ডে-সেনা ও এনসিপি-অজিত। এ বার মুখ্যমন্ত্রী হন দেবেন্দ্র ফডণবীস। আর উপমুখ্যমন্ত্রী হন শিণ্ডে।

১২ ২০

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ছবি পশ্চিমবাংলায় দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরামর্শদাতা হিসাবে চেয়েছেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত। সে ক্ষেত্রে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে ঘাসফুল প্রতীক চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সমস্যা থাকতে পারে।

১৩ ২০

দ্বিতীয়ত, শিবসেনায় ভাঙনের ক্ষেত্রে একটা নীতিগত জায়গা রয়েছে। বালাসাহেবের কট্টর হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে ছাড়তে চাননি শিণ্ডে। তাঁর সাফ যুক্তি, কংগ্রেস-বিরোধী রাজনীতি করেই মরাঠাভূমিতে পায়ের তলার জমি শক্ত করেছে শিবসেনা। আর তাই শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রিত্বের লোভে মহাবিকাশ আঘাড়িতে কখনওই যেতে পারেন না উদ্ধব।

১৪ ২০

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, উদ্ধব-পুত্র আদিত্য ঠাকরের উত্থানকেও মেনে নিতে পারেননি শিণ্ডে। দলে ক্রমাগত আদিত্যের গুরুত্ব বাড়ছিল। এতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন তৃণমূল স্তরের সংগঠন থেকে উঠে আসা শিণ্ডে ও তাঁর অনুগামীরা। এটাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিদ্রোহী করে তোলে। ঘাসফুল শিবিরে ভাঙনের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনও মতাদর্শগত বিষয় প্রকাশ্যে আসেনি।

১৫ ২০

‘মহারাষ্ট্র মডেল’-এর সঙ্গে একটা জায়গায় অবশ্য তৃণমূলের ভাঙনের মিল রয়েছে। সেটা হল, আদিত্যের মতোই দলে অভিষেকের গুরুত্ব। ঋতব্রত-সহ ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কদের বড় অংশই ঠারেঠোরে মমতার শাসনকালে যাবতীয় দুর্নীতির জন্য তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে দায়ী করছেন। এ ব্যাপারে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, ‘‘ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ পরিষদীয় দলের সদস্য নন। তাঁর নেতৃত্বে সং থাকতে পারে, গঠন নেই।’’

১৬ ২০

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নতুন বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি চেয়ে অধ্যক্ষকে দেওয়া চিঠিতে নাম রয়েছে তৃণমূলের নয় প্রাক্তন মন্ত্রীর। অভিষেক যে জেলার সাংসদ, সেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ২০ জনের মধ্যে ১৫ জন ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক সই করেছেন তাতে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু বিধায়কদের সমর্থনও পেয়েছেন ঋতব্রত।

১৭ ২০

বুধবার, ৩ জুন এ প্রসঙ্গে বিধানসভা চত্বরে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূল বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘‘আমরা তৃণমূলে ছিলাম, আছি, থাকব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের নেত্রী। বিরোধী দলনেতা বাছতে আমাদের তিন বার সই করতে হয়েছে। কিন্তু, সেখানে জালিয়াতি হল। এখন তো বিরোধী বিধায়কদের বাড়ি বাড়ি সিআইডি যাচ্ছে। ফলে আমরা বিব্রত। তাই সর্বসম্মতিতে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়া হয়েছে।’’

১৮ ২০

নির্বাচনের পর অবশ্য শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা করতে দু’বার প্রস্তাবের চিঠি বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে পাঠান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। প্রথম চিঠিটিতে সই জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত। দ্বিতীয় চিঠিটি মান্যতা পায়নি। এর নেপথ্যে বিজেপির ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব দিয়েছেন মমতা। তাঁর যুক্তি, ‘‘সই জালিয়াতি বুঝতে ফরেন্সিক করা যেতে পারত। কিন্তু, সেটা করেনি সরকার।’’

১৯ ২০

৩ জুন বিধানসভার অধ্যক্ষকে দেওয়া নতুন বিরোধী দলনেতার প্রস্তাব সম্বলিত চিঠিতে সই করেন ৫৮ জন বিধায়ক। সেখানে অবশ্য দলের ‘সভানেত্রী’ হিসাবে মমতার নামই উল্লেখ করেছেন ঋতব্রতেরা। আগামী ৮ জুন দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যোগ দিতে রাজধানী যাচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।

২০ ২০

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুমান, পরিষদীয় দলের পর এ বার তৃণমূলের সংসদীয় দলেও ধরতে পারে ভাঙন। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা গিয়েছে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। সেখানেও দল ভারী হলে ঘাসফুল প্রতীককে কত ক্ষণ আগলে রাখতে পারবেন মমতা? এর উত্তর দেবে সময়।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement