কখনও ‘ক্ষয়িষ্ণু শক্তি’। কখনও আবার ‘নির্জীব দৈত্য’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হওয়া ইস্তক এই চোখেই আমেরিকাকে দেখছেন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) চেয়ারম্যান তথা দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাঁর দাবি, অচিরেই সমস্ত দিক থেকে ওয়াশিংটনকে পিছনে ফেলবে বেজিং। যদিও ‘দিল্লি বহু দূর’ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
কোনও দেশের শক্তির বিচারে মূলত দু’টি বিষয়কেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে দুনিয়ার তাবড় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। সেগুলি হল, অর্থনীতি এবং সেনাবাহিনী। তথ্য বলছে, দু’টি ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে চিন। শুধু তা-ই নয়, ওয়াশিংটনের পতন আসন্ন, এ কথা মানতেও নারাজ তারা। উল্টে আগামী চার থেকে পাঁচ দশক ‘সুপার পাওয়ার’ হিসাবেই আমেরিকা থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি আর্থিক বছরে (২০২৬-’২৭) মার্কিন অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে প্রায় ৩২.৩৮ লক্ষ কোটি ডলার। সেখানে ২০.৮৫ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে চিনের অর্থনীতির সূচক। অর্থাৎ দুই দেশের বিনিময় হারের তুলনায় আমেরিকার অর্থনীতি এখনও প্রায় ১.৫৪ গুণ বড়।
নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে (পার্চেজ়িং পাওয়ার প্রায়োরিটি) যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অবশ্য বেশ কিছুটা এগিয়ে আছে চিন। তবে এখনও সারা বিশ্বের মূল লেনদেনকারী মুদ্রাটি হল ডলার। দীর্ঘ দিন ধরেই ডলারকে সরিয়ে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বেজিং। কিন্তু, ভারত বা অধিকাংশ ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কাছে ড্রাগন তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকদের দাবি, চিনা অর্থনীতির বেশ কিছু অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে। সস্তা শ্রমিক সরবরাহের সুযোগ থাকায় বেজিং মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় দেশগুলির বহুজাতিক সংস্থাগুলির পণ্য উৎপাদন করছে। আগামী দিনে তারা ধীরে ধীরে ভারত বা অন্য কোনও রাষ্ট্রের দিকে মুখ ফেরালে বিপদে পড়বে ড্রাগন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে সেটা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
উদাহরণ হিসাবে মার্কিন টেক জায়ান্ট অ্যাপ্লের কথা বলা যেতে পারে। এত দিন তাদের জনপ্রিয় পণ্য আইফোন কেবলমাত্র তৈরি হচ্ছিল চিনে। কিন্তু, সাম্প্রতিক অতীতে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে সেই ছবি। যন্ত্রাংশ জুড়ে আইফোন নির্মাণের কাজে নেমেছে ভারতও। শুধু তা-ই নয়, গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাজারে দিল্লির রফতানি করা আইফোনের সংখ্যা ছিল অনেকটাই বেশি।
দ্বিতীয়ত, চিনের অর্থনীতি অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে বিরল খনিজের উপর। এই ধাতুগুলির উৎপাদন এবং পরিশোধন প্রক্রিয়ার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বেজিংয়ের। এই ছবি বদলাতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং একাধিক ইউরোপীয় দেশ। নতুন নতুন এলাকায় বিরল খনিজের সন্ধান চালাচ্ছে তারা। পাশাপাশি, পরিশোধনকেন্দ্র নির্মাণেও জোর দিচ্ছে সরকার।
তৃতীয়ত, টানা চার বছর ধরে হ্রাস পাচ্ছে চিনের জনসংখ্যা। ফলে ‘এক সন্তান নীতি’ পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। তাঁর প্রশাসনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ড্রাগনভূমিতে প্রতি ১,০০০-এ জন্মহার দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩ জন, যেটা ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন। অন্য দিকে বেজিঙের মৃত্যুহার বেড়েছে প্রতি ১,০০০-এ ৮.০৪, যা আবার ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
২০২৫ সালের শেষে চিনের মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৪০ কোটি। ওই সময় এর সূচক হ্রাস পেয়েছিল ৩৩.৯ লক্ষ। রাষ্ট্রপুঞ্জের দাবি, এই প্রবণতা বজায় থাকলে ২,১০০ সাল নাগাদ বর্তমানের অর্ধেক হয়ে যাবে ড্রাগনভূমির লোকসংখ্যা। সেটা অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ তাই সতর্ক করে বলছেন, ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে চিন।
অন্য দিকে অভিবাসন নীতির জন্য আমেরিকার জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ হওয়ার কারণে গত শতাব্দী থেকেই বিশ্বের বহু মেধাবী থেকে শুরু করে ধনকুবের শিল্পপতিদের বুকে টেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের শ্রীবৃদ্ধিতে তাঁদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু, কমিউনিস্ট শাসিত চিনে এই সুবিধা নেই। বিদেশিদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেখানে।
২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজ়নেস রিসার্চ’ (সিইবিআর) জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে আর্থিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাবে বেজিং। তখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে চিন। পরবর্তী কালে একই কথা বলতে শোনা যায় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাস্টিন ইফু লিনকেও।
কিন্তু, সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলতে শোনা গিয়েছে লন্ডনের ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সকে। এই ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, চিন কখনওই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না। ২০৬০-’৭০ সাল নাগাদ আর্থিক দিক থেকে আমেরিকার কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে তারা। কারণ, বেজিঙের নিজস্ব আবিষ্কার কিছু নেই। পাশাপাশি, হু-হু করে হ্রাস পাচ্ছে তাদের কর্মশক্তিও।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সিঙ্গাপুরের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা ভাবছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাঁদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। ২০২০ সালে আমেরিকার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি ছিল ২১ লক্ষ কোটি ডলার। ওই সময় ১৫ লক্ষ কোটি ডলারে দাঁড়িয়ে ছিল চিন। অর্থাৎ ছ’লক্ষ কোটি ডলারের ব্যবধান ছিল তাদের।’’
মাহবুবানি জানিয়েছেন, বর্তমান বৃদ্ধির সূচক বজায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৭.৬ লক্ষ কোটি ডলার। ওই সময় ২৬ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছোতে পারে চিনা অর্থনীতি। অর্থাৎ ছ’লক্ষ কোটির থেকে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ১১ লক্ষ কোটি ডলার। কারণ, অর্থনীতির বহু হিসাবই পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির উপর নির্ভরশীল।
সামরিক ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একই রকম। বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাতে ৯০,০০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চলতি অর্থবর্ষে (২০২৬-’২৭) সেটা বেড়ে ১.৫ লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছোবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে সামরিক খাতে ৩০,০০০ ডলার খরচ করছে চিন। তা ছাড়া হাতিয়ার তৈরিতে এখনও পুরোপুরি স্বনির্ভর নয় বেজিং। সেগুলির গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের ৮০টি দেশে ৮০০-র বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে আমেরিকার। সেখানে বিদেশের মাটিতে চিনা সেনাছাউনির সংখ্যা মাত্র দুই। গত ৭৭ বছর ধরে ইউরোপীয় শক্তিজোট নেটোকে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নোর্যাড ও ফাইভ আইজ়ের মতো বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে ওয়াশিংটনের। তাদের নিরাপত্তা অংশীদারদের তালিকায় নাম আছে ফিলিপিন্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া), ইজ়রায়েল এবং কাতারের।
রণতরীর সংখ্যার নিরিখে ইতিমধ্যেই আমেরিকাকে ছাপিয়ে গিয়েছে চিন। কিন্তু, সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের দাবি, এ ব্যাপারে শুধুমাত্র সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেজিঙের নৌবহরের অধিকাংশ যুদ্ধজাহাজই আকারে ছোট এবং উপকূলে টহলদারির যোগ্য। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আছে ১১টি বিমানবাহী রণতরী। লম্বা রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে হামলা চালাতে পারে তারা।
চিনা লালফৌজের দ্বিতীয় সমস্যা হল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকা। দু’-একটা ছোটখাটো সীমান্ত সংঘাত বাদ দিলে গত ৫০ বছরে কোনও সংঘর্ষে জড়ায়নি বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ। সেখানে ইরাক, আফগানিস্তান এবং ইরানের রণাঙ্গনে লড়ছে আমেরিকার বাহিনী, যেটা ড্রাগনের থেকে সব সময় তাদের অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে কিছুটা অগ্রগতি করেছে চিন। কিন্তু, এখনও ডুবোজাহাজ বা পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে তারা। কৃত্রিম মেধা, সেমিকন্ডাক্টর চিপ, অত্যাধুনিক কম্পিউটার, আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমেরিকাকে যে বাড়তি সুবিধা দেবে, তা বলাই বাহুল্য।
আর তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ক্ষয়িষ্ণু শক্তি’ হিসাবে দেখা একেবারেই ঠিক নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের কথায়, এ ব্যাপারে অলীক স্বপ্ন দেখছেন প্রেসিডেন্ট শি। জনসংখ্যার হ্রাস এবং জনশক্তির সঙ্কোচন চিনকে ধীরে ধীরে স্থবিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করেন তাঁরা।